ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি

মতামত

ইরান যুদ্ধে কি মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটতে চলেছে

লেবাননে যখন ইসরায়েলের বোমা ঝরছিল, তখনই বিশ্বের অনেক দেশ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল একটি খবরে। খবরটি হলো, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং তার লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।

তবে এ স্বস্তি কোনো হঠাৎ সংযমের ফল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আচমকা নরম হয়ে যাননি। পর্দার আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তারাই পাকিস্তানকে চাপ দিয়েছিলেন একটি সমঝোতা করাতে। এতে ট্রাম্প তাঁর সেই হুমকি থেকে সরে আসার সুযোগ পান, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ইরান নতি স্বীকার না করলে তার ‘সমগ্র সভ্যতাকে ধ্বংস’ করা হবে। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি এসেছে শক্তির দাপটে নয়, বরং নিজের তৈরি সংকট সামলাতে বাধ্য হওয়ার কারণে।

পাকিস্তানের এ মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি খুবই নড়বড়ে। ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প এখন আবার প্রণালিটি অবরোধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ পুরো ঘটনাপ্রবাহ বড় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তা হলো, আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষের পথে। নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার আভাস মিলছে, যেখানে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নেতৃত্ব দিচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, চরম হুমকি আর সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থা টেকসই নয়। ট্রাম্পের সময়ে এ দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে, কিন্তু এর শেকড় আরও গভীরে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আসলে নতুন কিছু নয়। তার আগের প্রশাসনগুলোই ড্রোন হামলাকে মার্কিন শক্তির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। একইভাবে চীনের প্রতি বৈরিতা, কিউবাকে বিচ্ছিন্ন রাখা, ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় শাসনামলেরই নীতি ছিল।

গত এক বছরে মার্কিন একতরফা পদক্ষেপ আরও বেড়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ, বিদেশি সাহায্য কমিয়ে দেওয়া, গ্রিনল্যান্ডকে হুমকি দেওয়া, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ ও অযৌক্তিক যুদ্ধ—সবই এ আগ্রাসনের প্রমাণ। এর অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়াকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট বলে উল্লেখ করেছে। তবে এর প্রভাব সমান হবে না। ইতিহাসে এর মিল পাওয়া যায় সত্তরের দশকের তেলসংকটের সঙ্গে। তখন আরব দেশগুলোর অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণসংকটে ঠেলে দিয়েছিল।

তবে বর্তমান সংকট আরও বেশি মনে করিয়ে দেয় ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকটকে। তখন ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল যৌথভাবে মিসরে হামলা চালিয়ে খাল দখল করতে চেয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরকে সরাতে চেয়েছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতনের সূচনা ঘটে এবং পরে নিরপেক্ষ আন্দোলনের উত্থান ঘটে।

ইরান যদি নাসেরের পথ অনুসরণ করে, তাহলে একই ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে, খাদ্যের দাম বেড়েছে, ঋণের খরচ বাড়ছে। সীমিত জ্বালানি ও সার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলো ধনী দেশগুলোর কাছে হারবে, এটাই স্বাভাবিক।

তবে এই অসম প্রভাবই দেখিয়ে দিয়েছে, আসলে কার হাতে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে এবং সেটি জি-সেভেনের হাতে নয়। সাম্প্রতিক বৈঠকে কিছুটা হলেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সমালোচনা শোনা গেলেও, আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কেবল ‘বেসামরিকদের ওপর হামলা বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছে। ইরানের একটি স্কুলে মার্কিন বোমা হামলায় শতাধিক শিশুর মৃত্যু নিয়ে কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু কার্যকর কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের তৈরি সংকট সামলাতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সাহায্য নিতে হয়েছে। একসময় যুদ্ধবিরতির আলোচনা হতো ইউরোপের রাজধানীগুলোয়। এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি বৈঠক হয়েছে ইসলামাবাদে যা ১৯৮০ সালের পর এই প্রথম।

ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে যুক্তরাজ্য চল্লিশটির বেশি দেশকে একত্র করে ইরানকে প্রণালি খুলতে চাপ দেয়। কিন্তু এ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই অনুপস্থিত ছিল। পাকিস্তান, মিসর ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীরাও ছিল না। আলোচনায় নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়, অথচ ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিই যে এ সংকট তৈরি করেছে, সেটি স্বীকার করা হয়নি। আরও বড় কথা, ইরান যে ভবিষ্যতেও প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইতে পারে, এ বাস্তবতাও বিবেচনায় আনা হয়নি।

এখানে প্রয়োজন ছিল কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগের মতো একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা। তুরস্ক ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সেই উদ্যোগ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও শস্য রপ্তানি চালু রাখতে পেরেছিল। সেখানে রাজনৈতিক সমাধান নয়, বরং বাস্তব সহযোগিতা ছিল মূল বিষয়—পরিদর্শন, জাহাজ পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছিল।

হরমুজ প্রণালিতে এমন একটি মডেল কার্যকর করতে হলে এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা ইরানের প্রতি পশ্চিমাদের শত্রুতার বাইরে ভাবতে পারে। বাস্তবতা হলো, ইরান কখনোই অমিত্র দেশ ছাড়া অন্য দেশের জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি বুঝেছিল বলেই হয়তো তারা একদিকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে, অন্যদিকে গোপনে পাকিস্তানকে দিয়ে সমঝোতা করিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে। তাদের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিও আছে। তবু পাকিস্তান প্রথম থেকেই মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যখন বিভাজন তৈরি হয় (কেউ যুদ্ধ চায়, কেউ শান্তি) তখন পাকিস্তান সেতুবন্ধনের কাজ করেছে। তারা চীনকে যুক্ত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের হামলা কমাতে রাজি করিয়েছে এবং সৌদি আরবের ক্ষোভও নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

তারপরও পরিস্থিতি অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি ভাঙনের মুখে, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ আটকে আছে। ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্যে তেলের দাম আর বাজার ওঠানামা করছে।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক নীরব। অর্থনৈতিক পরিণতি ভয়াবহ হলেও অনেক দেশ প্রকাশ্যে সমালোচনা করার সাহস পাচ্ছে না। কারণ তারা জানে, এই প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হচ্ছে না। বরং সংকটের জন্য মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে দায়ী না করে ইরানের প্রতিক্রিয়াকেই সামনে আনা হচ্ছে।

তবু একটি সত্য স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের তৈরি সংকট সামলাতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সাহায্য নিতে হয়েছে। একসময় যুদ্ধবিরতির আলোচনা হতো ইউরোপের রাজধানীগুলোয়। এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি বৈঠক হয়েছে ইসলামাবাদে যা ১৯৮০ সালের পর এই প্রথম।

একটি প্রতিশোধপরায়ণ কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়া শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি দাঁড়াতে এখনো অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। তবু এই যুদ্ধবিরতি দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভব। সেখানে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো নিজেরাই সংকট সামলাতে সক্ষম হবে, নিজেদের শর্তে।

  • পেদ্রো আবরামোভাই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম–বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ