একজন শিক্ষককে ক্লাস থেকে সরিয়ে দিতে কত সময় লাগে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ সম্প্রতি এর উত্তর দিয়েছে। এক রাতেরও কম।
প্রায় ৩৪ বছর ধরে তিনি পড়াচ্ছেন। এক মঙ্গলবার মাস্টার্সের ক্লাসে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা হয়। বৃহস্পতিবার তিনি জানলেন, তাঁর সব কোর্স অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেউ তাঁর কাছে জানতে চায়নি, সেদিন আসলে কী হয়েছিল।
একটি ক্লাসে কয়েক মিনিটের কথোপকথন হয়েছে। তা নিয়ে জাতীয় দৈনিকে মতামত কলাম কেন? প্রশ্নটা উঠতেই পারে। উত্তর হলো, ঘটনাটি আর ওই ক্লাসে আটকে নেই। এটি এখন দেশের সবচেয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যা করে, অন্যরা তা নজির হিসেবে ধরে নেয়। ঘটনাটি বিচ্ছিন্নও নয়।
কয়েক মাস আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের বিতর্কে দুই শিক্ষকের চাকরি গেছে। আর প্রশ্নটা শুধু একজন শিক্ষকের নয়। দেশের লাখো শিক্ষার্থী আর হাজারো শিক্ষক প্রতিদিন ক্লাসে ঢোকেন। কাল যে কারও সঙ্গে এটা ঘটতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আমরা বহুমতের অন্তর্ভুক্তিমূলক যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার পরীক্ষা হচ্ছে এই শ্রেণিকক্ষে।
এই লেখা কারও পক্ষে সাফাই নয়। প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এই বিতর্ক কি নিকাব নিয়ে? নাকি শ্রেণিকক্ষটা কার, সেই প্রশ্ন নিয়ে? আমার বিবেচনায় দ্বিতীয়টি।
সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুব সেদিন কী বলেছিলেন, তা নিয়ে দুটি ভাষ্য আছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি নিকাব ও পর্দার ধরন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। শিক্ষক তাঁর ভিডিও বার্তায় বলছেন, চোখ দেখা না যাওয়ায় শনাক্ত করা ও যোগাযোগে অসুবিধার কথা বলেছিলেন, এর বেশি কিছু নয়। কোনটি সত্য, আমি জানি না। যাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁরাও জানার চেষ্টা করেননি।
একটি কথা অবশ্য স্বীকার করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কষ্ট পেয়ে ক্লাস ছেড়েছেন। সেই কষ্ট বাস্তব। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, সবার সামনে কারও পোশাক নিয়ে কথা বলা শিক্ষকসুলভ বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। ভুল হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ভুলের প্রতিকার আর ভুলকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো এক জিনিস নয়।
এবার প্রক্রিয়ার কথায় আসা যাক। ন্যায়বিচারের প্রাথমিক পাঠ সবার জানা। অভিযোগ লিখিতভাবে আসবে। অভিযুক্ত তা জানবেন এবং বলার সুযোগ পাবেন। একটি নিরপেক্ষ কমিটি সাক্ষ্য দেখবে। তারপর সিদ্ধান্ত হবে, আর সেই সিদ্ধান্ত অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এখানে এর একটিও মানা হয়নি। বিভাগের জরুরি সভা ডাকা হয়েছিল আগের সন্ধ্যায়। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ প্রশাসনে পৌঁছায় পরদিন দুপুরে। অর্থাৎ ‘রায়’ প্রস্তুত ছিল, ‘মামলা’ দায়ের হয়েছে পরে।
কেউ বলবেন, এটা তো সাময়িক অব্যাহতি মাত্র। কিন্তু একজন শিক্ষকের কাছ থেকে ক্লাস কেড়ে নেওয়ার চেয়ে বড় শাস্তি কমই আছে। আর তা ঘটেছে প্রকাশ্যে। পরে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও তাঁর সম্মান কি ফেরত আসবে?
শ্রেণিকক্ষটা কার? এটা শিক্ষকের একার নয়। শিক্ষার্থীরও একার নয়। ফেসবুকের তো নয়ই। এটা ফিরিয়ে নিতে হবে আমাদেরই, শিক্ষক আর শিক্ষার্থী মিলে। নিকাব পরা মুখ আর খোলা মুখ একই ক্লাসে পাশাপাশি থাকতে পারে। থাকতে পারে না কেবল ভয়।
দায় শুধু বিভাগের নয়। শিক্ষকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের, বিভাগের একার নয়। প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু বিভাগকে থামিয়ে নিয়মের পথে আনেনি। অন্তত প্রকাশ্যে কোনো তদন্ত কমিটির খবর আমরা পাইনি। যে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আদেশের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গর্ব করে, সে-ই যদি ফেসবুকের রায় কার্যকর করার দপ্তর হয়ে যায়, তাহলে স্বায়ত্তশাসনের মানে কী থাকে?
বিদ্যায়তনে শিক্ষা-ইকোসিস্টেমের প্রধান অংশ হলো শ্রেণিকক্ষ, যেখানে শিখন উৎপাদিত হয়। ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি শিক্ষাকে দেখেছিলেন সংলাপ হিসেবে। শিক্ষক জ্ঞান ঢালবেন আর শিক্ষার্থী জমা রাখবে, এমন ব্যাংকিং মডেল তাঁর কাছে ছিল শিক্ষার মৃত্যু। কিন্তু সংলাপের আগে আসে যোগাযোগ।
আর শ্রেণিকক্ষে যোগাযোগের প্রথম ভাষা চোখ। চোখ দেখে শিক্ষক বোঝেন কে বুঝল, কে হারিয়ে গেল, কে প্রশ্ন করতে চেয়েও চুপ করে আছে। তবে চোখের যোগাযোগ চাওয়া আর পোশাক নিয়ে উপদেশ দেওয়া এক কথা নয়। এই সীমারেখাটা শিক্ষককেই টানতে হয়।
বস্তুত, শ্রেণিকক্ষই সেই জায়গা, যেখানে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু তার শর্ত হলো আস্থা। আমি যদি জানি আমার প্রতিটি বাক্য গোপনে রেকর্ড হচ্ছে, কেটেছেঁটে ফেসবুকে উঠবে, তাহলে আমি আর ভাবতে ভাবতে কথা বলব না। মেপে মেপে বলব। শিক্ষার্থীও তা-ই করবে। তখন ক্লাস থাকবে, কিন্তু শিক্ষা থাকবে না। আমার নিজের ক্লাসেও রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ পরিবর্তন নিয়ে তর্ক হয়। কখনো আমরা একমত হই না। একমত না হয়েও একসঙ্গে বসে থাকা, এটাও শ্রেণিকক্ষের সৌন্দর্য।
যে পোশাকে পরিচয় শনাক্ত করা যায় না, তা নিয়ে একটি স্পষ্ট নীতিমালা এখন জরুরি। এই সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রশাসনের দীর্ঘ নীরবতাই শিক্ষক আর শিক্ষার্থী দুজনকে এই ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এই নীরবতার সুযোগ নিচ্ছে একটি চেনা ছক। প্রথমে খণ্ডিত ভিডিও আসে। তারপর ফেসবুকের বেনামি অ্যাকাউন্টে ঝড় ওঠে, সঙ্গে থাকে ধর্মীয় অনুভূতির ভাষা। এরপর মানববন্ধন হয়, ওঠে বহিষ্কারের দাবি। অভ্যুত্থানের পর উগ্র রাজনীতির একটি অংশ নতুন করে সামনে আসছে। তাদের প্রথম নিশানা প্রশ্ন তোলা শিক্ষকেরা। কারণ, প্রশ্নই তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।
একটি কথা প্রায় কেউ বলছেন না। এই প্রক্রিয়াহীনতায় হয়তো সবচেয়ে বেশি হারালেন সেই শিক্ষার্থী নিজেই। তাঁর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, খারিজও হয়নি। তাঁর কষ্ট এখন মিছিলের স্লোগান আর রাজনীতির পুঁজি। যথাযথ প্রক্রিয়া কেবল অভিযুক্তের রক্ষাকবচ নয়। এটি অভিযোগকারীর মর্যাদাও।
তাহলে শ্রেণিকক্ষটা কার? এটা শিক্ষকের একার নয়। শিক্ষার্থীরও একার নয়। ফেসবুকের তো নয়ই। এটা ফিরিয়ে নিতে হবে আমাদেরই, শিক্ষক আর শিক্ষার্থী মিলে। নিকাব পরা মুখ আর খোলা মুখ একই ক্লাসে পাশাপাশি থাকতে পারে। থাকতে পারে না কেবল ভয়।
● কাজী মারুফুল ইসলাম অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব