
পিস্তল হাতে গাড়ি থেকে নামছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন কয়েকজনকে ধরতে ছুটছেন। কাউকে লাথি দেওয়া হচ্ছে, পাশ থেকে গুলি করার হুমকিও শোনা যাচ্ছে।…এ দৃশ্য কোনো সিনেমার নয়। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ‘অ্যাকশন’ এটি।
মাদক নির্মূলে অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু একজন প্রতিমন্ত্রী সেই কাজ করতে গিয়ে পিস্তল হাতে নামবেন কেন? তিনি কি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য? মন্ত্রিত্ব কি কাউকে নিজের বিবেচনায় অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা দেয়? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর সদিচ্ছার কথা বললে মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, ইশরাক যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি। তাঁর বক্তব্য, সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ নির্দেশনা দেওয়া; ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। মন্ত্রীকেই অস্ত্র হাতে নামতে হলে পুলিশের কাজ কী?
এ প্রশ্নের মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক বিষয় রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা। কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একজন প্রতিমন্ত্রী নিজেই সে প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে উঠলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও কমে।
ইশরাকের দাবি, তাঁর অস্ত্রটি বৈধ। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশকে জানিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার আলাদা বিষয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের নীতিমালায় অন্যের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে।
আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র রাখার অনুমতি কাউকে অপরাধ দমনের বিশেষ ক্ষমতা দেয় না। একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য যে সীমা প্রযোজ্য, প্রতিমন্ত্রীর জন্যও তা প্রযোজ্য। একজন আইনপ্রণেতা ও সরকারি পদে থাকার কারণে তাঁর দায়িত্ব বরং বেশি। কারণ, তাঁর আচরণ অন্যদের কাছে অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ কাজ করছে না—এ অভিযোগ গুরুতর। কিন্তু অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্নটি সরকারের দিকেই ফিরে যায়। সরকার কেন পুলিশকে কার্যকর করতে পারছে না? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তিনি কি জানিয়েছেন? ব্যর্থতার জন্য কার জবাবদিহি হয়েছে? এসবের উত্তর না দিয়ে নিজে পিস্তল হাতে নেমে পড়া প্রশাসনিক সক্ষমতার পরিচয় নয়।
এ ধরনের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের অপরাধের বিষয়টিও তদন্তসাপেক্ষ। অভিযোগ উঠলেই কাউকে মারধর বা গুলি করার ভয় দেখানো যায় না। একজন প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এমন আচরণ ঘটলে তাঁর দায়িত্ব সেটি থামানো। অপরাধ দমনের উদ্যোগকে আইনসম্মত রাখাই জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের অংশ।
রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিজের আচরণ ও কর্মকাণ্ড দিয়েই অর্জন করতে হয়। ইশারকের মধ্যে সেই পরিপক্বতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েও তিনি এমন বিতর্কে জড়াচ্ছেন, যা সরকার ও দলকে অস্বস্তিতে ফেলে; সমর্থকদেরও তাঁর আচরণের পক্ষে ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়।
ইশরাকের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সীমা অতিক্রমের প্রশ্ন অবশ্য এবারই প্রথম নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ নিয়ে তাঁর কর্মকাণ্ড বিতর্ক তৈরি করেছিল। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিতে সমর্থকদের আন্দোলনে নগর ভবন তালাবদ্ধ হয়। জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবা বন্ধ হয়ে মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
মেয়র হওয়ার দাবি যৌক্তিক কি না, সেটি আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির বিষয় ছিল। সরকার গড়িমসি করে থাকলে তার সমালোচনাও প্রাপ্য। কিন্তু নাগরিকদের সেবা বন্ধ করে নিজের দাবি আদায়ের চেষ্টা কোনো বিবেচক রাজনৈতিক নেতার কাজ হতে পারে না। যাঁদের সেবা করার জন্য পদ চাইছেন, তাঁদেরই ভোগান্তিতে ফেলা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়?
শপথ না নিয়েই নগর ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে সভা করেছিলেন ইশরাক। সভার ব্যানারে তাঁকে ‘মাননীয় মেয়র’ লেখা হয়। গত বছরের জুনে প্রথম আলোয় ‘উপদেষ্টা ও “শপথবিহীন” মেয়রের বিরোধ কী বার্তা দেয়’ শিরোনামের লেখায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। সেখানে অচলাবস্থার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারে ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছিলাম।
তখন প্রশ্ন ছিল, শপথ ছাড়াই তিনি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারেন কি না। এখন প্রশ্ন, প্রতিমন্ত্রী হয়ে তিনি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে পারেন কি না। ঘটনা দুটি ভিন্ন। কিন্তু নিজের দাবিকেই কর্তৃত্বের যথেষ্ট ভিত্তি মনে করার প্রবণতায় মিল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে না মিললে তিনি যেন নিজেই বিকল্প ব্যবস্থা দাঁড় করাতে চান।
প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর জাতীয় স্মৃতিসৌধে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে স্যালুট দেওয়ার ঘটনাও সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিল। তিনি পরে ব্যাখ্যা করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই তাঁর হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে গিয়েছিল।
শহীদদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একজন প্রতিমন্ত্রীর আচরণ কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়। সেখানে পদের ভূমিকা ও আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। সমালোচনার উত্তর শুধু নিজের আবেগ দিয়ে দিলে সে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না।
স্যালুটের ঘটনা এবং অস্ত্র হাতে অভিযানের গুরুত্ব একই নয়। প্রথমটি আনুষ্ঠানিক আচরণ ও বিবেচনাবোধের প্রশ্ন। দ্বিতীয়টির সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা ও আইন সরাসরি যুক্ত। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই সমালোচনার মুখে নিজের উদ্দেশ্য ভালো ছিল—এ ব্যাখ্যার ওপর তাঁর নির্ভরতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য কোনো কাজের পদ্ধতিকে আপনা-আপনি যথার্থ করে না।
ইশরাক হোসেন বিএনপির প্রয়াত নেতা, সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। তিনি একজন জনপ্রিয় ও পরিণত রাজনীতিক ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরিস্থিতি সামলানোর অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। সেই পরিবারের সন্তান হিসেবে ইশরাক পরিচিতি ও জনগণের সমর্থন পেয়েছেন।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিজের আচরণ ও কর্মকাণ্ড দিয়েই অর্জন করতে হয়। ইশারকের মধ্যে সেই পরিপক্বতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার এবং সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েও তিনি এমন বিতর্কে জড়াচ্ছেন, যা সরকার ও দলকে অস্বস্তিতে ফেলে; সমর্থকদেরও তাঁর আচরণের পক্ষে ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়।
ইশরাকের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের সিনেমা ও রাজনৈতিক-সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত ‘দাবাং’ শব্দটির প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। দাপুটে ও নিজের শক্তিতে কাজ আদায় করতে সক্ষম ব্যক্তির ভাবমূর্তি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বলিউডের ‘দাবাং’ ছবির পুলিশ চরিত্র আইনের সীমা অতিক্রম করে নিজের পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করে।
এ ধরনের সিনেমায় ব্যক্তির শক্তি ও দাপটের সামনে আইনি প্রক্রিয়াকে প্রায়ই গৌণ করে দেখানো হয়।ইশরাকের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এ ভাবমূর্তির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে; পুলিশ কার্যকর নয়, তাই তিনি নিজেই অস্ত্র হাতে নেমে গেলেন।
এভাবে একজন নেতা নিজেকে ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে হাজির করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দৃশ্যমানতা আছে, তাৎক্ষণিক বাহবাও থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় এর মূল্য দিতে হয় প্রতিষ্ঠানকে।
প্রশ্ন হলো, ইশরাক কি সত্যিই ‘দাবাং–মন্ত্রী’ হতে চাইছেন? তাঁর উদ্দেশ্য তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে তাঁর কর্মকাণ্ডে সে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। সিনেমার দর্শক দাপুটে নায়কের জন্য হাততালি দিতে পারেন। কিন্তু নাগরিকের প্রয়োজন এমন সরকার, যেখানে নিজের নিরাপত্তা ও অধিকার পেতে কোনো দাপুটে ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকতে হয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন প্রতিমন্ত্রীর সাফল্য হাতে পিস্তল তুলে নেওয়ায় নয়; পিস্তল ছাড়াই আইনকে কার্যকর করতে পারায়।
মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
* মতামত লেখকের নিজস্ব