‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬
‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬

মতামত

ইরান নিজেকে টিকিয়ে রাখতে শত্রুর সঙ্গে যেভাবে সমঝোতা করে

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাঁচ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু সংঘাত অবসানের কোনো চুক্তির আশা এখনো ঘোলাটে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।

একদিকে তেহরান থেকে অব্যাহতভাবে প্রতিশোধের হুমকি আসছে, অন্যদিকে পশ্চিমা, বিশেষ করে ডানপন্থী অনেক বিশ্লেষক দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর মতাদর্শের কারণে ইরান কোনো সমঝোতায় আসতে পারবে না। তবে এ ধারণা ভুল।

ইরানের সংবিধান ও সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র কেবল অন্ধ মতাদর্শ দিয়ে চলে না। বর্তমান শাসনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করতে পিছপা হবে না, যদি তা তাদের মূল নীতি, অর্থাৎ ‘শাসনের টিকে থাকা’ নিশ্চিত করে।

ইরানি সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার সীমা

১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এক বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, নামাজ, রোজা ও হজের চেয়েও ইসলামি সরকারের অবস্থান ও গুরুত্ব ওপরে। এর মাধ্যমে তিনি ‘ভেলায়েতে ফকিহ’–সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিতর্কের অবসান ঘটান। পরের মাসে তিনি একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্থা গঠনের নির্দেশ দেন। এর কাজ ছিল পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অচলাবস্থা দূর করে ব্যবস্থার মূল স্বার্থ রক্ষা করা।

১৯৮৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই নীতি ১১২ অনুচ্ছেদ হিসেবে স্থায়ী রূপ পায়। গঠিত হয় ‘এক্সপিডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল’।

মূল বার্তাটি খুবই স্পষ্ট। শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা বা ‘হেফজে নেজাম’ হলো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় দায়িত্ব। এ ব্যবস্থার প্রয়োজনে যেকোনো ধর্মীয় বিধান থেকে সরে আসার আইনি ক্ষমতা ওই পরিষদকে দেওয়া হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই নীতি বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য ছিল। তেহরান তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে একটি নৈতিক নীতি হিসেবে তুলে ধরে। এর উদ্দেশ্য পশ্চিমা আধিপত্য ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করা। এ অবস্থানের কারণে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সহানুভূতি পেয়েছে। দেশের ভেতরে দমন-পীড়ন সত্ত্বেও অনেকে ইরানকে আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের মূল স্তম্ভ মনে করেন।

তবে ইরানের এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান সর্বজনীন নয়; বরং পরিস্থিতিভিত্তিক। তারা নিজেদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকে বাধা দেয়, কিন্তু সব ধরনের আধিপত্যের বিরোধিতা করে না।

ইরানের ‘অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা’ নীতির কারণে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেখানে তারা নিজেদের প্রভাব বাড়াতে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা করে। তাই তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান সুবিধাজনকভাবে প্রয়োগ করা হয়।

নিজেদের ক্ষেত্রে ইরান সার্বভৌমত্বের কথা বলে। তবে আঞ্চলিক নীতির ক্ষেত্রে তারা অন্য দেশের স্বাধীনতাকে নিজেদের নিরাপত্তার কাছে গৌণ করে তোলে। অবশ্য বিশ্বরাজনীতিতে এ আচরণ কেবল ইরানের একা নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘বাস্তববাদী তত্ত্ব’ বলে, যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান ভিন্ন কিছু নয়। এটি একটি সাধারণ রাষ্ট্র, যা কেবল মতাদর্শ দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তকে আড়াল করতে চায়।

এখানেই মূল বিষয়। আর এ কারণেই সমঝোতা সম্ভব। ইরানের নীতি কাজ করে দুটি ধাপে। প্রথম ধাপ: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিরোধিতা এবং মিত্রদের সমর্থন দেওয়া। কিন্তু এর ওপরে আছে দ্বিতীয় ও প্রধান ধাপ: ‘হেফজে নেজাম’ বা শাসনব্যবস্থার সুরক্ষা। ব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য প্রথম ধাপের যেকোনো নীতি বদল করা সম্ভব। টিকে থাকাই আসল কথা; সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা কেবল একটি সুরক্ষাকবচ। আর প্রয়োজনে সেই ঢিল ঢিলে করা যায়।

শত্রুর সঙ্গে সমঝোতা

ইরান মুখে আদর্শের কথা বললেও নীতি নির্ধারণ করে লাভ-ক্ষতির হিসাবে। এই বৈপরীত্য মতাদর্শী রাষ্ট্রগুলোর একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তাদের জন্য মূল সমস্যা হলো, সরাসরি আপস না দেখিয়ে কীভাবে কৌশলগত ছাড় দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা।

ইতিহাস বলে, এটি তাদের জন্য অসম্ভব নয়। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে খোমেনি ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নেন। তিনি জনসমক্ষে এটিকে ‘বিষপানের চেয়েও তিক্ত’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। একই যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের হুমকি মোকাবিলায় ইরান ইসরায়েলি মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র গ্রহণ করেছিল, যা ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত। আবার ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবান-পরবর্তী সরকার গঠনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গোপনে সহযোগিতা করেছিল।

এসবের কোনোটিই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলপন্থী করে তোলেনি। কিন্তু এটি প্রমাণ করে, তাদের কঠোর নীতিগুলোর একটি বিকল্প সুইচ আছে, যার নাম—‘অস্তিত্ব রক্ষা’।

চলতি বছর এ কৌশল বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কয়েক দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁর ছেলে মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা বানিয়ে দেয়। যদিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল নীতিতে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বকে সমর্থন করা হয় না, তবু শাসনের অস্তিত্ব রক্ষা করতে এই নীতি ছাড় দেওয়া হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

গত ১৭ জুন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অর্থ ছাড় ও পুনর্গঠন সহায়তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। মোজতবা খামেনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও লিখিতভাবে এটি অনুমোদন করেন। এখানেও ক্ষমতার কেন্দ্র ঠিক রাখতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানকে ঢিলে করা হলো।

যদিও এ সমঝোতা অনেক সমস্যা দূর করতে পারেনি এবং পরে লড়াই আবার শুরু হয়, তবু এর গুরুত্ব অপরিসীম। চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্মত হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, নিজেদের নীতি না হারিয়ে কীভাবে ইরান এ চুক্তি করবে? সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা পরিত্যাগ করে নয়; বরং এর সংজ্ঞা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। ২০১৩ সালে আলী খামেনি ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। একজন কুস্তিগির যেমন কৌশলগত কারণে পেছনে হটে, এটিও ঠিক তা-ই। ইরান ছাড় দেওয়াকে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং পিছিয়ে যাওয়াকে ‘সংগ্রাম অব্যাহত রাখা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

অনুসারীরাও তা মেনে নেন। কারণ, রাষ্ট্র যখন নিজের মতো করে মতাদর্শের ব্যাখ্যা দেয়, সমর্থকেরা তা অনুসরণ করেন। ফলে সরকার তাদের লাল রেখা পার করলেও সমর্থন হারায় না।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি নিজের টিকে থাকার জন্য তার চিরশত্রুতার নীতি বিসর্জন দেবে? যাঁরা এখনো এ প্রশ্ন করছেন, তাঁদের ইরানের সংবিধানে ১৯৮৯ সালে অন্তর্ভুক্ত ১১২ অনুচ্ছেদটি আবার পড়ে দেখা দরকার। উত্তর সেখানেই আছে।

ইসলামাবাদ সমঝোতাও একই যুক্তিতে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটাকে আত্মসমর্পণ না বলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের সক্ষমতা বজায় রাখা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল। একইভাবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতা হলেও তাকে ‘ইসলামি ব্যবস্থার বেঁচে থাকার কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে।

শত্রুর সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি যুদ্ধের ঝুঁকি কমাবে এবং অর্থনৈতিক সংকট দূর করবে। সাধারণ ইরানিদের জন্য তা স্বস্তির। তবে বিদেশি চুক্তি মানেই যে দেশে স্বাধীনতা আসবে, তা নয়।

যুদ্ধের অজুহাতে সরকার ইতিমধ্যে দেশে গ্রেপ্তার, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে হয়তো মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট কিছুটা কমবে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দমননীতি কমবে না; বরং সরকারের হাতে দমন-পীড়ন জোরদার করার জন্য বাড়তি সম্পদ আসবে।

তাই ‘সংঘাত ইরানকে ধ্বংস করবে’ আর ‘কূটনীতি ইরানকে নমনীয় করবে’—এ দুই ধারণার বাইরে তৃতীয় একটি বাস্তবতা সামনে আসছে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক চুক্তি, যা তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু ইরানিদের গণতন্ত্র দেবে না। বহিরাগত আক্রমণ থেকে ইরান রক্ষা পেলেও ভেতরের জনগণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমবে না।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি নিজের টিকে থাকার জন্য তার চিরশত্রুতার নীতি বিসর্জন দেবে? যাঁরা এখনো এ প্রশ্ন করছেন, তাঁদের ইরানের সংবিধানে ১৯৮৯ সালে অন্তর্ভুক্ত ১১২ অনুচ্ছেদটি আবার পড়ে দেখা দরকার। উত্তর সেখানেই আছে।

  • হোসেন দাব্বাগ যুক্তরাজ্যের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডনের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।