স্বাস্থ্য খাতে আমাদের বরাদ্দ বাড়াতে হবে
স্বাস্থ্য খাতে আমাদের বরাদ্দ বাড়াতে হবে

মতামত

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত

স্বাস্থ্যসেবা একটি উন্নত সভ্যতার মানদণ্ড। দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো, শিল্প বা অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না। মানুষের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু সেই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণীত হয়েছিল ২০১১ সালে। তৎকালীন সরকারের প্রণীত নীতিটি প্রেক্ষাপট, লক্ষ্য ও কর্মকৌশলে সমৃদ্ধ হলেও বাস্তবায়নে ছিল বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি সেই দুর্বলতাকে প্রবল রূপে উন্মোচিত করেছে। তাই উপযুক্ত সময় এসেছে একটি নতুন, সময়োপযোগী, জনবান্ধব ও বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার।

বর্তমান স্বাস্থ্যনীতির সীমাবদ্ধতা

২০১১ সালের স্বাস্থ্যনীতিতে প্রস্তাবনা, রূপকল্প, তিনটি উদ্দেশ্য, ১৯টি লক্ষ্য ও ৩৯টি কর্মকৌশলের উল্লেখ আছে। তবে সেগুলোর অনেক কিছুই বাস্তবায়নের অভাবে কাগজে-কলমেই থেকে গেছে। এর দুর্বলতাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. ওষুধ সরবরাহে অপর্যাপ্ততা ও দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় রোগ মোকাবিলায় মৌলিক ওষুধ সরবরাহকল্পে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গরিব জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধ, সরকারি হাসপাতালে জরুরি ওষুধের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

২. গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা অনুপস্থিত, বিগত সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।

৩. দক্ষ জনবলসংকট, চিকিৎসক, নার্স ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকের ঘাটতি প্রকট। সংকট সমাধানে উদ্যোগ অপ্রতুল।

৪. অসংগঠিত রেফারেল ব্যবস্থা; রোগীদের ঢাকামুখী প্রবণতা, এমনকি ঢাকার অনেক হাসপাতালেও রোগীদের ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়।

৫. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অপ্রস্তুতি, মহামারির সময়, বিশেষত কোভিড, ডেঙ্গুর সময়ে বিষয়টা দেখা যায়।

৬. সরকারি ও বেসরকারি খাতে মানহীন স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ও সামঞ্জস্যের অভাব।

৭. সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় অত্যন্ত সীমিত। স্বাস্থ্যনীতি কার্যকর তখনই হবে, যখন ব্যয় বরাদ্দ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হতে হবে জনবান্ধব, বিকেন্দ্রীকৃত, সাশ্রয়ী ও গবেষণাভিত্তিক। নতুন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু রূপকল্প নয়, বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামো, জনবল ও অর্থায়নের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

কোভিড মহামারি প্রমাণ করেছে, স্বাস্থ্যনীতি যদি জনবান্ধব ও শক্তিশালী না হয়, তবে তা জনগণের উপকারে আসে না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার

বিকেন্দ্রীকৃত স্বাস্থ্যসেবা: দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক। বিশেষায়িত হাসপাতাল, উন্নত ল্যাব ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রায় সবাই রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত। এটির বিপরীতে প্রতিটি বিভাগে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান উদাহরণস্বরূপ, ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, কিডনি, স্ট্রোক ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ইত্যাদি স্থাপন, দক্ষ জনবল নিয়োগ সে ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রতিটি জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় আইসিইউ, সিসিইউ, ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন ও উপজেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা ও প্রাথমিক স্ক্রিনিং সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

মানবসম্পদ উন্নয়ন: চিকিৎসক ও শিক্ষক–সংকট সমাধান না করলে কোনো স্বাস্থ্যনীতি কার্যকর হবে না। সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকের মান ও সংখ্যা বাড়াতে হবে। নার্স, টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্টদের প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিধি সুস্পষ্ট করতে হবে।

সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশে যক্ষ্মা, ডেঙ্গু, কালাজ্বর, নিপাহ ভাইরাসের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিবছর বহু প্রাণ কেড়ে নেয়। পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগও দ্রুত বাড়ছে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো ক্রনিক তথা দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঠিক ওষুধ এবং ফলোআপ চিকিৎসা উপজেলাতেই নিশ্চিত করতে হবে। রেফারেল ক্রাইটেরিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে রেফারেল সিস্টেমকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা যেতে পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু: প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যানসার বা বিভিন্ন রোগের স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।

আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্র ও ইনস্টিটিউট স্থাপন: মৌলিক গবেষণা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যনীতিতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ প্রদান করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকাতে কঠোর আইন প্রয়োগ: প্রয়োজন ও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, বিশেষত অ্যান্টিবায়োটিক প্রদানে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।

স্বাস্থ্য অর্থায়ন ও বিমা: বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই রোগীর পকেট থেকে আসে। এটি টেকসই নয় এবং মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের জন্য ভয়াবহ। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস মডেল এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা যেতে পারে। অথবা জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা প্রবর্তন। কর ও ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সভিত্তিক তহবিল গঠন। জাতীয় ওষুধনীতি আধুনিকায়ন করে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: বহির্বিভাগে রোগীর চাপ এ দেশের খুবই পরিলক্ষিত বিষয়গুলোর একটি। বিষয়টি সমাধানকল্পে ডিজিটাল বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাও ডিজিটাল হতে হবে ও টেলিমেডিসিন, ই-হেলথ রেকর্ড, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালু করতে হবে। রোগীর তথ্য নিরাপদ ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

নিরাপত্তা ও জবাবদিহি: চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর অধিকার রক্ষায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এর মতো স্বাধীন রোগীদের অভিযোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ বাংলাদেশেও চালু করা যেতে পারে।

এনএইচএস থেকে শিক্ষণীয়: যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এনএইচএস বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেল। এর মূলনীতি হলো সবাইকে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, বিনা মূল্যে ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে নয়। বাংলাদেশ শিখতে পারে কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলা। রোগীকেন্দ্রিক ও বহুমাত্রিক টিমওয়ার্কভিত্তিক সেবা। অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যসেবাকে কর ও বিমার মাধ্যমে অর্থায়ন করা। তবে এনএইচএস-এর মতো দীর্ঘ অপেক্ষার সময় ও চিকিৎসক–সংকট এড়াতে আগেভাগেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হতে হবে জনবান্ধব, বিকেন্দ্রীকৃত, সাশ্রয়ী ও গবেষণাভিত্তিক। নতুন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু রূপকল্প নয়, বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামো, জনবল ও অর্থায়নের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

একটি জাতির অগ্রগতির মাপকাঠি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের সুস্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে কাগজের নথি থেকে বের করে আনা এখন সময়ের দাবি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যেন ঢাকায় না গিয়েও সঠিক চিকিৎসা পায়, এটাই হবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন।

ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি এবং সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব