
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পারুক আর না পারুক, এর মধ্যেই যে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে, তা হলো, উপসাগরীয় এলাকায় আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ থাকছে না।
ইরানি হামলার পরপরই মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভাসা-ভাসাভাবে ধারণা মিলছিল। এখন নিউইয়র্ক টাইমস আসল ছবি দেখিয়ে দিয়েছে।
এক প্রতিবেদনে তারা বলেছে, ইরানের হামলায় কমপক্ষে ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে তাদের অনেক সেনা মারা পড়েছেন। হামলার শিকার হয়েছে একাধিক মার্কিন দূতাবাস।
মার্কিন নিরাপত্তাকে ‘মৌনতার সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর’ এবং ‘সেই চাদরের ভাঁজে ভাঁজে নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া...আছে ভালোবাসা-আদর’ ভেবে আরবের বাদশাহরা এত দিন নিশ্চিন্ত আলস্যবিলাসী ঘুম দিচ্ছিলেন।
ইরানি মিসাইলের আওয়াজে ঘুম ভাঙার পর এখন তাঁরা দেখছেন, সেই চাদর ছিঁড়েফুঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে।
ইসলামাবাদের সালিসি টেবিলে যুদ্ধবিরতির জন্য ইরান যে ১০টি শর্ত রেখেছিল, তার মধ্যে একটি হলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া।
ইরানের দাবি, সেখানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি রাখা যাবে না। অর্থাৎ ঘটিবাটি ফেলে আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে মার্কিন সেনারা যেভাবে চলে গিয়েছিল, সেভাবে উপসাগরীয় এলাকা থেকে তাদের ভাগতে হবে।
ইরানের হামলায় ঘাঁটিগুলোর করুণ দশা দেখে আরব দেশগুলোও বুঝে ফেলেছে, তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার মুরোদ যুক্তরাষ্ট্রের আর আগের মতো নেই।
প্রশ্ন হলো, আরবের বাদশাহরা কেন তাঁদের দেশের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রকে এত ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দিয়েছিলেন? এসব ঘাঁটি কার নিরাপত্তার জন্য বানানো হয়েছিল? এগুলো কি আসলে বাদশাহ-আমিরদের গদির, নাকি আরবের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বানানো হয়েছে? নাকি এগুলোর কাজ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের নিরাপত্তা দেওয়া? নাকি এর পেছনে আরও কারণ আছে?
ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনালেও এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার এবং পরিষ্কারভাবে গোটা ছবিকে মাথার মধ্যে নেওয়ার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পেছনে।
মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই আরব ভূমির প্রায় সবটাই মুসলমানদের শাসনাধীন চলে এসেছিল। প্রায় সব গোত্র মদিনা রাষ্ট্রের শাসন মেনে নিয়েছিল।
মহানবী (সা.)–এর ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা হিসেবে হজরত আবু বকর (রা.) দায়িত্ব নেন এবং এর পরপরই আরবের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন গোষ্ঠী বিদ্রোহ শুরু করে বসে। কেউ কেউ নিজেদের নবী পর্যন্ত দাবি করে বসেন।
তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর বিদ্রোহী ছিল ইয়ামামা এলাকার (বর্তমান রিয়াদ শহরের ৪০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের আল-খার্জ ও তার আশপাশের এলাকা) ভণ্ড নবী মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। বিদ্রোহ দমনে খলিফা তাঁর ‘আনডিফিটেড জেনারেল’ খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে পাঠালেন।
মুসাইলামা ছিলেন বনু হানিফা গোত্রের লোক। এটি যুদ্ধবাজ গোত্র ছিল। ৬৩২ সালের ডিসেম্বরে ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসাইলামা এবং তাঁর বনু হানিফাকে এমনভাবে পরাস্ত করলেন যে গোত্রটি পরের এক হাজার বছর পর্যন্ত আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।
তবে এক হাজার বছর পর সেই বনু হানিফা থেকে এমন একজন নেতা উঠে আসেন, যাঁর উত্তরসূরিরা আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর হিসেবে কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে আছেন। সেই নেতার নাম মুহাম্মদ বিন সৌদ।
১৬৮৭ সালে জন্ম নেওয়া মুহাম্মদ বিন সৌদ রিয়াদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকণ্ঠের দিরিয়াহ এলাকার আমির ছিলেন। ১৭২৭ সালে আমির পদে বসেছিলেন তিনি। তাঁর পূর্বপুরুষেরাও দিরিয়াহর শাসক ছিলেন।
মুহাম্মদ বিন সৌদ যখন আমির, তখন আরবের বিরাট অংশের দখল ছিল উসমানীয় সালতানাতের হাতে। তবে কিছু কিছু এলাকা দুর্গম হওয়ায় সেগুলো উসমানীয়দের দখলমুক্ত ছিল। এর মধ্যে দিরিয়াহও ছিল।
উসমানীয়রা মূলত হানাফি মাজহাবের অনুসারী ও কিছুটা সুফি ঘরানার ছিলেন। তাঁরা মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় বিষয়গুলোয় চার সুন্নি মাজহাবকেই (হানাফি, মালিকি, শাফিই, হাম্বলি) সরকারি স্বীকৃতি দিতেন।
উসমানীয়দের এই ধর্মীয় আক্বিদার বিরোধিতা করে ওই সময় একজন ব্যক্তি প্রচার চালানো শুরু করলেন। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নাজদি ইবনে সুলাইমান আত-তামিমি (১৭০৩-১৭৯২)। তিনি ছিলেন মধ্য আরবের নাজদ অঞ্চলের একজন ধর্মীয় নেতা ও সংস্কারক।
বর্তমানে সৌদি আরবের সরকারি ধর্মীয় মতবাদ যে ওয়াহাবি ধারার, তিনি সেই ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ইসলামের বিশুদ্ধ তওহিদ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী মনে করেন। আর তাঁর বিরোধীরা তাঁকে অতিরিক্ত কঠোর এবং ঐতিহ্যবিরোধী সংস্কারক হিসেবে দেখেন।
আবদুল ওয়াহাবের নতুন মতবাদ প্রচারের কথা উসমানীয় শাসকদের কানে যেতেই তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে ওয়াহাব দিরিয়াহর আমির মুহাম্মদ বিন সৌদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইলেন।
মুহাম্মদ বিন সৌদ তাঁকে শুধু আশ্রয় দিলেন না, নিজের ছেলে আবদুলআজিজ বিন মুহাম্মদের সঙ্গে ওয়াহহাবের মেয়ে আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বিয়ে দিয়ে দিলেন। দুই ‘মুহাম্মদ’ বেয়াই হয়ে গেলেন।
‘দিরিয়াহ চুক্তি’ নামের একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই বেয়াই ১৭৪৪ সালে (মতান্তরে ১৭৪৫ সালে) একটি জোট গড়ে তুললেন। ঠিক হলো, নতুন এই শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক ও সামরিক দিকটি দেখবে সৌদি বংশ; আর ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বিষয়গুলো দেখবে ওয়াহাবি বংশ।
একদিকে ওয়াহাবিদের ধর্মীয় খানদান, আরেক দিকে সৌদিদের সামরিক খানদান। দুই খানদান মিলে আজকের রিয়াদকেন্দ্রিক দিরিয়াহতে এক মজবুত আমিরাত কায়েম করল। এই শাসনই ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’।
সৌদি-ওয়াহাবিরা ‘দিরিয়াহ আমিরাত’ নামের মজবুত হুকুমত কায়েম করতে পারলেও উসমানীয় খেলাফতের সামনে তাঁদের তেমন কোনো ক্ষমতাই ছিল না। তবু তাঁরা আস্তে আস্তে সীমানা বাড়াচ্ছিলেন।
প্রথমে তাঁরা নাজদ দখল করলেন। এরপর তাঁরা পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল দখল করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল কুয়েত থেকে ওমানের উত্তর সীমানা পর্যন্ত। এ ছাড়া তাঁরা ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা আসিরের উচ্চভূমিও দখল করে ফেলল।
এর মধ্য দিয়ে সৌদ ও ওয়াহাবি পরিবার আরবের প্রধান সার্বভৌম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
দিরিয়াহ আমিরাতের সীমানা বাড়িয়ে মুহাম্মদ বিন সৌদ ১৭৬৫ সালে মারা গেলেন।
১৯১৪ সাল। ২৮ জুলাই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে মূলত দুটি ভাগ ছিল। এক ভাগে ছিল অ্যালাইড বা অক্ষশক্তি। আরেক ভাগে সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় শক্তি।
অক্ষশক্তিতে ছিল ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও সার্বিয়া। আর কেন্দ্রীয় শক্তির শিবিরে ছিল জার্মানি, অস্ট্রীয় হাঙ্গেরি ও উসমানীয় সাম্রাজ্য।
এ যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াই হচ্ছিল ব্রিটিশ এম্পায়ার আর উসমানীয় সালতানাতের মধ্যে। আরবের বেশির ভাগ গোত্র ও সম্প্রদায় উসমানীয় শাসকদের সমর্থক ছিল। আর ব্রিটিশরা ভালোমতোই জানত যতক্ষণ পর্যন্ত আরবরা উসমানীয়দের পক্ষে থাকবে ততক্ষণ উসমানীয় সালতানাতকে উৎখাত করা সম্ভব হবে না।
ব্রিটিশরা ভাবতে লাগল কী করে উসমানীয় সালতানাতের বিরুদ্ধে আরবদের খেপিয়ে তোলা যায়। এটি খুব সহজ কাজ ছিল না। এই কাজের জন্য ব্রিটিশদের এমন একজন আরব নেতার দরকার ছিল, যাঁর কথা আরবরা সহজেই মেনে নেবে।
অবশেষে ব্রিটিশরা সেই নেতাকে পেয়ে গেল। তাঁর নাম হুসেইন ইবনে আলী। তিনি সাধারণ কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন মক্কার ঐতিহ্যবাহী হাশেমি বংশের লোক ও মহানবী (সা.)-এর বংশধর।
যেহেতু তাঁরা আহালুল বাইত বা নবী পরিবারের ছিলেন, সেহেতু মহানবী (সা.)-এর সম্মানে এই পরিবারের সদস্যরা সেই আব্বাসীয় আমল থেকে প্রায় ৭০০ বছর ধরে মক্কার ‘শরিফ’ বা গভর্নর হয়ে আসছিলেন।
সেই সুবাদে হুসেইন উসমানীয় খেলাফতের অধীন মক্কার ‘শরিফ’ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এ কারণে ইতিহাসে তিনি মূলত ‘শরিফ হুসেইন’ নামে বেশি পরিচিত। এই পরিবারকে গোটা আরবের মানুষ সম্ভ্রমের চোখে দেখত। তাই শরিফ হুসেইনকেই ব্রিটিশরা দাবার ঘুঁটি হিসেবে বেছে নিল।
তৎকালীন মিসরে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমাহন শরিফ হুসেইনকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখলেন। পাল্টা চিঠিতে শরিফ হুসেইন ম্যাকমোহনকে বললেন, তিনি বিদ্রোহ করতে রাজি আছেন; তবে যুদ্ধ শেষে আরবদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দিতে হবে।
ব্রিটিশরা শরিফ হুসেইনকে বলল, তিনি যদি উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করেন, তাহলে উসমানীয়দের হটিয়ে তাঁকে পুরো জাজিরাতুল আরব, অর্থাৎ আরব উপদ্বীপ, শাম ও ইরাকের স্বাধীন খলিফা বানানো হবে। আরবের মুসলমানরা নিজেদের শাসনভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারবে।
কিন্তু গোপনে ১৯১৬ সালের মে মাসে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হলো। এই চুক্তির নাম সাইকস-পিকো চুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে আরব ভূমিগুলো কীভাবে পশ্চিমারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে, সেটি আগে থেকেই ঠিক করে ফেলা।
সোজা কথায়, সাইকস-পিকো চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির নকশা। অর্থাৎ একদিকে আরবদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছিল, অন্যদিকে তাদের ভূমি ভাগ করার ষড়যন্ত্র চলছিল।
সাইকস-পিকো চুক্তিতে ঠিক হলো: উসমানীয় খেলাফত ভেঙে গেলে ফ্রান্স পাবে বর্তমান সিরিয়ার উত্তরাংশ, লেবানন, দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের কিছু অংশ ও উত্তর ইরাক (মসুল অঞ্চল)।
ব্রিটেন পাবে বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাংশ (বাগদাদ ও বসরা), বর্তমান কুয়েত এবং জর্ডান নদীর পশ্চিমে উপকূলীয় অঞ্চল (ফিলিস্তিন বাদে)।
চুক্তির পুরো বিষয়টি গোপন রেখে ব্রিটিশরা আরব নেতাদের খেলাফতের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনে আরবের নেতারা খুশি হচ্ছিলেন। প্রতিশ্রুতি পেয়ে শরিফ হুসেইন তাঁর অনুগত আরব নেতাদের সমর্থন নিয়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন।
শরিফ হুসেইনের নেতৃত্বে আরবরা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করায় ১৯১৬ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য ভেঙে যেতে শুরু করল।
ব্রিটেন ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনের দখল নিয়ে নিল। ওই সময় ইউরোপ ও আমেরিকায় জায়নবাদী আন্দোলন তুঙ্গে। ওই সময় আধুনিক জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জলের ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছিল।
ব্রিটিশ দূত ম্যাকমোহন এক চিঠিতে শরিফ হুসেইনকে লিখলেন, ব্রিটিশরা তাঁর খেলাফতকে স্বীকৃতি দিতে রাজি আছে, কিন্তু একটি শর্ত আছে। শর্তটি হলো, ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
ফিলিস্তিনকে বিক্রি করার এই প্রস্তাবে শরিফ হুসেইন প্রচণ্ড খেপে গেলেন। কারণ, তিনি ফিলিস্তিনকে কোনো মামুলি আরব ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি।
এই ভূখণ্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের চেয়ে ধর্মীয় গুরুত্ব তাঁর কাছে বড় হয়ে ধরা দেয়। কারণ, এই ফিলিস্তিন অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি। এখানে আছে মুসলমানদের পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস; মসজিদুল আকসা।
মহানবী (সা.)-এর বংশধর শরিফ হুসেইন বায়তুল মুকাদ্দাস ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। শোনা যায়, তিনি নাকি রাগের চোটে স্যার ম্যাকমোহনের চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।
সাইকস-পিকো চুক্তির কথা প্রথমে আরবরা জানত না। কিন্তু ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা মস্কো আর্কাইভ থেকে নথি ফাঁস করে দেয়। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর গোপন চুক্তিটির পূর্ণ বিবরণ ইজভেস্তিয়া ও প্রাভদা পত্রিকায় ছাপা হয়। তখন বিশ্ব জানতে পারে, ব্রিটেন ও ফ্রান্স আরবদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং আরব ভূমি নিজেদের মধ্যে আগেভাগেই ভাগাভাগি করে নিয়েছে।
শরিফ হুসেইন ও আরব জাতীয়তাবাদীরা এবার বুঝতে পারলেন, ব্রিটিশরা তাঁদের ধোঁকা দিয়েছে। তাঁরা বুঝতে পারলেন, ব্রিটিশরা তাঁদের ওপর চালাকি করে স্বাধীন খেলাফতের কথা বললেও তলেতলে আরব ভূমি নিজেদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে নিয়েছে। এই চুক্তির খবর ফাঁসের পর আরবদের মধ্যে পশ্চিমাদের প্রতি অবিশ্বাস তীব্র হয়।
এর আগে গোপনে গোপনে আরও একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটে যায়। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস ব্যালফোর ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা লর্ড ওয়াল্টার রথচাইল্ডকে একটি ছোট্ট চিঠি পাঠান।
চিঠিতে ব্যালফোর লেখেন, ‘ব্রিটিশ সরকার চাইছে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি নিজস্ব আবাসস্থল হোক এবং তা তৈরি করতে তারা সাহায্য করবে। তবে এমন কিছু করা হবে না, যা সেখানে থাকা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকার বা অন্য দেশের ইহুদিদের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
আজকের ফিলিস্তিনিদের করুণ অবস্থা এবং ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পেছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল এই সংক্ষিপ্ত চিঠি। এই ছোট্ট চিঠিই ইতিহাসখ্যাত ‘ব্যালফোর ঘোষণা’।
ব্যালফোর ঘোষণাই ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
এই চিঠির কথাও প্রথমে শরিফ হুসেইন ও অন্য আরব নেতারা জানতেন না। সাইকস-পিকো চুক্তি ফাঁস হওয়ায় এমনিতেই তাঁরা রেগেছিলেন। এরপর এই চিঠির কথা সামনে আসায় তাঁরা আরও খেপে যান।
১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। ব্রিটিশ ও ফরাসিরা শরিফ হুসেইনকে প্রতিশ্রুতি মাফিক ভূমি না দিয়ে ম্যান্ডেট সিস্টেম চালু করল। ফ্রান্স নিল সিরিয়া ও লেবানন।
ব্রিটেন নিল ইরাক, ফিলিস্তিন ও জর্ডান। শরিফ হুসেইন এতে ক্ষুব্ধ হলেও কিছু করতে পারলেন না। তবে তখনো তিনি মক্কা ও মদিনা তথা হেজাজের শাসক হিসেবে ছিলেন।
১৯২৪ সালের মার্চে তুরস্কে মুস্তাফা কামাল পাশা উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করলেন। কোনো খলিফা না থাকায় মুসলিম বিশ্ব নেতৃত্বশূন্য হলো।
তখনই শরিফ হুসেইন নিজেকে আরব বিশ্বের ‘খলিফা’ ও ‘মুসলিম বিশ্বের স্বাধীন শাসক’ হিসেবে ঘোষণা দিলেন। তাঁর ধারণা ছিল তিনি যেহেতু মহানবী (সা.)-এর বংশধর, সেহেতু মুসলিম নেতারা তাঁকে খলিফা মানবেন। কিন্তু তা হলো না। অনেক আরব নেতা তাঁকে সমর্থন দিলেন না।
ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়াই নিজেকে স্বাধীন খলিফা বলে ঘোষণা দেওয়ায় ব্রিটিশ সরকার শরিফ হুসেইনের ওপর রেগে গেল। তারা শরিফ হুসেইনের বিকল্প আরব নেতার তালাশ শুরু করল।
তারা এমন এক নেতাকে চাইছিল, যাঁর কথা আরবরা শুনবে এবং যিনি ব্রিটিশদের স্বার্থের বাইরে কথা বলবেন না।
অবশেষে এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এলেন এক নেতা। তিনি হলেন সেই মুহাম্মদ বিন সৌদের বংশধর ও নাজদ এলাকার আমির আবদুলআজিজ বিন সৌদ।
আবদুলআজিজ ছিলেন শরিফ হুসেইনের একেবারে বিপরীত ঘরানার লোক। তিনি ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে গেলেন না। ফলে ব্রিটিশরা শরিফ হুসেইনের ওপর থেকে সমর্থন সরিয়ে আবদুলআজিজকে সমর্থন দিল।
ব্রিটিশদের সহযোগিতা নিয়ে আবদুলআজিজ ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মক্কা দখলে অভিযান চালালেন। তাঁর বিশাল সৌদি বাহিনীর সামনে টিকতে না পেরে শরিফ হুসেইন শাসনভার নিজের ছেলে আলী বিন হুসেইনের হাতে দিয়ে হেজাজ ছেড়ে সাইপ্রাসে চলে গেলেন।
আলী বিন হুসেইন নতুন খলিফা হলেন। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেও আবদুলআজিজের সৌদি বাহিনীকে ঠেকাতে পারলেন না। এক বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে মক্কা-মদিনা ও তার আশপাশের এলাকা আবদুলআজিজের হাতে চলে এল।
মক্কা-মদিনা পতনের পর এবার আলী বিন হুসেইন জেদ্দায় চলে গেলেন। ১৯২৬ সালে আবদুলআজিজের বাহিনী জেদ্দা অবরোধ করল। আক্রমণের মুখে ওই বছরের জানুয়ারিতে আলী বিন হুসেইন জেদ্দা ছেড়ে ইরাকের বাগদাদে তাঁর ভাই ফয়সাল ইবনে হুসেইনের কাছে চলে গেলেন। ফয়সাল তখন ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ইরাকের বাদশাহ ছিলেন। আলী ইবনে হুসেইন জীবনের বাকি সময় ইরাকে ভাইয়ের আশ্রয়েই কাটান।
এখানেই মূলত মক্কা-মদিনা, তথা সৌদি আরবে শরিফ হুসেইন বংশ, তথা হাশেমি বংশের রাজত্ব শেষ হয়ে যায়। শরিফ হুসেইন সাইপ্রাসে নির্বাসনে গিয়ে আর ফেরেননি। ১৯৩১ সালের জুনে সাইপ্রাসে তাঁর মৃত্যু হয়।
শরিফ হুসেইনের আরেক ছেলে আবদুল্লাহ বিন হুসেইনকে পরে ব্রিটিশরা ট্রান্সজর্ডানের আমির বানায়। পরে তিনি ১৯৪৬ সালে স্বাধীন জর্ডানের প্রথম বাদশাহ হন। আজকের জর্ডানের যিনি বাদশাহ, সেই দ্বিতীয় আবদুল্লাহ কিন্তু হাশেমি বংশের লোক এবং সরাসরি সেই মক্কার শরিফ হুসেইনের প্রপৌত্র।
মক্কা-মদিনা ও জেদ্দা দখলের পর আবদুলআজিজ ১৯২৬ সালে নিজেকে হেজাজ ও নাজদের আমির ঘোষণা করেন। এরপর ১৯৩২ সালে তিনি হেজাজ ও নাজদ—এ দুই এলাকা এক করে নতুন এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন।
ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদের হাতে পর্যুদস্ত হওয়ার ঠিক ১ হাজার ৩০০ বছর পর বনু হানিফা বংশের এক উত্তরাধিকারী হাশেমি বংশকে মক্কা-মদিনা থেকে উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন, তার নাম ‘আল-মামলাকা আল-আরবিয়া আস-সৌদিয়া’ বা আজকের ‘কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া’।
(এখানে মনে করিয়ে দিই, গত বছরের ১৩ মে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি যে প্রাসাদে বসে মোহাম্মাদ বিন সালমানের সঙ্গে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেন, সেই প্রাসাদের নাম ‘আল ইয়ামামা প্যালেস’। সৌদিদের ‘আদিবাড়ি’ ইয়ামামার নামেই এই প্রাসাদের নাম রাখা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সৌদি রাজপরিবার এখনো তাদের প্রাচীন বংশ, বসতিস্থল ও রাজনৈতিক শক্তির সূত্র কত জোরালোভাবে স্মরণ করে।)
ব্রিটিশরা ভালো করেই জানত, আরবের সাধারণ মানুষ কখনোই কোনো ইংরেজকে নিজেদের সরাসরি শাসক বা নেতা বলে মেনে নেবেন না। এ কারণে ব্রিটিশরাজ গোটা আরব ভূমিকে নিজের কবজায় রাখতে একটি গোপন পরিকল্পনা করলেন।
বাদশাহ আবদুলআজিজ ও অন্য আরব নেতাদের ব্রিটিশ এম্পায়ারের দিক থেকে অনেকেটা এভাবে বলে দেওয়া হলো, আরব ভূমির বাদশাহ আপনারাই থাকবেন।
এখানকার সব মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভালোমন্দের বিচার আপনারাই করবেন। এখানকার দালানকোঠা, কলকারখানা, ইমারত-সেতু—সব আপনারাই বানাবেন। লোকে জানবে আরবের বাদশাহ আপনারাই। আপনারা তাদের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকবেন। কিন্তু আরবের সমস্ত সেনাবাহিনী এবং ডিফেন্স সিস্টেম থাকবে ব্রিটিশ এম্পায়ারের হাতে। মানে, ব্রিটিশের অনুমতি ছাড়া আরব শাসকদের বাহিনী কিছু করতে পারবে না।
এ কথায় আরব শাসকদের সায় না দিয়ে উপায় ছিল না। ফলে আরব বিশ্বে ব্রিটিশদের পরোক্ষ শাসন জারি হলো। একটার পর একটা ব্রিটিশ ঘাঁটি গড়ে উঠতে লাগল।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক আগেই (১৮৩৯ সালে) দক্ষিণ ইয়েমেনের আদান বন্দর এলাকা দখল করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তারা সেটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌ ও সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করল। বাব এল-মানদেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণের কারণে এডেন ছিল ভারত ও ইউরোপের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল ব্রিটিশদের ভারত শাসন রক্ষার অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক কেন্দ্র। পরে সুয়েজ খাল উদ্বোধন হওয়ার পর আদানের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
আবদুলআজিজ ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের ‘বাদশাহ’ হওয়ার পর ব্রিটিশরা আরবে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি বানায়, তার মধ্যে প্রথম ও উল্লেখযোগ্য হলো শারজাহ ঘাঁটি।
এটি ছিল রয়্যাল এয়ারফোর্স ঘাঁটি। এটি মূলত লন্ডন-ভারত বিমানপথের একটি ট্রানজিট ও জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রভাব বজায় রাখা এবং আকাশপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ঘাঁটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশদের প্রথম বড় আকাশ সামরিক উপস্থিতি। এখান থেকে তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নজরদারি ও দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারত।
শারজাহ ঘাঁটির পর ব্রিটিশরা আরব অঞ্চলে ধাপে ধাপে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বিমানঘাঁটি গড়ে তোলে।
১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি ব্রিটিশরা বাহরাইনে মুহাররাক বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলে। এই ঘাঁটি উপসাগরীয় আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ও তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইরাকেও ব্রিটিশ উপস্থিতি আগে থেকে ছিল। তবে ৩০-এর দশকের শেষ দিকে হাব্বানিয়া ঘাঁটি বড় আকারের বিমানঘাঁটিতে রূপ নেয়। এটি মেসোপটেমিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ শক্তির কেন্দ্র ছিল।
ওমানের মাসিরাহ দ্বীপে ৪০-এর দশকে ব্রিটিশরা একটি বিমানঘাঁটি বানায়। ভারত মহাসাগর আর আরব সাগরের সংযোগস্থলে হওয়ায় এই ঘাঁটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৪০-৫০-এর দশকে ছোট আকারের বিমানের অবতরণ ও জ্বালানি নেওয়ার জন্য দোহা ও দুবাইয়ে ব্রিটিশরা দুটি ঘাঁটি বানায়। এগুলো পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটি না হলেও ব্রিটিশ সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এ ধরনের আরও ছোট কিছু ঘাঁটি ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল। এসব ঘাঁটির মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ-ভারত আকাশপথ নিরাপদ রাখা ও দ্রুত সামরিক মোতায়েন নিশ্চিত করা। এসব ঘাঁটির মাধ্যমে ব্রিটিশ এম্পায়ার পুরো আরব ভূমির দখল নিয়ে রেখেছিল।
সময়ের পরিক্রমায় ব্রিটিশের রাজত্বেও ঘুণ ধরল। তাদের রাজত্ব ভাঙতে শুরু করল।
শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মূলত ব্রিটিশ এম্পায়ার আর হিটলারের নাৎসি জার্মানির মধ্যে লড়াই শুরু হলো।
লড়াইয়ে ব্রিটিশ এম্পায়ারের জয় হলো বটে, তবে যুদ্ধে তাদের এতটাই ক্ষয়ক্ষতি হলো যে আস্তে আস্তে ব্রিটিশ এম্পায়ারের ক্ষমতার দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করল।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল যৌথভাবে মিসরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের মুখে ব্রিটেনকে পিছু হটতে হয়।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আগের মতো শক্তি আর নেই।
এরপরই ধীরে ধীরে আরব বিশ্বে ব্রিটিশ উপস্থিতি কমতে থাকে। ১৯৫৭ সালে ব্রিটেন জর্ডান থেকে সেনা সরিয়ে নেয়।
১৯৬০-এর দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরালো হওয়ায় ব্রিটেনের পক্ষে ঘাঁটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয়, তারা ১৯৭১ সালের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের সামরিক ঘাঁটি তুলে নেবে। এর ফল হিসেবে ১৯৭১ সালে বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ব্রিটিশ সেনা সব সরিয়ে নেওয়া হয়।
১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল যৌথভাবে মিসরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপের মুখে ব্রিটেনকে পিছু হটতে হয়। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আগের মতো শক্তি আর নেই। এরপরই ধীরে ধীরে আরব বিশ্বে ব্রিটিশ উপস্থিতি কমতে থাকে। ১৯৫৭ সালে ব্রিটেন জর্ডান থেকে সেনা সরিয়ে নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তো ভেঙে গেল। কিন্তু তার জায়গায় গড়ে উঠল এক নয়া সুপারপাওয়ার। তার নাম—আমেরিকা।
আরব বাদশাহরা এবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করা শুরু করে দিলেন। এসব মিটিংয়ের ফল হিসেবে যেসব জায়গায় ব্রিটিশদের ঘাঁটি ছিল, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সেই সেই জায়গায় চলে এল মার্কিন সেনা।
ব্রিটিশদের বানানো ঘাঁটিগুলো খুব বড় ছিল না। সেখানকার সেনাদের মূল কাজ ছিল আরবের তেলের খনিগুলোর সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দিন থেকেই এই ঘাঁটিগুলোকে অনেক বড় আকারে বানাতে চাইল।
তারা ভাবল ব্রিটিশরা যেভাবে ঘাঁটিগুলোতে সেনা মোতায়েন করে গোটা আরবকে হাতের মুঠোয় রেখেছিল, আরবকে তার চেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের আরও বড় স্থাপনা এবং আরও বেশি সেনা মোতায়েন দরকার।
কিন্তু মার্কিনদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ ছিল না। কারণ, সে সময় ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরবের একজন বাদশাহর দ্বন্দ্ব বেধে গেল। সেই বাদশাহ আরবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি হলেন সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল।
ঘাঁটি নিয়ে সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি ছিল, বাদশাহ ফয়সাল তা নবায়ন করলেন না। তিনি সৌদি আরব থেকে ছোট ছোট মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার হুকুম দিলেন। ফয়সালের বাবা আবদুলআজিজ আরবে বহু ব্রিটিশ ঘাঁটি গড়তে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফয়সাল এসে এক এক করে সেসব ঘাঁটি উচ্ছেদ করা শুরু করলেন। একপর্যায়ে একটি ঘাঁটি ছাড়া আর কোনো ঘাঁটিই তাঁর সময়ে সৌদি আরবে ছিল না।
আচমকা ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ বাদশাহ ফয়সাল রিয়াদে নিজের প্রাসাদে নিজের ভাতিজা ফয়সাল বিন মুসাইদের গুলিতে নিহত হলেন।
নতুন বাদশাহ হলেন ফয়সালের ভাই খালিদ। বাদশাহ খালিদ মোটেও ফয়সালের মতো স্বাধীনচেতা ছিলেন না। তিনি ফয়সালের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন না। তিনি তাঁদের সঙ্গে হাত মেলালেন। খালিদ গদিতে বসার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ ধরল।
আরবে নতুন করে মার্কিন ঘাঁটি গড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জুতসই একটা অজুহাত দরকার ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা বাহানা পেয়ে গেল। সেই বাহানার নাম ‘সাদ্দাম হোসেন’।
সাদ্দাম যখন ইরাকের প্রেসিডেন্ট হন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ দোস্তি ছিল। সাদ্দাম ১৯৭৯ সালে গদিতে বসে পরের বছরই ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমিনি সরকারের ওপর হামলা করে বসলেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বেধে গেল। আট বছর ধরে যুদ্ধ চলল।
শুরুর দিকে মনে হচ্ছিল, লড়াইয়ে সাদ্দাম হোসেন জিতে যাবেন। সৌদি আরবসহ বাকি আরব দেশগুলো সাদ্দামের পাশে দাঁড়াল।
আয়াতুল্লাহর ইরান তাড়াহুড়া না করে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকল। অন্যদিকে তাড়াহুড়া করে এক তরফাভাবে যুদ্ধ শুরু করা সাদ্দাম হোসেনের টাকাপয়সা আস্তে আস্তে ফুরোতে লাগল। যুদ্ধ তাঁর কাছে বোঝার মতো হয়ে উঠতে থাকল। যুদ্ধের খরচ মেটাতে গিয়ে এবার তিনি আরব বাদশাহদের কাছে ধার চাইলেন।
সৌদি বাদশাহর পাশাপাশি অন্য আরব শাসকেরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাদ্দামকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ধার দিলেন। বলা হয়ে থাকে, এই ধারের পরিমাণ ছিল ৬০ বিলিয়ন ডলার।
এত পয়সা ঢেলে ঢেলেও সাদ্দাম জিততে পারলেন না। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ইরানকে ধরাশায়ী করা যাবে। কিন্তু তাঁর সেই ‘সপ্তাহখানেক’ আট বছরে গড়াল। আট বছরের মাথায় এসে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজয় মানলেন।
যুদ্ধ তো শেষ হলো। এবার আরব বাদশাহরা সাদ্দাম হোসেনকে বললেন, ‘আমাদের পাওনা বুঝিয়ে দাও।’ সাদ্দাম বললেন, এই লড়াইয়ে আরব দেশগুলোই তাঁকে নামিয়েছিল। তাদের কথা এবং পয়সাতেই ইরাক যুদ্ধ করেছে। সাদ্দাম সোজা বলে দিলেন, ‘আমি তোমাদের এক পয়সাও ফেরত দিতে পারব না।’
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ওই বৈঠকে সাদ্দাম গ্লাসপিকে বলেন, তিনি কুয়েত দখল করতে চান, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আপত্তি আছে কি না। জবাবে গ্লাসপি সাদ্দামকে বলেন, ‘এটি একেবারেই আরবদের বিষয়। আপনি যদি আরব দেশগুলোকে ম্যানেজ করতে পারেন, তাহলে আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই। আমরা কুয়েতের হয়ে আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলব না।’
এখান থেকেই আরব বাদশাহদের সঙ্গে সাদ্দামের দুশমনি শুরু হলো। সৌদি বাদশাহসহ অন্য আরব বাদশাহরা সাদ্দাম হোসেনকে শায়েস্তা করার জন্য এক নীলনকশা করলেন। তাঁরা সাদ্দামের তেল বিক্রিতে ধস নামানোর জন্য কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল-আহমদ আল-সাবাহকে তেল উৎপাদন দ্বিগুণ করতে বললেন। কুয়েত দ্বিগুণ পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়তেই দাম অনেক পড়ে গেল। এতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেল সাদ্দামের টাঁকশাল।
সাদ্দাম হোসেন এবার আরব বাদশাহদের ওপর খেপে গিয়ে কুয়েতে হামলা চালানোর ছক কষা শুরু করলেন। কিন্তু এই হামলার বিষয়ে সাদ্দামের একটাই চিন্তা ছিল। সেই চিন্তার নাম ‘আমেরিকা’।
সাদ্দাম হোসেন ভাবলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কুয়েতে হামলার বিরোধিতা করে, তাহলে সেটি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। উপায় খুঁজতে তিনি ইরাকে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এপ্রিল ক্যাথরিন গ্লাসপির সঙ্গে ১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই বৈঠকে বসলেন।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ওই বৈঠকে সাদ্দাম গ্লাসপিকে বলেন, তিনি কুয়েত দখল করতে চান, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আপত্তি আছে কি না। জবাবে গ্লাসপি সাদ্দামকে বলেন, ‘এটি একেবারেই আরবদের বিষয়। আপনি যদি আরব দেশগুলোকে ম্যানেজ করতে পারেন, তাহলে আমাদের এতে কোনো আপত্তি নেই। আমরা কুয়েতের হয়ে আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলব না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত পেয়ে সাদ্দাম হোসেন এক সপ্তাহ পরই (২ আগস্ট, ১৯৯০) পুরো শক্তি দিয়ে রাতের অন্ধকারে কুয়েতে হামলা করে বসলেন।
ইরাকের তুলনায় কুয়েত খুবই ছোট দেশ। তার হাতে সামরিক শক্তি নেই বললেই চলে। ফলে ইরাকি সেনারা দুই দিনের মধ্যেই পুরো কুয়েত দখল করে ফেলল।
কুয়েত দখল করেই সাদ্দাম হোসেন কুয়েতের সব তেলখনি কবজায় নিয়ে নিলেন। এরপর উৎপাদন আরও বাড়িয়ে দিলেন। এর মধ্য দিয়ে মাত্র কয়েক দিনেই আরব জাহানে সাদ্দাম হোসেন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠলেন।
এবার শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্রের আসল খেলা। সাদ্দাম কুয়েত দখল করার পরই যুক্তরাষ্ট্র পুরো চোখ উল্টিয়ে দিল। তারা কুয়েতের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য সাদ্দামকে দায়ী করল।
সাদ্দাম বললেন, এই হামলা তো যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি নিয়েই হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বলা হলো, কখনো না। আমরা কখনোই সাদ্দামকে কুয়েতে হামলা চালাতে বলিনি।
যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত আরব দেশগুলোর সমর্থন জোগাড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করল। তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার সৌদি বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুলআজিজ এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের সঙ্গে বৈঠক করলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের বিরুদ্ধে আরব সমর্থন ও সামরিক জোট গঠন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডিক চেনি সরাসরি আরবদের সামরিক সহযোগিতা পাওয়া নিশ্চিত করতে বাদশাহ ফাহাদের সঙ্গে বৈঠকে মিটিং করেন। তিনি স্যাটেলাইট পিকচার দেখিয়ে ফাহাদকে বুঝিয়ে দেন কীভাবে সাদ্দাম সৌদি আরবের কোন কোন এলাকায় আঘাত হানার পরিকল্পনা করছেন। এটি দেখে বাদশাহ ফাহাদ ভয় পেয়ে যান।
খোদ প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশও বাদশাহ ফাহাদসহ বিভিন্ন আরব নেতার ফোন করে বললেন, সাদ্দাম শুধু কুয়েত দখল করে শান্ত হবেন না; তিনি এক এক করে আরবের সব বাদশাহ ও আমিরকে ক্ষমতাচ্যুত করে গোটা আরব দখল করে নেবেন। তাঁদের দেওয়া প্রমাণপত্র দেখে আরব নেতারা ভয় পেয়ে গেলেন। (অবশ্য পরে প্রমাণিত হয়, স্যাটেলাইট পিকচারসহ যেসব নথি আরব নেতাদের দেখানো হয়েছিল, তার সবই ছিল ভুয়া।)
আরব নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে তাঁদের সুরক্ষা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র তখন তাঁদের সামনে একটি শর্ত রাখল। তা হলো, আরবের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় মার্কিন ঘাঁটি গড়ার অনুমতি দিতে হবে। তাতে সবাই রাজি হলেন।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ঘাঁটি বানাল সৌদি আরবে। ১৯৯০ সালে সাদ্দামের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল অভিযান অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড শুরু হওয়ার পর আল খার্জ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলল প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস। এটি সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র।
সৌদি আরব ঘাঁটি দেওয়ার পরপরই তার দেখাদেখি বাকি বাদশাহরা ঘাঁটি বানানোর জায়গা দিয়ে দিলেন। কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি বানাল।
আজ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলের যে প্রভাব আছে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে ঠিক একই প্রভাব ছিল। তার মানে, আরব দুনিয়ায় এই যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো দাঁড়িয়ে গেল, সে ঘাঁটিগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি নয়, সেগুলো প্রকারান্তরে ইসরায়েলেরও ঘাঁটি।
যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিগুলো গড়ার পরপরই কুয়েতে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করল। ফলে সাদ্দাম বাহিনী কিছুদিনের মধ্যেই কয়েত খালি করে দিয়ে ইরাক চলে গেল।
কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে হাতের মুঠোয় চলে এল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতেও বড় বড় ঘাঁটি বানিয়ে ফেলল। ইরাক কুয়েত ছেড়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাহানা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা শেষ হলো না।
এবার আরবদের কাছে পরিষ্কার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী বরাবরের জন্য একেবারে স্থায়ীভাবে গেড়ে বসেছে এবং আরবরা যুক্তরাষ্ট্রের ধোঁকায় পড়ে ফেঁসে গেছে।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত আরবে মার্কিন ঘাঁটিগুলো একইভাবে রয়ে গেছে। আর ইরান এখন এসব ঘাঁটির প্রত্যেকটিতে হামলা চালিয়েছে।
এই অঞ্চলের যে দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে, এই ঘাঁটি থেকেই সেই দেশকে যুক্তরাষ্ট্র শায়েস্তা করে আসছে।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা হলো, তখন যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটিগুলো থেকেই আফগানিস্তানে হামলা করেছে।
ওই সময় আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে হটিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তাদের পুতুল সরকার বসিয়ে দেয় এবং সেখানে তাদের বিশাল ঘাঁটি গড়ে তোলে। সে ঘাঁটির নাম বাগরাম এয়ার বেস। ২০ বছর ধরে তালেবানের সঙ্গে লড়াই চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছে।
আফগানিস্তানে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় ইরাকে। আর এই হামলা পরিচালিত হয় এই বাগরাম ঘাঁটি থেকে।
বাগরাম ঘাঁটি এবং আরবের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
এই ঘাঁটিগুলো থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর বোমা ফেলেছে। এমনকি লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফিকে শেষ করে দেওয়া ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনোভাবে এই ঘাঁটি ব্যবহার করেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘাঁটির জোরেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।
২০২৩ সালে ইসরায়েল যখন গাজার ওপর হামলা চালানো শুরু করে, তখন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দিক থেকে বলা হয়েছিল, তাদের এলাকার পাশ দিয়ে যে ইসরায়েলি জাহাজ যাবে, তা তারা উড়িয়ে দেবে। তারা করেছিলও তা-ই। তারা ইসরায়েলের মালিকানাধীন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। এতে ইসরায়েলের অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটিগুলো থেকেই হুতিদের ওপর এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে হুতিরা হামলা চালানো বন্ধ করে আর ইসরায়েলের অর্থনীতিও ঠিক হয়ে আসে।
আসলে বাঘ যেমন হরিণের ঘাড় কামড়ে ধরে, এই ঘাঁটিগুলোর জোরে যুক্তরাষ্ট্রও আরব দেশগুলো সাধারণ মানুষের টুঁটি চেপে ধরে আছে। তাদের নাড়াচাড়া করারও শক্তি নেই। এই ঘাঁটিগুলোর জোরেই যুক্তরাষ্ট্র আরবের শাসকদের বশ মানিয়ে রেখেছে।
আরবের শাসকেরা বংশগত শাসন ধরে রাখতে চান। এ ক্ষেত্রে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চান। পশ্চিমের সমর্থন পেয়ে তাঁরা নিজেদের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত ভেবে এসেছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের ওপর যে হামলা করেছে, তার শুরু দুবাইয়ের আল দাফরা বিমানঘাঁটি থেকে। সেখান থেকেই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালায়। একইভাবে কুয়েত এবং বাহরাইনের ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপরই ইরান এক এক করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালানো শুরু করে।
ইরান সর্বপ্রথম কুয়েতের ক্যাম্প আর এফ জানে হামলা চালায়।
এটি আরব দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ওয়্যারহাউস। এখানে যুক্তরাষ্ট্র ট্রাক, ট্যাংক, মিসাইল স্টোর করে রেখেছিল। এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টারে মিসাইল ফিট করা হয়ে থাকে।
ইরান এই ঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা পালিয়ে যান। তাঁরা কুয়েতের বিভিন্ন হোটেল ও বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নেন।
একইভাবে ইরান ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালায়। আনবার প্রদেশে অবস্থিত আল আসাদ এয়ার বেস, ইরবিল এয়ার বেসের পাশাপাশি মার্কিন স্থাপনা বাগদাদ ডিপ্লোম্যাটিক সাপোর্ট সেন্টারও ইরান গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
ইরান তৃতীয় হামলা করেছে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় এই বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রাডার সিস্টেম ছিল। এর দাম এক বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। ইরান সেটি ধ্বংস করেছে।
এরপর ইরান সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে হামলা করেছে। এই হামলায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় পাঁচটি মার্কিন জাহাজ ধ্বংস করে দেয়।
তারপর ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল দাফরা বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এটি হচ্ছে সেই ঘাঁটি, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্কুলে হামলা চালিয়েছিল। সে হামলার মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শ শিশুকে তারা হত্যা করেছে।
ইরান খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। প্রথমে ইরান এসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে ৫০ থেকে ৬০টি ড্রোন ছুড়েছে। সেই ড্রোন আটকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সিস্টেম ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যখনই মার্কিন ডিফেন্স সিস্টেম ব্যস্ত হয়েছে, তখনই ইরান সেখানে হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে আঘাত করেছে।
ইরানের এই হামলাগুলো স্রেফ মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে নয়; আরব দেশগুলোর কিছু বিল্ডিং ও হোটেলেও তারা আঘাত হেনেছে।
ইরানের দিক থেকে বলা হয়েছে, এসব বিল্ডিং থেকে সিআইএ এবং মোসাদের এজেন্টরা ইরানে হামলায় সহযোগিতা করে আসছিল।
ইরান বলেছিল, যত দিন এসব ঘাঁটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হবে, তত দিন ইরানের এই হামলা জারি থাকবে।
ইরানকে বাগে আনতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত আরব দেশগুলোয় থাকা ঘাঁটি সারাই করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা বলছে, সেটি আর সহজে সম্ভব হবে না। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সারা দুনিয়ার কাছে প্রমাণিত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর আরব বাদশাহদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এসব দেশ সামরিক দিক থেকে নিজেদের স্বনির্ভর করতে পারেনি। সৌদি আরব বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। তারপরও তারা সামরিক শক্তিতে ২৫তম। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ২৪তম। তারপরও তারা সামরিক শক্তিতে ৫৪তম।
ব্রিটিশরা যেভাবে ঘাঁটি ফেলে চলে গিয়েছিল, সেভাবে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তাহলে এই আরবদের যে আরও শক্তিশালী ইরানের মুখোমুখি হতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজতন্ত্রবিরোধী চেতনায় যদি আরব জনগণ ফুঁসে ওঠে এবং নতুন করে যদি আরব বসন্তের ঢেউ আছড়ে পড়ে তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এ অবস্থায় আরবের শাসকেরা কী করবেন? তাঁরা কি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার আশায় বসে থাকবেন, নাকি ইরানের শর্ত মেনে পরিবর্তিত নতুন বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন?
এর জবাব এখনই দেওয়া কঠিন। তবে শুধু পেট্রোডলারের জোরে আরব শাসকদের নিশ্চিত আয়েশি জীবন কাটানোর দিন যে শেষ হয়ে যাবে, তা অনেকটাই পরিষ্কার।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ই-মেইল: sarfuddin2003@gmail.com