
এবারের জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ) বসবে তুরস্কের আনাতোলিয়ায়। নভেম্বরের ৯ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত চলবে সম্মেলনটি। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক বা নির্দিষ্ট কোনো একক থিম এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে আশা করা হচ্ছে, আনাতোলিয়া সম্মেলনে ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার রোডম্যাপ এবং জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করতে খুলনা বিভাগের তিন উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের শিশুরা খুলনায় বসেছিল। পরিবর্তিত জলবায়ু তাদের জীবনে কী বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং তা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে—সেসবের হিসাব-নিকাশই ছিল খুলনার এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য। আনাতোলিয়ায় খুলনার শিশুদের প্রতিনিধিরাও যাবে।
আশাশুনি থেকে আসা এক কিশোর দুই বছর আগে লেখা একটি কবিতা শোনাল—‘এই কি জীবন’।
হরেন কাকা কয়, আমার জীবন নিয়ে ভাবি না
কিন্তু তোরা মেনে নিচ্ছিস ক্যা এই জীবনটা।
ঘরের মধ্যে জল থাকবে ছয় মাস, উঠানে নয় মাস,
গরু থাকবে ঘরে, আমরা বারান্দায়।
স্কুলে যাতি হবে গামছা পরে, বই থাকবে পলিথিনে।
কোনো দিন ক্লাস হবে, কোনো দিন না।
শুকনা গ্রামে বিকোবে ভিজে শিশুরা,
সস্তা গৃহশ্রমিক হয়ে বালিকা বধূর ছদ্মবেশে
ছোট্ট মেয়েরা পোয়াতি হবে।
ছেলেরা যাবে ইটভাটায়।
এই কি জীবন?
সুনীল লিখলে হয়তো এই কবিতা নীল আকাশে উড়ত লবণাক্ত জীবনের নীল ঝান্ডা হয়ে। এ দেশের সাগর ঘোষরা এসব কবিতা ছাপে না। কেউ ছাপুক আর না ছাপুক, এই কবিতা এখন উপকূলের যেকোনো সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত হয়ে উঠছে।
সম্মেলনে দেখা হয় শরণখোলার কয়েকজন শিশু-কিশোরের সঙ্গে। এদের কেউই সিডর দেখেনি। প্রায় ২০ বছর আগে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সেই দিনের কথা তারা ভাসা–ভাসা শুনেছে মা-বাবা আর বড়দের কাছে।
সম্মেলনের ফাঁকে তাদের কাছে ভোলা নদীর কথা জানতে চাই। কেউ চেনে না সেই নদী। একাত্তরের গনগনে সেই নদীতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের। আমি বলে যাই চাঁদপাই, জিউধরা, ধানসাগর, নাংলী, আমুরবুনিয়া, দাসের ভারানী—যেখানে গানবোটের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছিল—নানা জনপদের নাম, যেখান দিয়ে ভোলা নদী বইতে দেখেছি। কেউ চিনল না। পেছন থেকে একজন চিৎকার করে বলল, ‘মরা ভোলার কথা কচ্ছেন?’
ভোলা নদীর কথা মানুষ এ রকম ভুলেই গেছে। কেউ বলে মরা ভোলা, কেউ শুধু মরা খাল। প্রায় ৫৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদী সুন্দরবন–লোকালয় সীমান্তের পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বলেশ্বর নদে মিশেছে। বই-খাতার তথ্য অনুযায়ী, এই নদের উৎপত্তি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকার খারমা নদী থেকে। পরে এটি শরণখোলা হয়ে বলেশ্বরে মিশেছে। একসময় ভোলা নদী ধরে শরণখোলার মানুষ মোংলায় পৌঁছে যেতে পারত।
সুন্দরবনের শিশুরা থামে না। তারা বলতে থাকে, ওপর থেকে মিঠাপানি না এলে নিচের লবণাক্ত পানি সহজেই আরও ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে সুন্দরীসহ মিঠা বা কম লবণাক্ত পানিনির্ভর গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের প্রজননও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা ছাড়া পলি জমে ভোলার সঙ্গে অন্য নদীর সংযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পলি জমে ভোলার মুখ এখন বলতে গেলে বন্ধ। ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই ভোলা নদীতেই পাকিস্তানি বাহিনীর ছয়টি গানবোটের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই হয়েছিল। সরকারি উপজেলা-তথ্যেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সেই ঘটনার উল্লেখ আছে। মুক্তিযুদ্ধের আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, অন্তিম সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী বলেশ্বর ও ভোলা নদী দিয়েই পিছু হটেছিল। তার মানে, একাত্তরেও ভোলা ছিল তরতাজা, ডানপিটে এক নদী, যেখানে নৌ–সামরিক যান ছোটাছুটি করত অনর্গল।
ভোলা মরলে সুন্দরবনের কী যায়–আসে?
সম্মেলনের ফাঁকে ভাত খেতে খেতে আমাদের আলোচনা আবার ভোলায় ফিরে আসে। শেষে শিশুরা আমাকেই ডাকতে থাকে ‘ভোলা স্যার’ বলে। আমার খটমটে নামের জায়গায় মরা নদীর নাম একেবারে মন্দ নয়। নদী নদীই। ভোলা ডেকে আমার মন খারাপ হয়েছে ভেবে এক কিশোর প্রস্তাব করে, ‘তাহলে আপনাকে গাব খাঁ বা আড়িয়াল খাঁ কয়ে ডাকি।’
এতটুকু ছেলে দেখি সব নদীর নাম জানে! হাসিঠাট্টা ছেড়ে আমরা মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে ভোলায় ডুবে যাই। কথা যতই এগোয়, ততই আমি তাজ্জব হই। এই বয়সে এত কিছু জানে এই কচি ছেলেমেয়েরা!
ওপরের প্রশ্নটির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কথা বা ভাবনাগুলো যদি প্রমিত বাংলায় উপস্থাপন করা যায়, তাহলে অনেকটা এ রকম হবে।
ধানসাগরের মেয়ে আমিনা বলল, ‘ভোলা যত মরবে, ততই আগুন লাগবে।’
মনে পড়ল, প্রথম আলো ২০২৪ সালের মে মাসে বন বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছিল ২০০২ থেকে ২০২৪ সালে সুন্দরবনে ২৫টি আগুন লাগার কথা। অবশ্য একই সময়ে ডেইলি স্টার-এ বন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ২৩ বছরে ২৯টি আগুনের কথা প্রকাশ করা হয়েছিল।
আমিনা বলতে থাকে, নদী মরলে আগুনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মনে হলো, এটি সম্ভবত ভোলা নদী ভরাটের সবচেয়ে দৃশ্যমান বিপদ। ২০২৪ সালের আমুরবুনিয়া অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের জন্য ভোলা নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস। কিন্তু নদী থেকে আগুনের জায়গা ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এবং ভাটার সময় পানির সংকট আরও বেড়ে যায়। আমিনার কথায় মনে পড়ল, ২০২৪ সালের তদন্ত-সুপারিশেও ভোলা নদী ও সংযোগকারী খাল পুনঃখনন এবং নদীর পাড়ের উঁচু বাঁধ কেটে পানি প্রবেশের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল।
তা ছাড়া বনভূমি যদি স্বাভাবিকভাবে জোয়ারের পানিতে ভিজে না থাকে, তাহলে শুকনা পাতা, ডালপালা ও জৈব পদার্থের স্তর জমে যায়। সেটা একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি করে। নদী ভরাট হলে জোয়ারের পানি কম ঢোকে, বনভূমি অপেক্ষাকৃত শুকনা হয়, শুকনা পাতা ও ডাল জমে, আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং আগুন নেভানোর পানির উৎসও দূরে বা অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে।
আমিনার পর একে একে কথা বলতে থাকে হারান, মতি, কাকলি, ইসমত, সাব্বির, কানু। কানু বলে, ‘কাহা, (ভোলা স্যার থেকে আমি ততক্ষণে কাহা বা কাকু হয়ে গেছি) নদীর তলা উঁচু হয়ে গেলে শুকনোর সময় উজানের মিঠাপানি সুন্দরবনের ভেতরের নদী-খালে ঢুকতে পারে কম।’ তার মতে, লবণাক্ততা বাড়ার সেটাই বড় কারণ।
কানুর কথায় আমি চমকে উঠি। কেননা, গঙ্গা-গড়াই নদীব্যবস্থায় মিঠাপানির প্রবাহ কমার সঙ্গে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ার জোর সম্পর্ক রয়েছে। তবে সকাল থেকে অতিথি বক্তারা যে জলবায়ু পরিবর্তনকে দুষলেন?
কানুর কথায় মনে পড়ে ২০২৫ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার কথা। সেখানে সুন্দরবনে ২০১০ সালের পর চরম লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে গড়াই দিয়ে গঙ্গা বা পদ্মার মিঠাপানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার আলামত পাওয়া গেছে।
রাজশাহী, রূপপুর, ঢাকা, গোপালগঞ্জ, খুলনার চাহিদা মেটাতে পদ্মা, গড়াই, মধুমতী শেষ। সুন্দরবনের পিপাসা মিটবে কীভাবে?
সুন্দরবনের শিশুরা থামে না। তারা বলতে থাকে, ওপর থেকে মিঠাপানি না এলে নিচের লবণাক্ত পানি সহজেই আরও ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে সুন্দরীসহ মিঠা বা কম লবণাক্ত পানিনির্ভর গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের প্রজননও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা ছাড়া পলি জমে ভোলার সঙ্গে অন্য নদীর সংযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। পলি জমে ভোলার মুখ এখন বলতে গেলে বন্ধ। ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাহলে উপায়? এবার আমার আরও অবাক হওয়ার পালা। শিশুরা কয় কী?
সমস্যা শুধু জলবায়ু নয়। সমস্যা ফারাক্কা, সমস্যা যে যার মতো পদ্মা, গড়াই, মধুমতী, কুমার থেকে যত খুশি পানি তুলে নেওয়া। বন্ধ করুন এসব। কথা বলুন ফারাক্কা নিয়ে। চুক্তি তামাদি হওয়ার আগে ঠান্ডা মাথায় সেটা করতে হবে।
সম্মেলনের পরের অধিবেশনের হাঁকডাকে আমাদের কথা থেমে যায়।
ছোট্ট করে আমিনা বলে, ‘ঢাকায় গে সব ভুলে যাবেনি!’
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
wahragawher@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব