মতামত

কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা যেভাবে সামাজিক সম্পর্কগুলো বদলে দেয়

দীর্ঘ সময় একটি কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় জীবনযাপন জনপরিসরে আমাদের সামাজিক সম্পর্ককে নানাভাবে বদলে দিচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক পটভূমিতে রয়ে যায়। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ইউর্গেন হাবারমাস জনপরিসর বলতে সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে বোঝান, যেখানে নাগরিকেরা মুক্তভাবে মতপ্রকাশ, তর্কবিতর্ক ও আলোচনা করতে পারে।

সংবাদপত্র, টেলিভিশন টক শো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডা ইত্যাদি জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা জনগণের সেই জনপরিসরকে সীমিত করে এবং সামাজিক সম্পর্ককে নানাভাবে সংকুচিত করে, যার অভিজ্ঞতা আমাদের বিগত দশকজুড়ে ছিল।

যখন একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় দেশের মানুষ লম্বা সময় বসবাস করতে থাকে, তখন শাসক গোষ্ঠীর আশপাশে এমন একটি শোষণমূলক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে, যা সেই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে। সুবিধাভোগী নাগরিক সমাজ তেমনই একটি শ্রেণি, যারা মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানা বয়ান তৈরি করে এবং সেই বয়ানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি তৈরি করে, যে বৈধতার মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে একটি দানবে রূপান্তরিত হয়।

এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশাজীবী দলও এই শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে যায়। এর ফলস্বরূপ আমরা বিগত দশকে সমাজে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাবিরোধী শক্তিশালী কিংবা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তেমন একটা দেখতে পাইনি। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও দমন-পীড়নের ভয়ের সংস্কৃতি ও চাপের কারণে ভিন্নমত প্রকাশ বিগত সময়ে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চূড়ান্তভাবে খর্ব হওয়ার কারণে সমাজের মানুষ জনপরিসরে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অবচেতন মনেই একধরনের সেলফ সেন্সরশিপের প্রয়োগ ঘটায়, যে প্রবণতা আমরা লেখালেখি থেকে শুরু করে মতপ্রকাশের সব পাটাতনে দেখতে পাই।

এ ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চর্চা ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি স্তরে এমনভাবে বিস্তৃত হতে শুরু করে, যেখানে সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাই যে আমাদের জন্য একটি স্থায়ী ও কাম্য ব্যবস্থা, তা জনপরিসরে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। সুবিধাভোগী হওয়ার কারণে তারা ধরেই নেয় যে এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা আমাদের সামনে নেই। আর তাই হয়তো আমরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকে যখন বুঝতে পারলাম যে আওয়ামী কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতন আসন্ন, তখন সেই সুবিধাভোগী অংশ এই পতনকে আর মেনে নিতে পারল না।

ফলে তারা রাজনৈতিক মতাদর্শগত ভিন্ন লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও দ্বিধা করেনি, যা আমাদের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে একটি বড় বদল নিয়ে এসেছে। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক বদলে যাওয়া থেকে শুরু করে কর্মস্থলের সহকর্মীদের মধ্যে একধরনের দ্বিধা দৃশ্যমান। মানুষকে এখন প্রাথমিকভাবে ‘ভালো বন্ধু বা ভালো সহকর্মী’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না, বরং একজনকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কোন একটি দলের অনুসারীর ভিত্তিতে।

আমাদের প্রতিদিনকার সম্পর্কের ওপর এমন নানা নেতিবাচক প্রভাব আমরা এর মধ্য দিয়ে লক্ষ করি। আমরা আরও লক্ষ করি যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ভেঙে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মাত্র পোস্ট বা মন্তব্যের কারণে। আমাদর দৈনন্দিন জীবনে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে যেন একধরনের নীরব শত্রুতা শুরু হয়, যা একটা সময় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত ছিল, এখন তাকে আমরা দেখতে পাই আমাদের সামাজিক ও জনপরিসরে।

ফলে রাজনৈতিক ভিন্নমত বা মতাদর্শকে আর বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না; তাকে একধরনের নৈতিক বিভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ক্ষমতাবানদের জন্য সাফল্য আর ক্ষমতাহীনদের জন্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আর এভাবে প্রভাবশালীর মতের বাইরে যারা থাকে, তাদের ‘অন্যকরণের’ একটি প্রক্রিয়া চলমান ও দৃশ্যমান। এর মধ্য দিয়ে ‘অন্যদের‘ নৈতিকভাবে অবিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয়, যা আমরা বিগত সময়ে দেখেছি। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, সেই অন্যকরণের প্রক্রিয়া এখনো রয়ে গেছে এই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না এবং কাম্য নয়।

গণ-অভ্যুত্থানের বছর পেরিয়ে একটি নির্বাচনের সম্মুখে দাঁড়িয়েও আমরা দেখি এক ভিন্ন পরিস্থিতি। প্রতিশোধের রাজনীতির কারণে বিগত সময়ের বিপরীতে এখন নতুন একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে, যাদের চিন্তা ও আচরণ যেন কর্তৃত্ববাদীদের আচরণকেই অনুসরণ করে। ফলে সমাজের ভিন্নমতাবলম্বীদের অন্তর্ভুক্তির কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখি না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এভাবেই বদলে দিচ্ছে বর্তমান জনপরিসরকে এবং এর মধ্য দিয়ে আমাদের জনপরিসরের ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

একসময় কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সবাই তাদের আদর্শিক ভিন্নতা ভুলে এক লক্ষ্যে অবিচল ছিল। ঠিক গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই আমরা বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিজ নিজ আদর্শিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। এর সঙ্গে এ-ও দেখতে পাই যে কী করে তারা নিজ নিজ আদর্শ বাস্তবায়নে সেই গণ-অভ্যুত্থানের ঐক্য থেকে দূরে সরে এল। যখন আমাদের আরও বেশি ঐক্য প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই আমরা নানা দলের আদর্শিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে আরও বিভাজিত হয়ে পড়লাম। রাজনৈতিক আদর্শগত বিভাজন যে খুব নেতিবাচক একটি বিষয়, সেভাবে চিন্তা করাও হয়তো একেবারে ঠিক নয়।

নানা বিভাজনের মধ্য দিয়েই আমরা একটি অবস্থানে পৌঁছাতে পারব, যাকে আমরা সমাজের দ্বান্দ্বিক বিকাশের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পারি। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন এই মতাদর্শিক রাজনৈতিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে একধরনের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে প্রবেশ করি। যেখানে আমরা সহনশীলতা এবং পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব দেখতে পাই, যে সহনশীলতা ও আস্থার অভাব কেবল রাজনৈতিক পরিসরেই থেমে না থেকে, বরং যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আচরণে প্রভাব ফেলে; প্রকারান্তরে যা আমাদের সামাজিক সম্পর্কের নেতিবাচক বদল ঘটাতে থাকে। এর ফলে একে অপরের প্রতি বিশ্বাসের অভাব আমাদের একে ওপরের ওপর সন্দিহান হতে বাধ্য করে, যা আমরা আমাদের মনের অজান্তেই চর্চা করতে শুরু করি। যে কারণে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়েও যেন অধিক দৃশ্যমান বর্তমান সময়ে। সবকিছু ছাপিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যই যেন প্রতিদিনের বিভক্তির উৎস হয়ে যাচ্ছে, যে বিভক্তি শত্রুতায় পরিণত হচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের বছর পেরিয়ে একটি নির্বাচনের সম্মুখে দাঁড়িয়েও আমরা দেখি এক ভিন্ন পরিস্থিতি। প্রতিশোধের রাজনীতির কারণে বিগত সময়ের বিপরীতে এখন নতুন একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে, যাদের চিন্তা ও আচরণ যেন কর্তৃত্ববাদীদের আচরণকেই অনুসরণ করে। ফলে সমাজের ভিন্নমতাবলম্বীদের অন্তর্ভুক্তির কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখি না। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এভাবেই বদলে দিচ্ছে বর্তমান জনপরিসরকে এবং এর মধ্য দিয়ে আমাদের জনপরিসরের ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। জনপরিসরে যখন যুক্তিনির্ভর বিতর্ক ও সহনশীলতার চর্চা হওয়ার কথা, তা প্রায়ই ক্ষমতাশীলদের নিয়ন্ত্রণের পরিসরে রূপ নিচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি গভীর সংকটের পূর্বাভাস।

গণতন্ত্র টিকে থাকে একটি সক্রিয় ও উদার জনপরিসরের ওপর, যেখানে নাগরিকেরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা সংলাপে অংশ নিতে পারে। তাই জনপরিসরের ভাঙনের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কের অবনতির কেন্দ্রে যখন রাজনীতি ঢুকে যায়, তখন প্রতিশোধের রাজনীতিও দৈনন্দিন জীবনে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি ভিন্নমতাবলম্বীদের অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই বিভাজন হয়ে উঠবে আমাদের জন্য এক অকল্পনীয় সমস্যায়।

তাই আমরা প্রত্যাশা করব, নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যেন এই প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসে। আমরা বড় রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আহ্বান জানাব, তারা যেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মর্মকে অনুধাবন করে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই রূপ দেবে।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

*মতামত লেখকের নিজস্ব