অভিমত–বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ–ভারত উত্তেজনা: সীমান্ত কি নাগরিকত্বের বিচারক হতে পারে

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রনীতি, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের এক কঠিন পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে, তা নিয়ে লিখেছেন এ কে এম আহসান উল্লাহ

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা-সংলগ্ন অঞ্চলের বিপরীতে সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি সীমান্ত জেলায় ‘পুশ ইন’ বা জোর করে মানুষ ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ‘অপারেশনাল ডিজ এগ্রিমেন্ট’ নয়; এর ভেতরে আছে নাগরিকত্বের রাজনীতি, পরিচয়ের সমাজতত্ত্ব, অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সীমান্তবাসীর নিরাপত্তাহীনতা এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থার সংকট।

এই সংকটকে বুঝতে হলে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত কোনো সাধারণ সীমারেখা নয়। এটি একদিকে উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের অসম্পূর্ণতা; অন্যদিকে ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, পরিবার, বাজার, নদী, জমি ও চলাচলের দীর্ঘ সামাজিক বাস্তবতার ওপর টানা একটি রাজনৈতিক রেখা।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ছিটমহল সমস্যা, নদীভাঙন, সীমান্ত হাট, অনানুষ্ঠানিক শ্রমচলাচল, গরু ও পণ্য পাচার, বিয়ে-আত্মীয়তার আন্তসীমান্ত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই সীমান্তে রাষ্ট্রের কল্পনা এবং সমাজের বাস্তবতা কখনো পুরোপুরি এক হয়নি। ফলে যখন নাগরিকত্বকে কঠোরভাবে প্রমাণের বিষয় করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে সেই মানুষগুলো, যাদের জীবন নিজেই সীমান্তের মতো তরল, জটিল ও নথিহীন।

২.

বর্তমান উত্তেজনার তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভাষাকে নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে এনেছে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা সিএএ সেই বৃহত্তর রাজনীতির আইনি রূপ।

সিএএর ঘোষিত যুক্তি হলো প্রতিবেশী তিন দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নির্দিষ্ট অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্বের পথ সহজ করা। কিন্তু এর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্র হলো এর ‘রিলিজিয়াস ফিল্টারিং’; কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হলেও মুসলমানরা সেই কাঠামোর বাইরে থাকে।

আইনটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর ‘সিম্বলিক জিওগ্রাফি’ বাংলাদেশকে সরাসরি স্পর্শ করে। কারণ, আইনটির ভাষায় বাংলাদেশকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেখান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে মানুষ ভারতে গেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল; ভারতের জন্য এটি অভ্যন্তরীণ নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা রাজনীতির অংশ।

এই জায়গাতেই সংকটের গভীরতা। সিএএ নিজে থেকে সরাসরি কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আইন নয়। কিন্তু সিএএ, এনআরসি, ‘ইলিগাল ইনফিলট্রেটর রেটরিক’ এবং সীমান্ত পুলিশিং যখন একই রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করে, তখন নাগরিকত্বের প্রশ্ন প্রশাসনিক তৎপরতা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সীমান্তবাস্তবতার সঙ্গে মিশে যায়।

যারা সিএএর আওতায় পড়ে না, বিশেষত দরিদ্র, মুসলমান, বাংলাভাষী, নথিহীন বা কম নথিযুক্ত মানুষ, তারা সহজেই সন্দেহের কাঠামোর মধ্যে পড়ে। এখানে ‘বাংলাভাষী’ পরিচয়ই অনেক সময় জাতীয়তার সন্দেহে রূপ নেয়। এর ফলে ভারতীয় মুসলমান, বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নথিহীন মানুষ—সবাই প্রশাসনিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৩.

এই সংকটের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তের সমাজতত্ত্ব এমন যে এখানে রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব সব সময় মানুষের সামাজিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারেনি।

রংপুরকোচবিহারের ছিটমহল, সিলেট–আসামমেঘালয় অঞ্চলের চলাচল, সাতক্ষীরা–উত্তর চব্বিশ পরগনা বা যশোর–নদীয়া অঞ্চলের আত্মীয়তা ও বাজার, কুড়িগ্রাম ও চরাঞ্চলের নদীভাঙন—এসব জায়গায় মানুষের জীবন বহুদিন ধরে ‘সীমান্তের ঊর্ধ্বে’ ছিল; রাষ্ট্র এসেছে পরে। রাষ্ট্র যখন আসে, তখন সে নথি, আইন, সীমানা, চেকপোস্ট, বাহিনী ও সন্দেহ নিয়ে আসে। সমাজ যখন থাকে, তখন থাকে স্মৃতি, সম্পর্ক, বেঁচে থাকা, অভাব, কাজ, ভাষা ও ভৌগোলিক দুর্বলতা। এই দুই বাস্তবতার সংঘর্ষই সীমান্ত সংকটের মূল সমাজতত্ত্ব।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি জটিল। বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশী নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের ল্যান্ড কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নদী, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ অপরিহার্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারত বৃহত্তম প্রতিবেশী, বাজার, নদী-উৎসের দেশ, নিরাপত্তা সহযোগী এবং একই সঙ্গে এক অসম শক্তির প্রতিবেশী।

ফলে সীমান্তে উত্তেজনা শুধু স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি ‘বাইলেটারাল ট্রাস্ট আর্কিটেকচার’-এর পরীক্ষা। একটি গুলি, একটি পুশ ইন, একটি ভুল বক্তব্য, একটি ভাইরাল ভিডিও অথবা একটি স্থানীয় উত্তেজনা দ্রুত জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকটকে সীমান্ত জাতীয়তাবাদের ভাষায় অনুবাদ করে—এ ঘটনাও তার বাইরে নয়।

বাংলাদেশ সরকারের করণীয় তাই বহুস্তরীয় হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, অবিলম্বে একটি ন্যাশনাল বর্ডার ইনসিডেন্ট ডকুমেন্টেশন সেল গঠন করা উচিত, যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন, মানবাধিকার কমিশন এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ আইনজীবী/বিশেষজ্ঞ যুক্ত থাকবে। প্রতিটি পুশ ইন, সীমান্ত হত্যা, নিখোঁজ ব্যক্তি, আটকে পড়া ব্যক্তি বা সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় সংঘটিত ঘটনার তারিখ, স্থান, ছবি, ভিডিও, সাক্ষ্য, নাগরিকত্বের দাবি এবং হেফাজতের ধারাবাহিকতাসহ নথিবদ্ধ করতে হবে। কূটনীতি শুধু বক্তব্যে চলে না, কূটনীতি চলে প্রমাণে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে আবেগময় প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে দৃঢ় কিন্তু প্রক্রিয়াগত কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। ভারতকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে—বাংলাদেশ তার নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করছে না; কিন্তু কোনো মানুষকে যাচাই–বাছাই ছাড়া রাতের অন্ধকারে সীমান্তের জিরো লাইনে, নদীপথে বা চাপে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া হতে হবে যথাযথভাবে নথিভুক্ত, পরিচয় ও তথ্য যাচাইকৃত, কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডভুক্ত। বাংলাদেশি প্রমাণিত হলে গ্রহণের পদ্ধতি থাকবে; বাংলাদেশি না হলে সেই ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

তৃতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ভেরিফিকেশন অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন প্রটোকল’ নবায়ন বা শক্তিশালী করা জরুরি। এতে নির্দিষ্ট সময়সীমা, বায়োমেট্রিক ও দলিলভিত্তিক পরিচয় যাচাই, পরিবার অনুসন্ধান ও শনাক্তকরণ, কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ, আপিলের বিধান, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা, নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত পেরিয়ে পুশ ইন কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। শুধু বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-স্তরের পলিটিক্যাল ওভারসাইট দরকার।

চতুর্থত, বাংলাদেশকে সীমান্তবর্তী ১১ জেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, স্থানীয় সাংবাদিক, ইমাম, শিক্ষক, নারী প্রতিনিধি ও সিভিল সোসাইটি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত, যাতে গুজব, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস বা জনতার উচ্ছৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে না পড়ে। কারণ, সীমান্ত সংকটের সঙ্গে ভুল তথ্য যুক্ত হলে তা দ্রুত সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করে। কোনো অচেনা মানুষ সীমান্তে এলে তাকে মারধর, অপমান বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে প্রশাসনিক ও মানবিক প্রক্রিয়ায় নিতে হবে।

পঞ্চমত, মানবিকতা ও সার্বভৌমত্বকে আলাদা করা যাবে না। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে বলতে হবে—জোর করে পুশ ইন সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন; একই সঙ্গে সীমান্তে আটকে পড়া নারী, শিশু, বৃদ্ধ বা অসুস্থ মানুষকে মানবিক সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক নৈতিকতার অংশ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষার নামে মানবিক নিষ্ঠুরতা দেখালে বাংলাদেশ নিজের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করবে। আবার মানবিকতার নামে যাচাই–বাছাই ছাড়া বৃহৎসংখ্যক মানুষ গ্রহণ করলে সেটিও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনগত জটিলতা বাড়াবে। সুতরাং নীতি হবেকোনো বেআইনি পুশ ইন নয়, কোনো সমষ্টিগত শাস্তি নয় এবং কোনো মানবিক সহায়তা প্রদানে বাধা নয়।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত সংকটকে কেবল ‘কে কাকে ঠেলে দিল’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে আমরা গভীরতর বিপদ দেখব না। এখানে রাষ্ট্র নাগরিকত্বকে অস্ত্র বানাতে পারে, নির্বাচন সীমান্তকে উত্তপ্ত করতে পারে, ধর্মীয় পরিচয় প্রশাসনিক সন্দেহে পরিণত হতে পারে, আর দরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রের নথির বাইরে পড়ে মানবিক শূন্যতায় হারিয়ে যেতে পারে।

৪.

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় আরও সূক্ষ্ম। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিকীকরণ করা হবে কি না, তা কূটনৈতিকভাবে বিবেচ্য। প্রথম পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় চ্যানেল, মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনা, পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের পরামর্শ-আলোচনা এবং হাইকমিশন পর্যায়ের নোট ভার্বাল’ যথেষ্ট হতে পারে।

কিন্তু যদি পুশ ইন ধারাবাহিক ও প্রমাণিত ধরনে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক মানবাধিকার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর), জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে নথিভুক্ত উদ্বেগ উপস্থাপন করতে পারে। তবে ভাষা হতে হবে সংযত, আইনসম্মত এবং প্রমাণনির্ভর; ভারতবিরোধী জনতুষ্টিবাদী অবস্থান নয়। কারণ, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান, উত্তেজনার বিস্তার নয়।

ভারত সরকারেরও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত যদি নাগরিকত্ব যাচাই করতে চায়, তা তার সার্বভৌম অধিকারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিচারিক বা প্রশাসনিক যাচাই ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, শরণার্থীকে জোর করে ফেরত না পাঠানোর নীতি, মানবিক মর্যাদা এবং ভালো প্রতিবেশীত্ব—সবকিছুর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অবৈধ অভিবাসী বললেই মানুষ অধিকারহীন হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রয়োজন; কিন্তু নিরাপত্তা যদি নথিহীন দরিদ্র মানুষের ওপর সামষ্টিক সন্দেহ হিসেবে নেমে আসে, তা আইনের শাসনের পরিবর্তে ‘পরিচয়বাদী পুলিশিং’-এ পরিণত হয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও এটি পরীক্ষা। ভারতবিরোধী আবেগ অনেক সময় সহজ রাজনৈতিক পুঁজি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা প্রমাণ, আইন, কূটনীতি, জননিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়।

বাংলাদেশ সরকারকে জনগণকে জানাতে হবে—কী ঘটছে, কোথায় ঘটছে, কতজন মানুষ জড়িত, কারা বাংলাদেশি হিসেবে যাচাই হয়েছে, কারা হয়নি, কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব রাষ্ট্রনীতিকে গ্রাস করবে। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পুশ ইন, পাচার, অবৈধ চলাচল এবং স্থানীয় দালালচক্র—সবকিছু একই বিশ্লেষণে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। প্রতিটি বিষয়ের আলাদা আইনি ও রাজনৈতিক প্রকৃতি আছে।

ভবিষ্যতের সংকট কেমন হতে পারে? তিনটি সম্ভাবনা আছে। প্রথম সম্ভাবনা, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ অনানুষ্ঠানিক পুশ ইন বন্ধ করে আনুষ্ঠানিক যাচাইকরণ ব্যবস্থায় ফিরে যাবে। এটি সবচেয়ে কাম্য।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা, নির্বাচনী রাজনীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তার চাপের কারণে ভারত বিক্ষিপ্ত পুশ ইন চালিয়ে যায়, বাংলাদেশ তা প্রতিরোধ করে এবং সীমান্তে লো ইনটেনসিটি কনফ্রন্টেশন’ চলতে পারে। এটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ঝুঁকি। তৃতীয় সম্ভাবনা, কোনো বড় ঘটনা—গুলিবর্ষণ, মৃত্যু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপমান, সাম্প্রদায়িকভাবে উপস্থাপন বা গণ–আটক—দুই দেশের জনমতকে উত্তেজিত করে বড় কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এটি এড়ানো এখনই জরুরি।

শেষ কথা হলো, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত সংকটকে কেবল কে কাকে ঠেলে দিল’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে আমরা গভীরতর বিপদ দেখব না। এখানে রাষ্ট্র নাগরিকত্বকে অস্ত্র বানাতে পারে, নির্বাচন সীমান্তকে উত্তপ্ত করতে পারে, ধর্মীয় পরিচয় প্রশাসনিক সন্দেহে পরিণত হতে পারে, আর দরিদ্র মানুষ রাষ্ট্রের নথির বাইরে পড়ে মানবিক শূন্যতায় হারিয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশকে দৃঢ়, সংযত, প্রমাণভিত্তিক ও মানবিক হতে হবে। ভারতকে শক্তিশালী প্রতিবেশী হিসেবে সংবেদনশীল, আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ, সীমান্তের মানুষ শুধু নিরাপত্তা-সমস্যা নয়; তারা ইতিহাসের সন্তান, রাষ্ট্রনীতির পরীক্ষার ক্ষেত্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার অসমাপ্ত মানবিক প্রশ্নের জীবন্ত সাক্ষ্য।

যদি দুই সরকার এই সংকটকে কেবল নিরাপত্তা বা নির্বাচনী ভাষায় বিবেচনা করে, তাহলে ভবিষ্যৎ হবে কঠিন, সন্দেহপ্রবণ ও অস্থির। কিন্তু যদি তারা এটিকে নাগরিকত্ব, মানবাধিকার, সীমান্ত–সমাজ ও প্রতিবেশী আস্থার যৌথ সমস্যা হিসেবে দেখে, তাহলে এই উত্তেজনাই একটি নতুন দ্বিপক্ষীয়, উন্নত যাচাইকরণ ব্যবস্থা এবং সীমান্ত মানুষের মর্যাদাপূর্ণ সুরক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সীমান্তের রেখা রাষ্ট্র আঁকে, কিন্তু সীমান্তের মানবিকতা রাষ্ট্রকেই রক্ষা করতে হয়।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

    মতামত লেখকের নিজস্ব