
প্রতিবছরের মতো এবারও মার্চের প্রথম সোমবার দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আর্থিক সাক্ষরতা দিবস’। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘আর্থিক সাক্ষরতায় সূচিত হোক নিরাপদ ক্যাশলেস লেনদেন’।
বার্তাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল অর্থ উপার্জনই যথেষ্ট নয়, অর্জিত অর্থকে কীভাবে নিরাপদ ও ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়, সেই সক্ষমতা অর্জন করাই এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একজন মানুষের পকেটে টাকা থাকলেই তিনি সচ্ছল নন, যদি না তিনি সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার জানেন। টাকা উপার্জন এবং সেই টাকাকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ বা সঞ্চয় করার মধ্যবর্তী সেতুবন্ধই হলো ‘আর্থিক সাক্ষরতা’।
সহজ কথায়, এটি এমন এক জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার আয়-ব্যয় পরিকল্পনা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি মানবপুঁজির (হিউম্যান ক্যাপিটাল) এমন এক উপাদান, যা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা মোতাবেক ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে নাগরিকদের কেবল প্রযুক্তিগতভাবে নয়, আর্থিকভাবেও দক্ষ হতে হবে।
‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস’ (এসঅ্যান্ডপি)-এর জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ৩৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আর্থিক সাক্ষরতা জ্ঞানসম্পন্ন।
এর অর্থ হলো পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সুদ, মুদ্রাস্ফীতি বা বিনিয়োগ ঝুঁকির মতো মৌলিক ধারণাগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান রাখেন না।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্ক, নরওয়ে ও সুইডেনে আর্থিক সাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাব-সাহারান আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ায় এই চিত্র উদ্বেগজনক।
সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশে এই হার ২৫ শতাংশের নিচে, যদিও বতসোয়ানার মতো কিছু দেশে এটি তুলনামূলক ভালো।
তবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে আর্থিক সাক্ষরতার হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে ভারতে ২৭ শতাংশ যা উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর গড় ৫২ শতাংশের চেয়ে অনেক কম, পাকিস্তানে ২৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশে এই হার ২৮ শতাংশ মাত্র।
আর্থিক সাক্ষরতার অভাব কেবল দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা নয়; অনেক উন্নত দেশেও মানুষ ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জালে আটকা পড়েন।
তবে পার্থক্য হলো, উন্নত দেশগুলোতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যক্তিগত ভুলের মাসুল অনেক সময় কমিয়ে দেয়, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রায় অসম্ভব।
গত এক দশকে বাংলাদেশে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’ (ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুসন) বা ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসার হার অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে ব্যাংক হিসাবধারীর হার ৫৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং এই জানুয়ারিতে এমএফএস (বিকাশ, নগদ, উপায়, রকেট) গ্রাহকসংখ্যা ২৩ কোটি ৯৩ লাখে দাঁড়িয়েছে, যা সার্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে গতিশীল করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেবায় প্রবেশাধিকার (অ্যাকসেস টু সার্ভিস) আর সেবা ব্যবহারের দক্ষতা (ক্যাপাসিটি) কি একই? সোজা উত্তর হলো—না।
দেশে সাধারণ সাক্ষরতার হার ৭৯ শতাংশ হলেও সেখানে আর্থিক সাক্ষরতার হার হতাশাজনকভাবে মাত্র ২৮ শতাংশ।
অধিকাংশ এমএফএস ব্যবহারকারী কেবল টাকা পাঠানো বা রিচার্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ক্ষুদ্র বিমা, সঞ্চয়পত্র, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিজিটাল ডিপিএস সম্পর্কে ধারণা এখনো অস্পষ্ট।
আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি ঠিকই, কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের ভাগ্য বদলানোর মতো ‘আর্থিক জ্ঞান’ এখনো অর্জন করতে পারিনি।
ফলে দেশের তিন কোটি মানুষ এখনো ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের আর্থিক সাক্ষরতা বিস্তারের পথে মূলত চারটি প্রধান বাধা রয়েছে—
১. শিক্ষাক্রমের সীমাবদ্ধতা: প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কোথাও ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা (পার্সোনাল ফিন্যান্স) শেখানো হয় না।
ফলে একজন তরুণ চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সঞ্চয়, কর বা মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলা সম্পর্কে কোনো দিশা পান না। অথচ কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুরের শিশুদের স্কুলজীবন থেকেই অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়।
২. আচরণগত পক্ষপাত (বিহেভিওরাল বায়াস): মানুষ অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার চেয়ে তাৎক্ষণিক ভোগকে প্রাধান্য দেয়। একটি ‘জরুরি তহবিল’ গঠন বা বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয়ের অভ্যাস আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো দৃঢ় হয়নি।
৩. নিরাপত্তা ও প্রতারণার ফাঁদ: ই-কমার্স কেলেঙ্কারি বা এমএলএম-এর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মূলে রয়েছে অতিরিক্ত মুনাফার লোভ ও আর্থিক অসচেতনতা। পিন বা ওটিপি শেয়ার করার ঝুঁকি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না থাকায় শিক্ষিত মানুষও সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন।
৪. জেন্ডার গ্যাপ: নারীরা পারিবারিক অর্থনীতির চালিকা শক্তি হলেও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাঁদের কম। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা অপচয় হবে।
আর্থিক সাক্ষরতাকে একটি ‘জাতীয় মিশন’ হিসেবে বিবেচনা করে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে—
• জাতীয় কৌশল প্রণয়ন: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও আইডিআরএর সমন্বয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জাতীয় আর্থিক সাক্ষরতা কৌশল’ তৈরি করা।
• শিক্ষাক্রম সংস্কার: ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে বাজেট তৈরি, ব্যাংকিং লেনদেন ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা।
• ডিজিটাল গেমিফিকেশন: তরুণদের জন্য অ্যাপ বা শিক্ষামূলক গেম তৈরি করা, যেখানে কাল্পনিক বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা বাস্তব জীবনের আর্থিক পাঠ শিখবে।
• বাধ্যতামূলক আর্থিক কাউন্সেলিং: ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহককে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা ‘ঋণের জালে’ আটকা না পড়ে।
• কমিউনিটি ফাইন্যান্সিয়াল ক্লিনিক: তৃণমূল পর্যায়ে বিনা মূল্যে আর্থিক পরিকল্পনা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শকেন্দ্র স্থাপন করা।
• গণমাধ্যমের ভূমিকা: সংবাদপত্র ও টিভিতে নিয়মিত ‘ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক কলাম বা প্রোগ্রাম প্রচার করা।
• নারীদের অগ্রাধিকার: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ডিজিটাল টুলস ও প্রশিক্ষণ তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি-বেসরকারি সুযোগগুলো তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল অবকাঠামো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অর্থনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক। এই দিবসটিকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে একটি গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। আর্থিক সাক্ষরতার বাইরে থাকা প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষের দোরগোড়ায় এই জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারলেই আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে।
পরিশেষে, মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক ও উদ্ভাবক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, ‘জ্ঞানে বিনিয়োগই সর্বোচ্চ মুনাফা দেয়।’
আর্থিক সাক্ষরতা হলো সেই ব্যবহারিক জ্ঞান, যা কেবল ব্যক্তিকে দারিদ্র্য থেকে বাঁচায় না, বরং সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল অবকাঠামো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অর্থনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক।
এই দিবসটিকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে একটি গণ-আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। আর্থিক সাক্ষরতার বাইরে থাকা প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষের দোরগোড়ায় এই জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারলেই আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম হবে।
এম এম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক