মাহে রমজান

রমজান: শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ

শুদ্ধাচার সামাজিক নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের সর্বোত্তম নিয়ামক। নীতিনৈতিকতা, সচ্চরিত্র, সততা ও সত্যবাদিতা মানবচরিত্রের অলংকার। রোজা হলো নৈতিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও শুদ্ধাচারের পরম শিক্ষা। রমজানে রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় রোজাদার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের বৈধ পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন। নির্জন–নিরালায়, গোপন স্থানে, এমনকি সম্পূর্ণ নিভৃত অবস্থাতেও রোজাদার পানাহার বা রোজার পরিপন্থী কোনো কাজ করেন না।

সব কাজে, সব সময় এবং সব সময় নেক আমলের জন্য কষ্টসহিষ্ণুতা এবং পাপ বর্জনের জন্য মানসিক দৃঢ় মনোবল অর্জনই রোজার মূল শিক্ষা। যদি কেউ রোজা পালন করেন কিন্তু গুনাহ থেকে বিরত থাকতে না পারেন, তবে তাঁর রোজার প্রকৃত সুফল তিনি লাভ করতে পারবেন না। আল্লাহ সত্যময়, পবিত্রতম ও প্রেমময়। তাঁর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভ করতে হলে প্রয়োজন সত্যতা, পবিত্রতা ও প্রেমময় হৃদয়। আল্লাহ পবিত্র ও সত্যপ্রিয়। সত্য ভাষণ, পবিত্র জীবন ও প্রেমময় মন আল্লাহর অতি প্রিয়।

রমজান মাস ইবাদত-বন্দেগির মাস, আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনের মাস। যাঁরা রমজান মাসেও নীতিনৈতিকতার ধার ধারেন না এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অসামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাঁরা রমজানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হন। এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা রমজান মাসকে ব্যবসার উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করেন।

কিছু ব্যবসায়ী আছেন, যাঁরা রমজানে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অন্যায় ও অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেন। আবার কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা রমজানের ঈদের রাতে কোথায় কোথায় ঘুরবেন এবং ঈদের দিন কোথায় কোথায় অযথা সময় কাটাবেন, সেই ছক কষতে থাকেন। ফলে পবিত্র ঈদের মহিমান্বিত ইবাদতের রজনীও অনর্থক হয়ে যায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মহা অন্যায় এবং রোজা ও রমজানের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

হালাল ও বৈধ অর্থসম্পদ উপার্জন এবং হালাল খাদ্য গ্রহণ করা ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। হালাল সম্পদের সঙ্গে হারাম বা অবৈধ সম্পদ যুক্ত হলে পুরো সম্পদই অপবিত্র বা হারাম হয়ে যায়। হিসাব অনুযায়ী জাকাত প্রদান না করলে সম্পদ পবিত্র হয় না; সে সম্পদ তার মালিকের জন্য হালাল থাকে না। যেসব ব্যবসায়ী রমজান মাসেও ব্যবসায়িক লেনদেনে মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন, খাদ্যে ভেজাল মেশান, ওজনে বা মাপে কম দেন, এক নম্বর জিনিস বলে দু-তিন নম্বর জিনিস ধরিয়ে দেন কিংবা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করেন, তাঁদের আয়-উপার্জনও হালাল হবে না।

উপার্জন হালাল না হলে তাঁদের রোজা, নামাজ, হজ ও জাকাতও কবুল হবে না। তাঁরা রমজানের শিক্ষা ও কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত থাকবেন। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (তিরমিজি: ১৩১৫)

মানুষকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জ্ঞান দ্বারা সম্মানিত করেছেন। মানুষ জ্ঞান দ্বারাই পরিচালিত হয়। জ্ঞানের দাবি হলো নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার। জ্ঞানের উৎস হলো তথ্য। তথ্য লাভের বা জ্ঞান প্রাপ্তির মাধ্যম হলো পঞ্চেন্দ্রিয়। পঞ্চেন্দ্রিয় তথা পাঁচটি অনুভূতি গ্রহণের যন্ত্র হলো চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক। রমজানে পঞ্চেন্দ্রিয়ের সঠিক ও সংযমী ব্যবহার নিশ্চিত করাই হলো মুখ্য লক্ষ্য। আজীবন এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা অর্জন করাই রোজার সফলতা।

সত্যতা, পবিত্রতা ও প্রেম অর্জিত হলেই সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শ্রবণ, দর্শন ও হৃদয়ের চিন্তাভাবনা—এসব কিছুর সম্পর্কেই (বিচারের দিনে) প্রশ্ন করা হবে।’ (সুরা ১৭ আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com