অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ডুবে নিহতের স্বজনদের আহাজারি
অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ডুবে নিহতের স্বজনদের আহাজারি

মো. তৌহিদ হোসেনের কলাম

ভূমধ্যসাগরে মরণযাত্রার লাগাম টানবে কে?

মেজর জেনারেল হাবিব উল্লাহ লিবিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। তিনি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। প্রাক্তন ছাত্রদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি প্রায়ই নানান অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

গত ৩১ মার্চ লিবিয়া থেকে যে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত আনা হয়েছে, তার বিবরণ উঠে এসেছে তাঁর লেখার এক অংশে। টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, লেখাটিতে সামান্যতম অতিকথন নেই। লেখাটির একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি:

আসলে, কার কোথায় কষ্ট, কতটা তীব্র, সেই না জানে! রাষ্ট্রদূত বা অন্য কেউ বুঝবেন কেমন করে? জানা গেল, একজন ধাপে ধাপে বিরাশি লাখ টাকা দিয়েছেন দালাল-মাফিয়াদের। একজন পাওয়া গেল তিয়াত্তর লাখ টাকা দেওয়া শেষ। একজন শোনালেন, বাড়িতে গিয়ে হারিয়ে যেতে হবে, ভিটা-মাটি বিক্রি শেষ। চোখের পানি গোপন রাখতে পারলেও আরেকজনের ভারী গলাটা স্তিমিত হয়ে আসে, ‘স্যার, বিশ দিন পরে ভাত খাইছি এক দিন; পাঁচজনে মিল্যা এক বাটি। তরকারি ছাড়া। ওই ভাই খাইছে পঁচিশ দিন পরে, এক মুঠ।’

—স্যার, ঢিল মাইরা খবজা দেয় একটা, কুত্তারে খাবার দেওনের মতো। আবার মারেও।

—স্যার, একটা খেজুর দিয়া ইফতার করছি রোজার মাসে, রাইতে আর খাওয়া নাই।

—দুনিয়ার নরকের নাম লিবিয়া।

—ইতালি পাট্টির গরমে থাকা যায় না। এই জন্য বুড়া বয়সে একটা ভুল কইরা ফালাইছি ‘গেম দিতে’ যাইয়া। ১৪ বছর ধইরা আছি লিবিয়া, কী মনে হইলো, গেলাম গিয়া।

—এর আগে নাম লেখার সময় জিগাইছিলাম, শবে বরাতের আগে কি দ্যাশে যাইতে পারুম, স্যার? এক স্যারে কইল, শবে বরাত বইল্যা কিছু নাই। এইডা কি ঠিক হইল, আপনিই কন!

—আর কোনো কষ্ট নাই মনে। দ্যাশে যাইতে পারতাছি, আইজ ঈদের মতন লাগতাছে।

ভূমধ্যসাগরে ইউরোপ অভিমুখী নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রা

সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। কিছু উত্তর প্রশ্নের ভেতরেই থাকে, উত্তর না দিলেও চলে। কিছু প্রশ্নের মুখে ‘নীরবতা’ অনেক বেশি তীব্র ও জোরালো আওয়াজ তোলে। কতজন বিশ লাখের ওপরে টাকা দিয়েছে দালালকে?’—এ প্রশ্নে ১১৩ জনের মধ্যে অর্ধশতাধিক লোক হাত তুলেছে। দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার কথা বলে জানতে চাওয়া হলো, ‘কতজন আছেন’।

প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই একজন সলজ্জ হাসিতে বলেন, ‘স্যার, হাত তুলতে বইলেন না’। ততক্ষণে জমায়েতের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ ‘মাদারীপুরবাসী’ হিসেবে জানান দিলেন নিজেদের উপস্থিতি।

২.

পরদিন ওই ১১৩ জন অভিবাসী ঢাকায় পৌঁছান। তাঁদের বিমানভাড়া থেকে শুরু করে নিজ নিজ গ্রামে ফেরার পুরো খরচই দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইওএম’। ইউরোপ যাওয়ার সোনালি স্বপ্ন আর লিবিয়ার বিভীষিকা পেছনে ফেলে একেবারে শূন্য হাতে পরিবারের কাছে ফিরে যান এই মানুষগুলো।

এদিকে ৪ এপ্রিল লিবিয়ার তাজোরা থেকে প্রায় ১০৫ জন যাত্রী নিয়ে ইতালির লেম্পেদুসা দ্বীপের উদ্দেশে রওনা দেওয়া একটি কাঠের নৌকা সাগরে ডুবে যায়। পরে সেখান থেকে ৩২ জনকে জীবিত এবং ২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকি ৭১ জন নিখোঁজ; তাঁদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। উদ্ধার হওয়া এবং নিখোঁজ হওয়া এই যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও আছেন।

এর আগে গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ৪৮ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের দিকে আরেকটি নৌকা রওনা দিয়েছিল। ছয় দিন সাগরে ভেসে থাকার পর সেখান থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যাঁদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি।

ওই ঘটনায় মৃত বা নিখোঁজ ২২ জনের মধ্যে ২০ জন বাংলাদেশি বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ইতালির পথে নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়ায় মানব পাচারকারীরা এখন গ্রিস রুট ব্যবহার করছে। পরিসংখ্যান বলছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই সাধারণত সবচেয়ে বেশি থাকে।

একটি কথা মনে রাখা জরুরি—অবৈধ বা অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈধ পথে জনশক্তি রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে বৈধ অভিবাসনের যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এর পুরোপুরি সুযোগ নিতে চাইলে বাংলাদেশকে অবশ্যই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার এই মরণযাত্রার লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে।

নিঃসন্দেহে এই মানুষগুলো মানব পাচার চক্রের শিকার এবং তাঁরা চরম দুর্ভাগা। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সরকার ও সমাজের সহানুভূতি পাওয়ার দাবি রাখেন। তাঁদের পুনর্বাসন নিয়ে অনেক এনজিও এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাজ করছে, বিস্তর আলোচনাও হচ্ছে। কর্মজীবনে এবং অবসরে আমি এমন অনেক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছি।

তবে আমার কথাগুলো প্রায় সময়ই অনুষ্ঠানের মূল আলোচনার স্রোতের কিছুটা বিপরীতে ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজ আমি এমন কিছু কথা বলব, যা শুনতে বেশ নিষ্ঠুর লাগতে পারে এবং আমাকে কেউ কেউ হৃদয়হীন ভাবতে পারেন।

বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনা অনেক পুরোনো। দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাচারকারীরা যেমন নিত্যনতুন কৌশল বের করেছে, তেমনি পাচারের খরচ আর পাচারকারীদের মুনাফার অঙ্ক আকাশ ছুঁয়েছে। সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার মূল রুটটি ছিল—প্রথমে বিমানে কেনিয়া, এরপর স্থলপথে লিবিয়া হয়ে সেখান থেকে নৌকায় ওঠা।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথে পাচার হওয়া মানুষগুলো পণ্যের মতো কয়েক দফায় হাতবদল হন, আর এর সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁদের চরম দুর্ভোগ। এমনকি লিবিয়ায় নৌকায় তুলে দেওয়ার আগে তাঁদের বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এরপর আরও টাকা আদায়ের জন্য দেশে স্বজনদের কাছে পাঠানো হয় সেই নির্যাতনের ভিডিও।

৩.

লিবিয়ায় জিম্মি এসব মানুষের ওপর যারা নির্যাতন চালায়, তাদের মধ্যে অনেক বাঙালিও জড়িত। বাংলাদেশ থেকে যারা মানব পাচার করে এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়, তারাও এ দেশেরই মানুষ। নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে দেশে পরিবারের কাছ থেকে যারা মুক্তিপণ আদায় করে, তারা এই সমাজেই নির্বিঘ্নে বাস করছে। ভয়ংকর এই অপরাধী চক্রকে থামাতে হলে এসব অপরাধীকে ধরে জেলে ভরতেই হবে। আর তাদের ধরার একমাত্র মাধ্যম হলো পাচারের শিকার হওয়া এই ভিকটিমরাই।

একজন ভিকটিম যখন সাফারি বা পর্যটনের ভুয়া কথা বলে কেনিয়া যাওয়ার জন্য বিমানে ওঠেন, তখন থেকেই তিনি আইন ভঙ্গ করতে শুরু করেন। এরপর যাত্রাপথের প্রতিটি পদক্ষেপেই তাঁরা বেআইনি পথে হাঁটেন এবং একপর্যায়ে অপরাধীদেরই সহযোগিতা করে বসেন। এই মূল অপরাধীদের ধরতে হলে ভিকটিমদের সহায়তা জরুরি। আর আমার মতে, সেই সহায়তা বা তথ্য পাওয়ার অন্যতম উপায় হলো তাঁদের আটক করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা। তাঁদের অবশ্যই জানাতে হবে, বিদেশে যাওয়ার জন্য তাঁরা কাকে টাকা দিয়েছিলেন। লিবিয়ায় জিম্মি হওয়ার পর তাঁদের পরিবার দেশ থেকে কার হাতে মুক্তিপণ তুলে দিয়েছিল—সেটিও তাঁদের মুখ থেকে বের করে আনতে হবে।

কথাগুলো শুনতে অত্যন্ত কঠোর মনে হলেও এই জঘন্য অপরাধের শিকড় উপড়াতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। তবে কাজটা মোটেও সহজ নয়। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে পাচারকারী চক্রের মূল হোতারা ভিকটিম ও তাঁদের পরিবারকে হুমকি দেবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই তাঁদের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। এই দুষ্টচক্র ভাঙার জন্য কঠোর সংকল্প না থাকলে দায়সারা কোনো উদ্যোগে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

একটি কথা মনে রাখা জরুরি—অবৈধ বা অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈধ পথে জনশক্তি রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে বৈধ অভিবাসনের যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এর পুরোপুরি সুযোগ নিতে চাইলে বাংলাদেশকে অবশ্যই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার এই মরণযাত্রার লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে।

  • মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা

    *মতামত লেখকের নিজস্ব