ইরানের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলাকে পেন্টাগন শিশুসুলভ নাম দিয়েছে অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ (মহাকাব্যিক ক্রোধ)। এটি দুর্বিনীত ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি সহিংস শক্তির প্রদর্শন।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করছে, যেটি আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক নিয়মনীতির প্রতি খুব সামান্যই তোয়াক্কা করে। ট্রাম্পের খামখেয়ালির শুল্কনীতি কিংবা ভেনেজুয়েলার ওপর হামলার ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গেছে।
আর্থিক খাতে এই হামলার প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এতে ধীরে ধীরে হলেও ঐতিহাসিক এক পরিবর্তন আরও জোরালো হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে সরে গিয়ে এমন এক জটিল ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেটা হয়তো ওয়াশিংটনের মনঃপূত হবে না।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী ছিল। ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজারও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন বৈশ্বিক মুদ্রার বিপরীতে পরিমাপ করা ‘ট্রেড-ওয়েটেড ডলার’ গত এক বছরে ৭ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। এর একটি কারণ হলো মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার। আরেকটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত কাঠামো সম্পর্কে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সেটা আর আগের মতো স্থিতিশীল নেই।
লন্ডনে গত সপ্তাহে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ ট্রেড পলিসি আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে ডলার হঠাৎ করেই পাউন্ড স্টার্লিংকে প্রতিস্থাপন করেছিল, তেমন করে কোনো একক মুদ্রা ডলারের জায়গা নেবে না। বরং একটি বহুকেন্দ্রিক ও আরও জটিল বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
এখনো, মার্কিন ট্রেজারি এমন একটি সম্পদ, যেখানে অনেক বিনিয়োগকারী অস্থির সময়ে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু ডিডলারাইজেশনের প্রক্রিয়া নতুন গতি পেয়েছে ট্রাম্পের অস্থির শাসনের কারণে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করছে। কয়েক বছরের মধ্যে এখানে যে পরিবর্তন আসবে সেটা হয়তো ব্যাপক ঋণগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নাও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারে সম্পন্ন হলেও, চীনের রেনমিনবির ব্যবহার বাড়ছে। এটি বেইজিং সক্রিয়ভাবেই উৎসাহিত করছে।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীরবে ও ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ২০০১ সালে যেখানে বৈশ্বিক রিজার্ভের ৭১ শতাংশ ছিল ডলারে, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে ৫৭ শতাংশে।
এর বীজ বপন হয়েছিল বহু আগেই। ২০০৭–০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার চূড়ান্ত সময়ে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ নির্বাচিত কয়েকটি দেশের সঙ্গে ‘সোয়াপ লাইন’ (দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক বিনিময়ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তারা একটি মুদ্রা অন্য মুদ্রায় বদলাতে পারে) খুলে দেয়, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের মুদ্রার বিনিময়ে জরুরি ডলার পেতে পারে।
এই পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে স্বাগত পেলেও—এতে কার্যত অফশোর ডলার ব্যবস্থাই রক্ষা পেয়েছিল। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল, বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে ডলারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র কতটা বিপুল প্রভাব ও ক্ষমতার অধিকারী।
একই সময়ে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা কিংবা আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন গবেষক হেনরি ফ্যারেল ও আব্রাহাম নিউম্যান এই ঝুঁকিকে বলেছেন, ‘পারস্পরিক নির্ভরতার অস্ত্রায়ণ’।
দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যে একই সুরের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পরাশক্তিগুলো অর্থনৈতিক সংহতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে—শুল্ককে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার, আর্থিক অবকাঠামোকে জবরদস্তির মাধ্যম এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে এমন একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেটা নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যায়।’
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ওয়াশিংটন তার আর্থিক আধিপত্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে ডলারের বিকল্প খোঁজার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
প্রযুক্তিগত সমাধানের সহজপ্রাপ্যতা ডিডলারাইজেশনের (মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো বা বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া) পথে আরেকটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। এটি লেনদেন ও নিষ্পত্তির অবকাঠামোকে আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী করছে। ধাপে ধাপে নতুন আর্থিক কাঠামোও গড়ে উঠছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ঘোষণা করেছে—তারা ‘রেপো’ (রিপারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট) ব্যবস্থা জোরদার করবে; অর্থাৎ সংকটকালে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ইউরো ধার দেওয়ার স্থায়ী প্রস্তাব দেবে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দ্য কনফারেন্স বোর্ডের আলেহান্দ্রো ফিওরিতো বলেন, ‘চীন ও ইউরোপ এখন নিজেদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে বেশি ভাবছে। তাই তারা ডিজিটাল ইউরো, ডিজিটাল ইউয়ান ও রেপো লাইনে বিনিয়োগ করছে।’
ব্রিকস দেশগুলো (ব্রাজিল, চীন, ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া সদস্যরাষ্ট্রগুলো) দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের আধিপত্য কমানোর পক্ষে। যদিও ‘ব্রিকস মুদ্রা’র ধারণা এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে, তবু যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে আর্থিক সংযোগ গড়ে তোলার আলোচনা বাড়ছে।
এডিনবরা ল স্কুলের ফ্রান্সিসকো কুইন্টানা বলেন, এটি এমন এক প্রক্রিয়ার ফল, যা বিশ্বজুড়ে একইভাবে ঘটছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এত বড় নির্ভরশীলতা রাখা সব সময় ভালো সিদ্ধান্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ডলারের আধিপত্য কমে গেলে খরচ বাড়বে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারির ‘কনভিনিয়েন্স ইয়িল্ড’ বা নিরাপদ ও তরল সম্পদ হিসেবে এর সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, পাঁচ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ জিডিপির ১৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এত বড় ঋণের বোঝার প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখনো, মার্কিন ট্রেজারি এমন একটি সম্পদ, যেখানে অনেক বিনিয়োগকারী অস্থির সময়ে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু ডিডলারাইজেশনের প্রক্রিয়া নতুন গতি পেয়েছে ট্রাম্পের অস্থির শাসনের কারণে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ধীরে ধীরে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করছে। কয়েক বছরের মধ্যে এখানে যে পরিবর্তন আসবে সেটা হয়তো ব্যাপক ঋণগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নাও হতে পারে।
হিথার স্টুয়ার্ট দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত