মতামত

নতুন বন্দোবস্তে কতটা বৈষম্যহীন দেশ পেলাম

পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ছে বিভিন্ন বিষয়ে গত বছরের সালতামামি। ২০২৫ সালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান ও জরিপগুলো দেশের সার্বিক অবস্থা বুঝতে সাহায্য করে। তাতে উঠে এসেছে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মৌলিক অধিকার ও নাগরিক সুরক্ষার ধারাবাহিক লঙ্ঘনের চিত্র, যা আমাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে।

অভ্যুত্থানের চেতনা কতখানি বেহাত হলো, সে বিষয়ে সন্দিহান করে তোলে। কেননা, জুলাইয়ের সময় ‘বৈষম্যহীন’, ‘নতুন বন্দোবস্ত’ ও ‘ইনসাফের’ জন্যই সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। দিন শেষে মানুষ শান্তি চায়, চায় জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি। এই চাওয়ার কতখানি পেলাম আমরা, তা নৈর্ব্যক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রান্তিকালীন পরিসরে জনগণ বহুমাত্রিক উপায়ে নিজের আকাঙ্ক্ষা ব্যাখ্যা করে। রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেখানে চুক্তি বা যুদ্ধবিরতিকে ‘শান্তি’ হিসেবে আখ্যা দেয়, জনগণ সেখানে শান্তি বলতে জীবন চালানোর সক্ষমতাকে বোঝে, বিমূর্ত কোনো ধারণাকে নয়।

এ বিষয়ে নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী ও শান্তি-গবেষণার জনক জোহান গালটংয়ের একটা তত্ত্ব খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি ‘শান্তিকে’ কেবল ‘নেগেটিভ পিস’ বা সহিংসতার অনুপস্থিতি হিসেবে না দেখে একে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব সক্ষমতা, কাঠামোগত বৈষম্যের অবসান, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো পজিটিভ পিসের (ইতিবাচক শান্তি) সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়া আদতে বাংলাদেশের জনগণের দৈনন্দিন জীবনে কতখানি ‘পজিটিভ পিস’ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তা আলোচনার দাবি রাখে। কেননা, বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি সমাজে শান্তি ও সমঝোতা ফেরানোর কমিশন করার দাবি একেবারেই আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ সমাজে প্রতিশোধের চক্রকে ভেঙে দৈনন্দিন জীবনে শান্তি ও সহাবস্থান চর্চার রাস্তা করে দেয় এমন কমিশন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সর্বক্ষেত্রে অভ্যুত্থানের কতিপয় নেতাকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী হতে দেখা গেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এ কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের মধ্যেও বিভাজন ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই গণ-অভ্যুত্থানের নেতাদের রাজনৈতিক দল গঠন করতে দেখা গেছে। খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে কথা বলার বদলে তাঁদের মূলত ভোটের রাজনীতিতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে দেখা গেছে। নিজ দলের গঠনতন্ত্র, জনমুখী কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিবর্তে বেশির ভাগ সময়েই তাঁরা নানা জনতুষ্টিবাদী মন্ত্র জপে গেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজির অসংখ্য ঘটনা আন্দোলনের মাহাত্ম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে জনতার আদালতে।

আমরা দেখেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বম জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরসহ ৫৯ সদস্য মাসের পর মাস ধরে বিনা বিচারে কারাবন্দী হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর চিঠি দেয় গত ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু এ বিষয়ে কি আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পেয়েছি?

তবে তাদের এই অবারিত ক্ষমতা প্রদর্শনের মূল শিকড়টি প্রোথিত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায়, যাতে বলা হয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানসংক্রান্ত কোনো ঘটনায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। পরে ২০২৫ সালে ঘোষিত ‘জুলাই সনদ’-এ গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনাগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করার বিষয়টিও সংযোজন করা হয়।

এ ছাড়া ৫ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় জুলাই আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারির সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দায়মুক্তি কি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়সীমার বাইরেও কার্যকর? 

গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির মামলায় একজন জুলাই আন্দোলনকারী নারীকে গ্রেপ্তারের পর স্বয়ং আইন উপদেষ্টা ৫ জানুয়ারি ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে জানান, অভিযুক্ত নারী দ্রুতই প্রতিকার পাবেন। কয়েক ঘণ্টা পরেই সেই নারী জামিন লাভ করেন। জামিন লাভ করা একজন ব্যক্তির আইনি অধিকার বটে, কিন্তু সরকারের আইন উপদেষ্টা যখন এভাবে একটি নির্দিষ্ট মামলা নিয়ে মন্তব্য করেন, সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেটি স্বস্তিদায়ক উদাহরণ তৈরি করে না।

আমরা দেখেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বম জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরসহ ৫৯ সদস্য মাসের পর মাস ধরে বিনা বিচারে কারাবন্দী হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর চিঠি দেয় গত ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু এ বিষয়ে কি আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পেয়েছি?

এবার চলুন ‘পোস্টলিবারেল পিস’ মডেলের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের শান্তি–শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে বিশ্লেষণ করা যাক। এটি হলো প্রচলিত উদারনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা থেকে উদ্ভূত এক ধারণা। মডেলটি মূলত উদারনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মডেলকে চ্যালেঞ্জ করে। উদারনৈতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মডেল সাধারণত নির্বাচন, সাংবিধানিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে শান্তিকে সংজ্ঞায়িত করতে চায়।

তবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও শান্তি–গবেষক অলিভার রিচমন্ডের মতে, সমাজের অভিজাত শ্রেণি দ্বারা ওপর থেকে চাপানো মডেল দিয়ে একটি দেশের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তিনি পোস্টলিবারেল পিস মডেলের মাধ্যমে শান্তিকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তৃণমূল থেকে উদ্ভূত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, যেখানে শান্তি বলতে সামাজিক ন্যায়, দৈনন্দিন নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদার উপস্থিতিকে বোঝায়।

কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সরকারের গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনে আমরা এই তৃণমূলের মানুষদের কণ্ঠ কতখানি শুনতে পেলাম? বিশিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বছরজুড়ে যা যা সংস্কার প্রস্তাব করলেন, তাতে খেটে খাওয়া মানুষের অংশীদারত্বই-বা কতটুকু? আসন্ন গণভোটের সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো কি সহজবোধ্য হয়েছে একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য? একবারও কি প্রশ্নটি করেছি আমরা? তাহলে যে নারী, যে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিক্ষার্থী বা যে রিকশাওয়ালার অংশগ্রহণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সর্বজনীন রূপ পেল, তা কি কেবল কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফুলেফেঁপে ওঠা আয়-উপার্জনের সাক্ষী হয়েই থাকল?

উদাহরণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নারীদের জীবনমান ও রাজনৈতিক উপস্থিতির দিকে যদি তাকাই, চিত্রটি বেশ হতাশাজনক। ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ছাড়াও ডিজিটাল সহিংসতা ও গণপরিবহনে যৌন সহিংসতার মাত্রাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, নারীরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবকে সবচেয়ে বড় বাধা মনে করেন। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে ৬১ শতাংশ নারী সংসদে নারীর জন্য শতকরা ৪০ ভাগ আসন চান। এমনকি প্রতিটি দলে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে সম্মতি জানিয়েছেন ৬৩ শতাংশ নারী। কিন্তু বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া মোট প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ নারী। এই নারীদের মধ্যে ৭২ জনকে বিভিন্ন দল মনোনীত করেছে এবং অন্যরা স্বতন্ত্র হিসাবে প্রার্থী হতে চান।

দুঃখজনক হলো, ৩০টির মতো রাজনৈতিক দলের কোনো নারী প্রার্থীই নেই। নতুন দল এনসিপি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার পর দলটির কেন্দ্রীয় নারী নেতারা যেভাবে পদত্যাগ করেছেন, তা দলটির দেউলিয়াপনাকেই প্রতিফলিত করে। প্রকৃতপক্ষে ২০০৮ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের সংশোধনীতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ২০২০ সালের মধ্যে সর্বস্তরে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। আমার প্রশ্নটি হলো, জুলাই আন্দোলন তাহলে কোন বৈষম্যহীনতার বাংলাদেশ উপহার দিল আমাদের?

পরিশেষে বলতে চাই, সমাজে শান্তি-সুরক্ষা ও বৈষম্যহীনতা কেবল একটি নির্দিষ্ট দলকে দমন করে কিংবা ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসেও আসবে না। একটি সমাজের ক্ষমতাকাঠামো ও বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র সেই সমাজের নারী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কেননা, এই গোষ্ঠী যেহেতু মোটাদাগে ক্ষমতার বাইরে থাকে, তাই তাদের দৈনন্দিন জীবনেই সমাজের প্রকৃত রূপ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

তাই অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের আমলনামাকে বিশ্লেষণ করতে হলে শাসক, সুবিধাভোগী ও এলিট শ্রেণির অভিজ্ঞতার আলোকে নয়; বরং নারী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করতে হবে। নয়তো তথাকথিত সংস্কার ও বন্দোবস্ত প্রকৃতপক্ষে অসম্পূর্ণ ও ভ্রান্তই থেকে যাবে।

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব