জীবন আল্লাহর দান। তারুণ্য ও যৌবন জীবনের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। যুবকেরাই যুগে যুগে সব পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিটি জাতির ইতিহাসেই দেখা যায়, তাদের মুক্তি ও শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যুবকেরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। তেমনই এক যুবক ছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.), যিনি প্রথম নিজ গোত্রের মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের কেউ কেউ বলল, আমরা শুনেছি, এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে, তাকে ইব্রাহিম বলা হয়।’ (সুরা-১৪ ইব্রাহিম, আয়াত: ৬০)
সভ্যতা-সংস্কৃতির যেকোনো উত্থান-পতনে যুবসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। কোরআনুল কারিমে বর্ণিত, আসহাবে কাহাফের ধার্মিক ব্যক্তিরাও ছিলেন যুবক। তাঁরা এক আল্লাহর ইবাদতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁদের শত্রুর হাত থেকে আল্লাহ–তাআলা রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘(হে রাসুল!) আমি আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করেছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুরা-১৮ কাহাফ, আয়াত: ১৩)
বনি ইসরাইলের যুবকেরাই প্রথম হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি ইমান এনেছিলেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাওয়াতের প্রথম দিকে অধিকাংশ যুবকই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আহ্বানে সাড়াদানকারীদের বেশির ভাগই ছিলেন যুবক।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
প্রত্যেক তরুণ ও যুবকের উচিত নিজেকে পবিত্র রেখে আল্লাহর ইবাদত ও সৎকর্মে নিয়োজিত থাকা; আল্লাহকে ভয় করা; সুন্নতে নববি অনুসরণ করা; মানুষের উপকার করা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।
যৌবনকাল মানবজীবনের মধ্যবর্তী সময়। শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে শক্তি-সামর্থ্য ও চিন্তাচেতনায় মানুষ অনেক বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে। শিশুকালে মানুষ থাকে দুর্বল আর বার্ধক্যে হয় পরনির্ভরশীল। কোরআন মজিদে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তারপর দুর্বলতার পর শক্তি দান করেছেন আর শক্তির পর আবার দিয়েছেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৫৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে সেই যুবক থাকবে, যার যৌবন অতিবাহিত হয় আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে।’ (বুখারি: ৬৬০, মুসলিম: ১০৩১)
যৌবনকালে মানুষ যতটা শুদ্ধতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে আমল করতে পারেন, বার্ধক্যে তা সম্ভব হয় না। কিয়ামতের দিন যৌবনকালের সময়ের হিসাব নেওয়া হবে। (তিরমিজি: ২৪১৬)
নবী-রাসুলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত ও রিসালাতপ্রাপ্ত হয়েছেন পরিণত যৌবনে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহ–তাআলা সমস্ত নবীদের যৌবনকালে নবুয়ত দান করেছেন আর যৌবনকালেই আলেমদের ইলম প্রদান করা হয়।’ আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তিনি (মুসা (আ.) যখন পূর্ণ যৌবনে পৌঁছালেন, তখন আমি তাঁকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম।’ (সুরা-২৮ কাসাস, আয়াত: ১৪)
যৌবনকালের ব্যাপারে বিশেষভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিয়ামতের দিনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়ার আগে আদম সন্তানের পা এক কদমও নড়তে পারবে না, তার জীবনকাল সম্পর্কে—কীভাবে তা অতিবাহিত করেছে; তার যৌবনকাল সম্পর্কে—কিসে তা ব্যয় করেছে; তার সম্পদ সম্পর্কে—কীভাবে আয় করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে এবং তার জ্ঞান সম্পর্কে—সে তা অনুসরণ করেছে কি না।’ (তিরমিজি: ২৪১৭)
আরও বলা হয়েছে, ‘তোমরা পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের আগে সুবর্ণ সুযোগ মনে করো—তোমার যৌবনকে বার্ধক্যের আগে, সুস্থতাকে অসুস্থতার আগে, অবসরকে ব্যস্ততার আগে, সচ্ছলতাকে দারিদ্র্যের আগে এবং জীবনকে মৃত্যুর আগে।’ (মুস্তাদরাক হাকিম: ৭৮৪৬)
প্রত্যেক তরুণ ও যুবকের উচিত নিজেকে পবিত্র রেখে আল্লাহর ইবাদত ও সৎকর্মে নিয়োজিত থাকা; আল্লাহকে ভয় করা; সুন্নতে নববি অনুসরণ করা; মানুষের উপকার করা, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com