বিদ্যালয় শিক্ষা এখন প্রায় অচল। যদি অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষাক্রমে নির্দিষ্ট পড়া, লেখা ও গণিতের ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তবে বিদ্যালয়ব্যবস্থা সচল আছে বলা যায় কি? এই পরিস্থিতি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি।
অন্তত গত তিন দশকে শিক্ষায় বিনিয়োগ ও উন্নয়নের নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আর এসবের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাও পুঞ্জীভূত হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে পিইডিপি এক থেকে চার পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্প এবং মাধ্যমিক স্তরে কয়েক দফায় মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প ও শিক্ষক মানোন্নয়ন প্রকল্প পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও।
পশ্চাৎ-দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বলা যায়, বিদ্যালয় শিক্ষার উপখাতভিত্তিক সামগ্রিক প্রকল্প হিসেবে বর্ণিত হলেও এগুলো ছিল বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সমাহার—অবকাঠামো তৈরি, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ নিরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। শিক্ষার মান, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যের নামে বিভিন্ন বিনিয়োগের ক্ষেত্র স্থির করা হলেও এসব নানা উদ্যোগ কীভাবে বিদ্যালয়ে ও শ্রেণিকক্ষে প্রতিফলিত হবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিতভাবে অবদান রাখবে, অতি কেন্দ্রায়িত ও মাথাভারী প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় তা সুস্পষ্ট করা হয়নি এবং সম্ভব হয়নি।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের তালিকা করে কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তালিকার ছকের প্রতি ঘরে টিক চিহ্ন দিয়ে জানানো হয়েছে, কাজ সমাধা হয়েছে। সব ক্ষেত্রে যে তা হয়েছে বা সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা–ও নয়। প্রতি প্রকল্পের সময় একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে এবং তবু বড় অঙ্কের বরাদ্দ অর্থ কাজে লাগানো যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রকল্প অধিকাংশ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করলেও এসবের ফলাফল বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অর্জনে দেখা যায়নি। এ যেন অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে, কিন্তু রোগী মারা গেছে।
এখন প্রাথমিক স্তরে পিইডিপি ৫–এর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাধ্যকি স্তরেও হয়তো নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব উদ্যোগে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে, পূর্বের দুর্বলতা ও ব্যর্থতা পরিহার করে, গত তিন দশকে যেভাবে শিক্ষার কাজ চলেছে, তাতে কী পরিবর্তন ঘটবে, তা–ই বড় প্রশ্ন।
অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে পাঠ গ্রহণ করে কিছু ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী ভাবনা ধারণ করে এগোতে হবে। বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ও সক্ষমতার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্ভব হবে না
নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার গুরুত্ব ও এ ব্যাপারে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ইশতেহারে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক এজেন্ডায় বিদ্যালয় শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ ও কিছু করার আগ্রহ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
শিক্ষাসচেতন নাগরিক ও অনেক শিক্ষাবিদের প্রশ্ন, সরকারে অগ্রাধিকারের যে বিষয়গুলো সামনে আনা হয়েছে এবং যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা শিক্ষার প্রধান সমস্যার ক্ষেত্রগুলোতে পরিবর্তন ঘটাবে কি না এবং অতি জরুরি মৌলিক সংস্কারের সূচনা হবে কি না। সরকারের কিছু বক্তব্য ও পদক্ষেপ এ প্রশ্নের জন্ম দেয়।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে তাঁর এক বক্তব্যে বলেছেন (নিশ্চয় তাঁর উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের পরামর্শে), শিক্ষা উন্নয়নে ৪৩টি ক্ষেত্রে কাজ করা হচ্ছে। এত ক্ষেত্র ধরে কাজ করতে হলে নানা বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত ও আংশিক পদক্ষেপ গ্রহণের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা এ পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার এক বড় দুর্বলতা। এসব একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনায় রূপ নেবে কি না, সে প্রশ্ন থেকে যায়। এ রকম কোনো সংস্কারকাঠামো তৈরি ও উদ্যোগের কথা স্পষ্ট করা হয়নি।
সব বিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও তৃতীয় বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের পর্যালোচনায় জেনারেল এরশাদের আদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে ইংরেজি পড়ানোর চেষ্টা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সময়ের অপচয় ও সীমিত পাঠের সময়ের অপব্যবহার বলে প্রতিভাত হয়েছে। বিশেষত যখন অধিকাংশ প্রাথমিক শিক্ষকের নিজেদেরই ইংরেজি দক্ষতা নেই।
প্রাথমিক স্তরে নিজের ভাষায় ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কাজটি আমরা এখনো করতে পারছি না। বাংলাদেশের প্রতি শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরের শেষে বাংলা ও ইংরেজিতে পারদর্শী হবে, তা–ই আমাদের লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন এবং সে জন্য যথার্থ পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয় ভাষার সুযোগও তৈরি করা দরকার, কিন্তু তা সবার জন্য কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করার সক্ষমতা আমাদের নেই।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যকর করার চেয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে নানা পর্যালোচনার পর প্রাথমিক পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তা সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক নয়; বরং পিছিয়ে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সময় ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষা চালু করলে প্রতি এলাকার শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য ছাড়াও ভর্তি–বাণিজ্য ও কোচিং–বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার লক্ষ্য প্রশংসনীয়। তবে এ জন্য অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় আনার প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রায় সাত শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ থেকে দেখা গেছে, তা কার্যকর হয়নি এবং নানা সমস্যার সৃষ্টি করেছে। বরং মধ্য মেয়াদে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো পুরো বিদ্যালয় শিক্ষাকে একই মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে আনা দরকার এবং ধাপে ধাপে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় প্রাক্-প্রাথমিক থেকে প্রাক্-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সর্বজনীন ও অবৈতনিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষায় অগ্রাধিকারের দৃষ্টান্ত হিসেবে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীদের পোশাক, জুতা ও স্কুলব্যাগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষা কলেজ পর্যন্ত অবৈতনিক করা হবে। উপবৃত্তি বৃদ্ধির কথা আলোচনায় এসেছে। এসব পদক্ষেপ শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে আকৃষ্ট করার চেষ্টা। এসবের প্রয়োজন নেই, তা নয়, কিন্তু বড় প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষে ও বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান উন্নত করা এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য আকর্ষণীয় ও অর্থবহ করা।
শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কার্যসূচি গ্রহণ করা হবে। বিদ্যালয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার ও শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার এ পর্যন্ত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা কার্যকর হয়নি। শিক্ষকের সংখ্যা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আশু ও দীর্ঘমেয়াদি অনেক কিছু করণীয় আছে। এ জন্য সামগ্রিক ও সমন্বিত কার্যক্রম তৈরি করা দরকার। প্রযুক্তিকেও কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু চমক লাগানো কোনো একক প্রযুক্তি পদক্ষেপ থেকে শিগগির অনেক ফল পাওয়া আমাদের বাস্তবতায় সম্ভব বলে মনে হয় না।
স্কুল মিল চালুর কথা বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এই বড় কাজ দক্ষতার সঙ্গে ও মান রক্ষা করে করতে হবে। ইতিমধ্যে নানা দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় কমিউনিটি ও শিক্ষা এনজিওদের যুক্ত রাখলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় মাপের কিছু লক্ষ্য স্থির করে সব পদক্ষেপকে এই প্রধান লক্ষ্যগুলোসহ সমান্বিত এক সংস্কারকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই প্রধান লক্ষ্যগুলোতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে থাকবে:
—প্রতি বিদ্যালয়ে ও শ্রেণিকক্ষে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে শিক্ষক দল শিক্ষণ-শিখনের উন্নতির আশু ও মধ্যমেয়াদি কার্যসূচি তৈরি করবেন এবং তাঁরা শিক্ষার্থীর দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন।
—শ্রেণির অধিকাংশ পিছিয়ে থাকা শিশুর জন্য নিরাময়মূলক পাঠদানের ব্যবস্থা নিয়মিত পাঠদান সময়ের বাইরেও বিদ্যালয়ের মধ্যে করা হবে।
—পরিবারের দারিদ্র্য মানসম্মত বিদ্যালয় শিক্ষায় অংশগ্রহণে যেন বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।
—এসব লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় নীতি ও কৌশলের আলোকে এলাকা (উপজেলা) ও বিদ্যালয়ভিত্তিক বিকেন্দ্রায়িত পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে পাঠ গ্রহণ করে কিছু ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী ভাবনা ধারণ করে এগোতে হবে। বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো ও সক্ষমতার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
সামগ্রিকভাবে বিদ্যালয় শিক্ষা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে আশু ও মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম তৈরির দিকনির্দেশনার জন্য একটি উচ্চ মর্যাদার বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার। এই টাস্কফোর্সের কাজ নানা কায়েমি স্বার্থের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবে। এসব বাধা উত্তরণে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার থাকতে হবে।
ড. মনজুর আহমদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব