
‘মানুষ অনেক মৃত্যু সহ্য করতে পারে’—ফ্র্যাঙ্ক ম্যাককোর্ট তাঁর স্মৃতিকথায় এ কথা লিখেছিলেন। তিনি আসলে এ কথার মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলেন মানুষের সহ্যশক্তির কথা। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, দারিদ্র্য, নির্যাতন, কষ্ট—সবকিছু সত্ত্বেও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু এই সহ্যশক্তির আরেক ভয়ংকর দিকও আছে। তা হলো মানুষকে অনেক কিছুই জোর করে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা যায়, এমনকি যুদ্ধও।
যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমে তা চমকে দেয়, অসহ্য লাগে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা যেন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ সেই সত্যই নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। মাসের পর মাস ধরে চলেছে ছোট ছোট হামলা, উত্তপ্ত বক্তব্য, আবার হঠাৎ করে শান্তির আশ্বাস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক টানাপোড়েন সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর ভাঙন।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, আরও গভীর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। লাখ লাখ মানুষের পেশা, আয়, ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। তার ফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ।
এখন যদিও একটি শান্তিচুক্তি হয়েছে, তার জন্য স্বস্তিও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর আগে কী ঘটেছে, সেটাও মনে রাখা জরুরি। গত এক সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি ইরানের তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ রপ্তানি হয় যে খার্গ দ্বীপ থেকে, সেটি দখল করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তারপরই তিনি ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র নাকি যুদ্ধ শেষ করে ফেলেছে।
এ ধরনের ঘোষণা ট্রাম্প প্রায় ৪০ বার দিয়েছেন। ফলে বাজারে কিছুটা ওঠানামা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ, সবাই জানত এই প্রতিশ্রুতি অনেকবারই শোনা গেছে। এই সময়জুড়ে চলেছে পাল্টাপাল্টি হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে গভীর অস্থিতিশীলতা।
শান্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে মানুষ ভুগেছে। ইরানের পাল্টা হামলায় আরবের বেশ কয়েকটি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বলে মনে করা হয়। গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনেও হামলা হয়। তার আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারেও একাধিক আঘাত এসেছে, যেখানে প্রাণহানি ঘটেছে এবং জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জীবন যেন মাঝপথে থেমে থাকে। কখনো স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে, আবার হঠাৎ থমকে যায়। সব সময়ই মাথার ওপর ঝুলে থাকে ড্রোন হামলা বা বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা।
এদিকে কাতারের তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে পারে, কিন্তু এটি যে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা এখন পরিষ্কার। ফলে সৌদি আরব নতুন করে বন্দর ও ডেটা সেন্টারের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। দুবাইও চাপে রয়েছে। অনেক বড় বিমান সংস্থা এখনো ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে। অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, আরও গভীর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। লাখ লাখ মানুষের পেশা, আয়, ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে এই অঞ্চলকে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছেন। তার ফল ভোগ করছে সাধারণ মানুষ।
এখন যুদ্ধবিরতির সংজ্ঞাটাই যেন বদলে যাচ্ছে। গাজায় গত বছরের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও প্রায় এক হাজার মানুষ মারা গেছে। লেবাননে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হয়নি। লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া। সাম্প্রতিক দুই মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন মারা গেছেন, যাঁদের এক-চতুর্থাংশের বেশি শিশু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আগের যুদ্ধবিরতির পরও হামলা চলেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানের শহরগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্র আঘাত হেনেছে।
এ পরিস্থিতি বোঝাতে ‘ভঙ্গুর’, ‘চাপের মুখে’, ‘পরীক্ষার মধ্যে’—এই ধরনের নতুন নতুন শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে হামলা, ঘটছে মৃত্যু ও ধ্বংস।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। নতুন স্বার্থ তৈরি হয়, যা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন।
নাসরিন মালিক গার্ডিয়ান পত্রিকার কলাম লেখক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।