
ইরানে এবারের বিক্ষোভের ধরন ও নানা বাস্তবতা নিয়ে আন্দোলনের সময় দেশটি ঘুরে এসে লিখেছেন এম নাতেকনুরি (ছদ্মনাম)।
তিন সপ্তাহ ইরানে কাটিয়ে আমি ১৪ জানুয়ারি বুধবার রাতে ফিরে এসেছি। তেহরানে কাটানো সময় নিয়ে আমি এখন যে লেখা লিখছি, ধরেই নিতেন পারেন, তা আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিইনি। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খুব বিষাক্ত। সেখানকার সবকিছু আমাদেরই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার কড়া নজরদারিতে থাকে।
আমি সাধারণত ইংরেজিভাষী জগতে ইরানে কী হচ্ছে, তা নিয়ে নিজেকে কোনো মুখপাত্র বানাতে চাই না। বিষয়টা ভীষণ জটিল, আর অনেকেই ব্যক্তিগত কষ্ট আর ট্রমা থেকে কথা বলেন। কিন্তু ইরানে বিক্ষোভের সময় ফেসবুক খুলেই আমার খারাপ লেগেছে। কারণ, সেখানে আলোচনা হচ্ছে খুব সাদাকালো ভাষায়। সেখানে সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে; যদিও অনেকেই মনে কোনো দোষ না রেখেই করছে।
আমি এখানে যা লিখছি, তা এমন একজন মানুষের অবস্থান থেকে, যিনি ইরানকে গভীরভাবে ভালোবাসেন এবং ইরানের সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে কয়েক দশক গবেষণা করেছেন। আমি পাঠকদের অনুরোধ করছি, নিচের প্রতিটি বিষয়কে একসঙ্গে ধরে দেখবেন। একটিকে অপরের বিপরীতে দাঁড় করাবেন না; যেমনটা আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পড়া বহু বয়ানে দেখেছি।
ইরানের মানুষ সরকারের দুর্নীতির কারণে ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারা মনে করে, এই দুর্নীতিই বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য দায়ী। আর এই পরিস্থিতিতে অনেক মানুষের জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির সঙ্গে কয়েক দশক ধরে একের পর এক নেমে আসা দম আটকানো নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে জড়িত। আমার মতে, এসব নিষেধাজ্ঞা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে সেই বৈশ্বিক প্রবণতা, যেখানে অল্পসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত অলিগার্কের হাতে সমস্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এর দায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান (আইআরআই) এড়াতে পারে না।
ক্ষুব্ধ মানুষ দলে দলে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছে। তাদের মধ্যে আবার আরও অনেক গোষ্ঠীও ছিল, যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল এবং তারা সাধারণ প্রতিবাদকারীদের থেকে আলাদাভাবে প্রতিবাদ করছিল। আমি তেহরান, রাশত, কিশ, ইয়াজদ, শুশতার, বুশেহরসহ বিভিন্ন শহর ও জনপদে থাকা মানুষের কাছ থেকে এ বিষয়ে শুনেছি।
► ক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে আবার আরও অনেক গোষ্ঠীও ছিল, যাদের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল এবং তারা সাধারণ প্রতিবাদকারীদের থেকে আলাদা ছিল। ► যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানিদের জীবনের চেয়ে তেলাপোকার জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের আগের হস্তক্ষেপগুলোর দিকে তাকান, সেগুলো মৃত্যু, ধ্বংস, অস্থিরতা আর ছাড়া কিছুই তৈরি করেনি।
৮ ও ৯ জানুয়ারির পরের দিনগুলোতে যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের অনেকেই বলেছেন—এই প্রতিবাদগুলো আলাদা ছিল। রাস্তায় এমন কিছু প্রশিক্ষিত মানুষ ছিলেন, যাঁদের খুব নির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল। তাঁরা বিক্ষোভকে নিজেদের দখলে নেওয়ার এবং বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মতো চালিত করার চেষ্টা করছিলেন। বিক্ষোভ করার সময় আমার এক বন্ধুকে ‘জাভিদ শাহ’ (অর্থাৎ ‘রাজা চিরজীবী হোন’—রেজা পাহলভির প্রতি ইঙ্গিত) বলে স্লোগান না দেওয়ায় হুমকি দেওয়া হয়েছে।
আমি নিজে রাতের বেলা রাস্তার ওপার থেকে একজন মানুষকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু দেয়াল বেয়ে প্রশিক্ষিত সেনাদের মতো উঠতে দেখেছি। সে কী দিয়ে উঠছিল, গ্র্যাপল হুক নাকি অন্য কিছু দিয়ে, আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু এটা নিশ্চিত, ওই লোক কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আমি দিতে পারব।
কারা ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের ভেতরে মিশে ছিল—এ নিয়ে কিছু ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব আছে। সেগুলোকে আমি বিশ্বাসযোগ্য মনে করি। এর মধ্যে ছিল ইসরায়েলি সরকারের এজেন্ট, ইসরায়েল-সমর্থিত রাজতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠী, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এমইকে (মুজাহিদিন-ই খালক—যাদের ইরানের ভেতরে ব্যাপকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়) এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্র পাওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এই গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভকে নিজেদের লক্ষ্য অনুযায়ী চালিত করার চেষ্টা করছিল। প্রতিবাদকারীদের দিক থেকে যে সহিংসতার বড় অংশ দেখা গেছে, তার উৎসও মূলত তারাই।
কিছু সাধারণ মানুষ ছিলেন, যাঁরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আগ্রহভরে ইরান ইন্টারন্যাশনাল (এটি ইসরায়েলি সরকারের অর্থায়নে চালিত একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, যা প্রায়ই তথ্য বিকৃত করে বা সরাসরি ভুল তথ্য দেয়) দেখছিলেন। এই দর্শকেরা মনে করছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপই তাঁদের উদ্ধার করবে। তাঁরা আমাকে বলেছিলেন, ‘এটা তো বেঁচে থাকা নয়।’
তাঁরা ভুলভাবে বিশ্বাস করছিলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় মানুষের জীবন ভালো করার বা মানুষকে বাঁচানোর জন্য কাজ করছে। তাঁরা ভুলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, প্রবাসী গোষ্ঠীগুলো তাঁদের কামানের গোলা ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে দেখে। সামনে কী হবে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ভাবনাই ছিল না। তাঁদের কথাটা ছিল এমন—‘এই সরকারটা সরিয়ে দাও, এরপর যা হয় হোক; এর চেয়ে খারাপ কিছু তো আর হতে পারে না।’
আমি তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, ‘উঁহু, পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকার আমাদের জীবনের চেয়ে তেলাপোকার জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের আগের হস্তক্ষেপগুলোর দিকে তাকান, সেগুলো মৃত্যু, ধ্বংস, অস্থিরতা আর বিপুল শরণার্থী জনগোষ্ঠী ছাড়া কিছুই তৈরি করেনি। কিন্তু মানুষ এতটাই মরিয়া ও হতাশ এবং তাঁদের সহ্যক্ষমতার শেষ সীমা এতটাই ছাড়িয়ে গেছে যে তারা এসব কথা শুনতেই পারে না। ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এটা বোঝা যায়, কিন্তু তবু এই পথ থেকে ভালো কিছু আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই বিক্ষোভগুলো ছিল নজিরবিহীনভাবে সহিংস। ২০০৯ সাল থেকে যারা নিয়মিত প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন—এমন বহু মানুষের কাছ থেকেই আমি এ কথা শুনেছি। অনেক শহর ও জনপদে সরকারি দপ্তর, ব্যাংক ইত্যাদিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অসংখ্য দোকান লুট হয়েছে, সরকারি বাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তেহরানে মেট্রোস্টেশন ভাঙচুর করা হয়েছে।
রাস্তায় মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য কিংবা সন্দেহভাজন নিরাপত্তাকর্মীদের (যাঁদের কেউ কেউ আসলে সাধারণ মানুষ ছিলেন) ওপর নৃশংস হামলা হয়েছে। কাউকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, কাউকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কাউকে মারাত্মকভাবে পেটানো হয়েছে। কাউকে পিটিয়ে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে।
বিরোধীদের এই সহিংসতা এমন অনেক মানুষকে হতবাক করেছে, যাঁরা নিজেরাও সরকারের বিরোধী। এই আন্দোলনকে আগেরগুলোর থেকে আলাদা মনে হওয়ার এটাও ছিল বড় কারণ। কিছু শহর ও এলাকা অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও অবস্থা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। বহু এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গেছে।
তেহরানের হাসপাতালগুলোতে কাজ করেন, এমন বন্ধুরা আমাকে জানিয়েছেন, আহত ব্যক্তিরা বলছিলেন, ভিড়ের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অনেকের উচ্চারণ অস্বাভাবিক ছিল। এতে ইরানের মাটিতে বিদেশি শক্তির উপস্থিতির ধারণা আরও জোরালো হয়। যখন সবকিছু খুব গোলমেলে মনে হয়, তখন সেটিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
আমি বুশেহরের পুরোনো শহরের একটি হোটেলে ছিলাম। এটি একটি বড় পুরোনো বাড়ি। মাঝখানে খোলা উঠান। সংঘর্ষ বন্ধ হলে আমি মাঝেমধ্যে রাস্তায় বের হতাম। সেখানে আমি কাঁদানে গ্যাস, ফ্ল্যাশ-ব্যাং গ্রেনেড, গুলির শব্দ, এমনকি আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে দ্রুত গুলিবর্ষণের আওয়াজ পেয়েছি। অনেককে গুলি করতেও দেখেছি। পরদিন আমি পুড়ে যাওয়া দোকান ও ব্যাংক, লুট হওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখেছি। রাস্তায় পড়ে থাকা শটগানের গুলির খোসা দেখেছি। দেয়ালে লেখা দেখেছি—‘জাভিদ শাহ’ (শাহ জিন্দাবাদ)।
সেখানকার মানুষজন সহিংসতায় হতবাক ছিল। এক দোকানদার, যিনি আগুন লাগাতে আসা লোকদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, তিনি তাঁদের অনুরোধ করেছিলেন যেন তাঁর দোকানে আগুন না দেওয়া হয়। কারণ, তাঁর পরিবার দোকানের ওপরের তলায় থাকে। বিক্ষোভকারীরা দোকানে আগুন না দিলেও জানালা ভেঙে দোকান লুট করে। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ছোট জায়গা, আমরা সবাই সবাইকে চিনি। কিন্তু এই লোকগুলোকে আমরা চিনতাম না।’
তেহরানের হাসপাতালগুলোতে কাজ করেন, এমন বন্ধুরা আমাকে জানিয়েছেন, আহত ব্যক্তিরা বলছিলেন, ভিড়ের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অনেকের উচ্চারণ অস্বাভাবিক ছিল। এতে ইরানের মাটিতে বিদেশি শক্তির উপস্থিতির ধারণা আরও জোরালো হয়। যখন সবকিছু খুব গোলমেলে মনে হয়, তখন সেটিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বাস্তবতাও ঠিক সেটাই। ইরানে ওই সময়ে সর্বত্র ছিল গভীর বিশৃঙ্খলা।
এই বিক্ষোভের ঘটনায় স্তরের পর স্তর রয়েছে। তেহরানের বাজার এলাকা থেকে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা স্পষ্টতই অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো এর পরপরই একেবারে ভিন্ন কিছু ঘটতে শুরু করে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে। ঘটতে থাকে এমন কিছু ছোট ছোট জায়গায়, যেসব স্থানের নাম কেউ কখনো শোনেনি (যেমন লোরেস্তানের আজনা)।
এই জায়গাগুলো খুব দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সেখানে প্রতিবাদকারীদের হাতে অস্ত্র ছিল। লোরদের মতো কিছু গোষ্ঠীর হাতে ঐতিহ্যগতভাবেই অস্ত্র থাকে। তবে এখন যে আরও বেশি অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। জানুয়ারির শুরু থেকেই আমি দক্ষিণ ইরানে ভ্রমণ করছিলাম। অনেকেই আমাকে মেসেজ করে জানতে চেয়েছিল, আমি ঠিক আছি কি না। তখনো প্রতিবাদগুলো স্থানভিত্তিক ছিল এবং সরকার সংযম দেখানোর চেষ্টা করছিল। আমি মানুষকে বলেছিলাম, ‘সব ঠিক আছে।’
কিন্তু পশ্চিমা গণমাধ্যম বরাবর যা করে, এ ক্ষেত্রেও সেটাই করেছে। তারা প্রায় কোনো প্রেক্ষাপট ছাড়াই কিংবা বিকৃত প্রেক্ষাপটে সবকিছুকে আসন্ন বিপ্লব হিসেবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারা সব সময় সরকারি দুর্নীতির কথা তোলে। কিন্তু সেই দুর্নীতির আলাপকে তারা কয়েক দশক ধরে একের পর এক ইরানের ওপর নেমে আসা বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে ফেলে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রকে কার্যত এক বিশাল কালোবাজারে পরিণত করেছে। (এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মদ নিষিদ্ধকরণ যুগের কথা মনে করুন।)
এতে অবশ্যই শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিজেদের নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার দায় অবশ্যই সরকারের। কিন্তু এটিই বাস্তব প্রেক্ষাপট। পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারী অনেক মাফিয়াই পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তারপরও সরকারি ও বেসরকারি অভিজাত শ্রেণি ক্রমেই দুর্লভ হয়ে ওঠা মার্কিন ডলারের জন্য হন্যে হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে তারা আরও বেশি দেশীয় মুদ্রা ছাপাচ্ছে। এতে ইরানি রিয়ালের মূল্য দিন দিন কমছে। এর চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
পরের দিনগুলোতে (বুধবার দেশ ছাড়ার আগপর্যন্ত) শহরটা ছিল চাপা, স্তব্ধ। মানুষ যতটা পারছিল স্বাভাবিক জীবন চালানোর চেষ্টা করছিল। তারা দৈনন্দিন কাজকর্মে মন দিচ্ছিল। রাতে লোকজন কমে যেত, যদিও শনি ও রোববারের মতো একেবারে জনশূন্য ছিল না। আমি সোম ও মঙ্গলবার সন্ধ্যার শুরুতে বাইরে গিয়েছিলাম। ইন্টারনেট না থাকায় ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবন খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আমরা সবাই যেন ১৯৯৯ সালে ফিরে গিয়েছিলাম, সেভাবেই কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছিল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই বিচ্ছিন্নতা কিছুটা শান্তিও এনে দিয়েছিল। এটা আমাদের নিজেদের সঙ্গে এবং একে অপরের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে সাহায্য করেছিল। শনিবারের মধ্যেই ব্যাংকিং বা গাড়ি অর্ডারের মতো সেবার জন্য অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক চালু করা হয়।
মঙ্গলবারের দিকে কিছু মানুষ (আবারও বলি, আমি তাদের কথাই বলছি, মূলত যারা ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভি দেখছিল) মনে করতে শুরু করে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা রেজা পাহলভি হঠাৎ এসে কোনো রক্তপাত ছাড়াই তাদের শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ধার করবে। কিন্তু কিছু মানুষ (এমনকি উত্তর তেহরানের লোকজনও, যাদের মুখে এমন কথা শোনার কথা ভাবা যায় না) সাবেক যুবরাজকে গালাগালি করছিল।
অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘সে কীভাবে বিক্ষোভের ডাক দেয়, তারপর এত তরুণের মৃত্যু হয়? তার কোনো পরিকল্পনাই তো নেই।’ এই অভিযোগ আসলে অমূলক নয়। কারণ, পাহলভি আগে কখনো কোনো বড় কিছু পরিচালনা করেননি, আর নিজেও ইরানে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না বা পরিবার নিয়ে ফিরতে প্রস্তুত নন।
পাহলভিকে ঘিরে মানুষের অতিরিক্ত আশা, কিংবা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এসে সবকিছু ঠিক করে দেবে—এ ধরনের ভাবনা আসলে দেখায় মানুষ কতটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে তারা যেকোনো ভালো কিছুর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আরেক দল মানুষ, যাঁরা একটু বেশি ভাবেন বা বোঝেন, তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন সামনে কী হবে তা নিয়ে। তাঁদের আশঙ্কা, দেশে গৃহযুদ্ধ বা বড় ধরনের অরাজকতা শুরু হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেবে।
যাঁদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তাদের কেউই শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করেননি। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, ভেতরে কোনো শক্ত বিরোধী নেই, আর বাইরে নানা স্বার্থান্বেষী বিদেশি শক্তি সক্রিয়। এ অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে ভালো কোনো সরকারের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এই ভয় আমার নিজেরও। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। অনেক মানুষ এতটাই রাগে অন্ধ যে তারা এ মুহূর্তের বাস্তব ঝুঁকি আর সীমাবদ্ধতাগুলো দেখতে পাচ্ছে না। বিরোধী পক্ষ হোক বা সরকার—কারও কাছেই বাস্তবসম্মত, সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না।
● এম নাতেকনুরি ইরানি অধিকারকর্মী, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ: সারফুদ্দিন আহমদ