
ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের আবহে যখন বিশ্বরাজনীতি টালমাটাল, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপ ফাঁস নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে ওই ফোনালাপে ট্রাম্পের কঠোর ভাষা ও প্রকাশ্য ক্ষোভ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপের সময় লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, ‘তুমি কী করছ এসব? তুমি একেবারে পাগল হয়ে গেছ। আমি না থাকলে তুমি এখন জেলে থাকতে।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য ভেঙে দেয়নি, বরং দুই নেতার সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ আসে এরপরই। ট্রাম্প আরও তীব্র ভাষায় বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে এই কারণে।’ এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। কারণ, এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটিকে ইসরায়েল সম্পর্কে বৈশ্বিক জনমতের পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প সাধারণত রাজনৈতিক সীমারেখা ভেঙে বক্তব্য দিতে অভ্যস্ত। তিনি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে এবং আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিতে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু এবার তাঁর মন্তব্যে কেবল কৌশল নয়, বরং ইসরায়েল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে বাড়তে থাকা জনরোষের ছাপও স্পষ্ট।
ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের সমর্থক মহলে এই মন্তব্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, ‘সবাই ইসরায়েলকে ঘৃণা করে’ ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল এক বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করায়, যা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জটিলতা সৃষ্টি করে এসেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য এই পরিবর্তনের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র দেয়। তাদের জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ২৪টি দেশের মধ্যে ৬২ শতাংশ মানুষ গত বছর ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক মত দিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য এবং ইসরায়েলকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা তাঁকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা সমর্থন এনে দিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। সেই কারণে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ইস্যুতে তাঁর অবস্থান আরও কঠোর বা অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রবণতা শুধু বৈশ্বিক পর্যায়েই সীমিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরায়েল সম্পর্কে মনোভাব দ্রুত বদলাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ১১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
অন্য দেশগুলোর পরিস্থিতি আরও কঠোর। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। এই তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান একাকিত্বের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই বাস্তবতা নিয়ে সচেতনতা থাকলেও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক মনে করেন, বিশ্বে তাঁদের দেশের প্রতি সম্মান কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো ইহুদিবিরোধিতা বা আন্তর্জাতিক অজ্ঞতা।
তবে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, বিষয়টি শুধু ধারণাগত নয়, বরং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ১০ হাজার সাধারণ মানুষের মৃত্যু বিশ্বজনমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সংবাদ সংস্থা অ্যাক্সিওস–এ উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে ট্রাম্প স্বীকার করেন, তিনি জানেন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। কিন্তু তাঁর মতে, নেতানিয়াহু পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ‘অতিরিক্ত ও অসমানুপাতিকভাবে’ সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি সমালোচনা করেন এমন কৌশলকে, যেখানে একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে লক্ষ্য করতে গিয়ে পুরো ভবন ধ্বংস করা হচ্ছে।
এই পর্যবেক্ষণগুলো এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের সামরিক কৌশল নিয়ে সমালোচনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জোরালো। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সামনে আনছে। এটি ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে আরও চাপের মুখে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বহু মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন। তাঁরা প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন খুব কমই এসেছে।
এই ধারার ব্যতিক্রম হিসেবে অনেকে ট্রাম্পকে দেখছেন। কারণ, তিনি রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, নিয়ম ভাঙতে অভ্যস্ত এবং তাঁর বক্তব্য প্রায়ই সরাসরি জনমতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই কাজ করে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এখন ইসরায়েল সম্পর্কে জনমত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত। একই সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি মাগা শিবিরেও ইহুদিবিরোধী ধারণা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প এমন এক সময় ক্ষমতায় আছেন, যখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান চাপের মুখে। ইরান যুদ্ধের ব্যর্থতা তাঁর নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে তিনি নতুন করে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের পথ খুঁজছেন।
এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য এবং ইসরায়েলকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা তাঁকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা সমর্থন এনে দিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। সেই কারণে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ইস্যুতে তাঁর অবস্থান আরও কঠোর বা অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে।
পল নুকি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তা বিভাগের সম্পাদক হিসেবে দ্য টেলিগ্রাফ–এ কর্মরত
দ্য টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ