
আজ ৮ সেপ্টেম্বর। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ইউনেসকো ১৯৬৬ সালে দিবসটি প্রবর্তন করে, আর ২০২৬ সালে এই আয়োজন পা রাখছে ষাট বছরে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
প্রতিপাদ্যটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: সাক্ষরতা কেবল পড়তে-লিখতে পারার দক্ষতা নয়, এটি একটি জাতির অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ, টেকসই উন্নয়ন ও জীবিকার সুযোগ বিস্তারের হাতিয়ার।
২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় এখন হিসাব কষছে—গত এক দশকে সাক্ষরতার অগ্রগতি কতখানি হলো, আর কতখানি বাকি রয়ে গেল।
এই হিসাবের মধ্যে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। তা হলো, শুধু পড়তে-লিখতে জানাই কি যথেষ্ট, নাকি নিজের উপার্জিত অর্থ বুদ্ধিদীপ্তভাবে ব্যবস্থাপনা করার সক্ষমতাও সমান জরুরি?
দিবসটি ঘিরে তাই সময় এসেছে সাক্ষরতা ও আর্থিক সাক্ষরতাকে একসঙ্গে বিচার করার।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার প্রায় ৮৮ শতাংশ, ২০১৫ সালের ৮৬ শতাংশ থেকে যা সামান্য বেড়েছে।
তারপরও প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনো মৌলিক সাক্ষরতা থেকে বঞ্চিত, যাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের বাস সাব-সাহারান আফ্রিকা ও মধ্য-দক্ষিণ এশিয়ায়।
এশিয়া মহাদেশের চিত্র এক নয়। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রায় সর্বজনীন সাক্ষরতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, অথচ মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এখনো পিছিয়ে, যদিও এই অঞ্চল ২০১৫ সালের ৭২ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৭৭ শতাংশে পৌঁছে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতির স্বাক্ষর রেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়াতেই এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি (প্রায় সাড়ে তিন কোটির বেশি) নিরক্ষর মানুষের বাস।
পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে দেশের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।
চার দশকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ২০২২ সালে তা ৮১ শতাংশে ওঠে, যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে—বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে—হারটি কখনো ৭৬, কখনো ৭৮ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করেছে, যা প্রশ্ন তোলে পরিমাপ পদ্ধতি ও ধারাবাহিকতা নিয়ে।
বিগত দুই দশকে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর পেছনে কাজ করছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, স্কুল-বহির্ভূত শিশু, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা-অবকাঠামোর ঘাটতি এবং নারী-পুরুষ সাক্ষরতার ব্যবধান—বর্তমানে যা প্রায় চার শতাংশ পয়েন্টের।
ফলে এখনো দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ মৌলিক সাক্ষরতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এই ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে আর্থিক সাক্ষরতায়। যিনি স্বাক্ষর দিতে পারেন না, তিনি ব্যাংক ফরম বুঝবেন কীভাবে, ঋণচুক্তির শর্ত পড়বেন কীভাবে, কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এসএমএস বার্তা যাচাই করবেন কীভাবে?
গত এক দশকে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গতি নজরকাড়া—মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহক এখন প্রায় ২৪ কোটি, ব্যাংক হিসাবধারীর হারও অর্ধেকের বেশি। কিন্তু অ্যাকাউন্ট থাকা মানেই ব্যবহারে দক্ষতা নয়।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ব্যবহারকারী শুধু টাকা পাঠানো বা রিচার্জের বাইরে যেতে পারেন না; ক্ষুদ্রবিমা, সঞ্চয়পত্র, ডিজিটাল ডিপিএস বা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো ধারণা তাঁদের কাছে এখনো অচেনা।
যিনি বর্ণ চেনেন না, তিনি প্রতারণামূলক এমএলএম প্রকল্প বা ই-কমার্স স্ক্যামের ফাঁদও ঠিক ততটাই সহজে চিনবেন না—আর বাস্তবে প্রতিবছর সাধারণ মানুষের সঞ্চয় খোয়া যাওয়ার যেসব খবর গণমাধ্যমে আসে, তার মূলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থাকে এই দ্বিমুখী অজ্ঞতা।
নারী-পুরুষ ব্যবধানও লক্ষণীয়; দেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান ক্রমবর্ধমান হলেও পারিবারিক আর্থিক সিদ্ধান্তে তাঁদের কণ্ঠস্বর এখনো সীমিত, আর তার একটি বড় কারণ শিক্ষা-সাক্ষরতায় থেকে যাওয়া লিঙ্গবৈষম্য।
তাই আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি মেটাতে চাইলে মৌলিক সাক্ষরতার ভিত মজবুত করা ছাড়া উপায় নেই।
এটি ধাপে ধাপে এগোনোর বিষয়—আগে বর্ণ চেনা, পড়া-লেখা রপ্ত করা, তারপরই সংখ্যাজ্ঞান ও আর্থিক ধারণা বোঝার সক্ষমতা তৈরি হয়।
যেসব দেশ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই বিনিয়োগ করেছে, তারাই পরবর্তীতে দ্রুত আর্থিক সাক্ষরতায় এগিয়ে গেছে।
উদাহরণ হিসেবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বলা যায়—যেখানে সর্বজনীন সাক্ষরতার পাশাপাশি স্কুলপাঠ্যক্রমেই বাজেট, সঞ্চয়, কর ও ঋণ ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও শিশুরা প্রাথমিক স্তর থেকেই অর্থ ব্যবস্থাপনার পাঠ পায়। আঞ্চলিকভাবে শ্রীলঙ্কাও একটি দৃষ্টান্ত।
তুলনামূলক উঁচু সাক্ষরতার হার দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ আর্থিক সাক্ষরতার আসনে পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই করণীয় স্পষ্ট।
প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিএসইসি ও আইডিআরএ-কে সমন্বয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় আর্থিক সাক্ষরতা কৌশলপত্র প্রণয়ন করা দরকার, যার ভিত্তি হবে মৌলিক সাক্ষরতা কর্মসূচির সঙ্গে সংযুক্তি।
দ্বিতীয়ত, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে বাজেট, ব্যাংকিং ও সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাস্তবভিত্তিক বিষয় যুক্ত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সাক্ষরতা কার্যক্রমের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতনতা কর্মসূচি সংযুক্ত করলে একই সঙ্গে দুই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
চতুর্থত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর কথাও আলাদাভাবে ভাবতে হবে, যে প্রসঙ্গে আরও একটু বিস্তারিত বলা দরকার।
পঞ্চমত, ডিজিটাল গেমিফিকেশনের মাধ্যমে তরুণদের জন্য এমন অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে অনুকরণীয় বিনিয়োগ বা বাজেট পরিকল্পনা অনুশীলন করা যায়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্কদের মৌলিক সাক্ষরতার হার মাত্র ৩ শতাংশ, আর প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষেত্রে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ১ শতাংশে—সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার তুলনায় যা প্রায় কল্পনাতীত রকম কম।
ষষ্ঠত, ঋণগ্রহীতাদের জন্য বাধ্যতামূলক আর্থিক পরামর্শ কার্যক্রম চালু করা দরকার, যাতে তাঁরা ঋণফাঁদ এড়িয়ে অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করতে পারেন।
সপ্তমত, তৃণমূলে বিনামূল্যে পরামর্শের জন্য ‘কমিউনিটি ফাইন্যান্সিয়াল ক্লিনিক’ গড়ে তোলা যায়, যেখানে স্থানীয় ব্যাংক শাখা ও এনজিও যৌথভাবে কাজ করবে; জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলও নিয়মিত ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করে এই আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রসঙ্গে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কথা আলাদাভাবে না বললে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্কদের মৌলিক সাক্ষরতার হার মাত্র ৩ শতাংশ, আর প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষেত্রে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ১ শতাংশে—সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার তুলনায় যা প্রায় কল্পনাতীত রকম কম।
ইউনেসকোর এশিয়া-প্যাসিফিক বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীরা গড়ে দুই বছরেরও কম সময় বিদ্যালয়ে কাটান, যেখানে সার্বিক জনগোষ্ঠীর গড় শিক্ষাবর্ষ তার চেয়ে অনেক বেশি।
ইউনিসেফর সহায়তায় বিবিএস পরিচালিত জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ (এনএসপিডি) ২০২১ বলছে, দেশের প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৬৫ শতাংশ প্রাথমিক ও ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত—অর্থাৎ প্রতি দশজনে ছয়জন প্রতিবন্ধী শিশুই এখনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দেশে অন্তত এক ধরনের প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন মানুষের হার মোট জনসংখ্যার ১.৪৩ শতাংশ, সংখ্যায় যা প্রায় ২৪ লাখ; সমাজসেবা অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা এখন প্রায় ৩৮ লাখে পৌঁছেছে।
এই বিপুল জনগোষ্ঠী মূলধারার শিক্ষা ও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে গেলে জাতীয় সাক্ষরতা কিংবা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—কোনোটিই প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ হবে না।
তাদের আর্থিক সাক্ষরতায় সক্ষম করে তুলতে হলে প্রথম ধাপেই দরকার প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী উপযোগী মৌলিক সাক্ষরতা উপকরণ তৈরি করা—দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল ও অডিও বই, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ভিডিও, আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বা অটিজম-আক্রান্তদের জন্য সহজবোধ্য চিত্রনির্ভর শিক্ষা উপকরণ।
এখানে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত প্রাইম ব্যাংক—দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রথমবারের মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কনজ্যুমার ও এসএমই ব্যাংকিং বিষয়ক ব্রেইল বই প্রকাশ করেছে, যা বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে, পাশাপাশি সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ভিডিও সংস্করণও যুক্ত হয়েছে।
এই মডেল দেশের অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও অনুসরণ করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি শাখায় প্রতিবন্ধী-বান্ধব কাউন্টার, স্ক্রিন-রিডার সহায়ক মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ এবং বিশেষায়িত স্কুল-কেন্দ্রিক আর্থিক সাক্ষরতা কর্মশালা চালু করা প্রয়োজন।
বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবন্ধী অধিকার সংগঠন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে পাঠ্যক্রম তৈরি করলে মৌলিক সাক্ষরতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই বাজেট, সঞ্চয় ও নিরাপদ লেনদেনের ধারণাও একই সঙ্গে শেখানো সম্ভব।
এভাবেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কেবল সাক্ষরই নন, বরং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন।
সবশেষে বলা যায়, চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক, বাংলাদেশের অর্জনও কম নয়। চার দশক আগে যে দেশে দশজনের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন নিরক্ষর, সেই দেশ আজ সাক্ষরতার হারে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যম সারিতে দাঁড়িয়েছে।
মোবাইল ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্ময়কর সম্প্রসারণ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে পিছপা হয় না—প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
সাক্ষরতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বর্ণ চেনা থেকে শুরু হওয়া যাত্রাটির প্রকৃত গন্তব্য হলো একজন মানুষের অর্থনৈতিক আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
সেই যাত্রা দীর্ঘ হলেও অসম্ভব নয়—বরং প্রতিটি নতুন উদ্যোগ, প্রতিটি ব্রেইল বই বা পাঠ্যক্রম সংস্কার আমাদের সেই আলোকিত ভবিষ্যতের কাছাকাছি নিয়ে যায়, যেখানে সাক্ষরতা ও সচ্ছলতা একসঙ্গে হাঁটবে।
এম এম মাহবুব হাসান, ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক।
* মতামত লেখকের নিজস্ব।