হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তেহরানের একটি ভবনের পুনর্গঠন চলছে
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তেহরানের একটি ভবনের পুনর্গঠন চলছে

মতামত

যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানকে কে গড়বে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বাইরের চাপের ফলে ইরানের ভেতরে বিভাজন তৈরি হবে—এমন ধারণা ওয়াশিংটনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তবে বাস্তবে যুদ্ধের সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ কমে গিয়ে একটি সাময়িক ঐক্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই ঐক্য স্থায়ী নয়। যুদ্ধ থেমে গেলে বা কমে এলে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠবে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল দুটি ধারা স্পষ্ট। একদিকে রয়েছে নিরাপত্তাকাঠামো, যারা মনে করে সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধই দেশকে টিকিয়ে রেখেছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অন্যদিকে রয়েছে নির্বাচিত সরকার, যারা অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য বৃদ্ধি, তেল আয় বাড়ানো এবং কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে ক্ষমতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতার হাতে থাকে। আলি খামেনির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব এই ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রেখেছিল। তার মৃত্যুর পর সেই ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে। মোজতবা আনুষ্ঠানিকভাবে তার স্থলাভিষিক্ত হলেও তিনি এখনো সেই রাজনৈতিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।

নিরাপত্তাকাঠামোর মধ্যে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, বাসিজ, নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রয়েছে। এর মধ্যে বিপ্লবী গার্ড সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ইতিমধ্যে জ্বালানি, অবকাঠামো ও কৌশলগত খাতে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। মোজতবার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকলেও পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অর্থনীতি ও কূটনীতির দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর ক্ষমতা সীমিত। সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব রেখে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করেন।

মোজতবা যদি একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন, তবে নিরাপত্তাকাঠামোর প্রভাব আরও বাড়বে এবং সরকারের স্বাধীনতা কমে যাবে। এতে সরাসরি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার প্রধান হয়ে উঠবে। ফলে নেতৃত্বের কাঠামো অটুট থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে অন্যদের হাতে সরে যেতে পারে।

বর্তমানে ‘ট্রাম্পের যুদ্ধ’ ধারণা ইরানের বিভিন্ন পক্ষকে একত্রে রেখেছে। এই বর্ণনায় যুদ্ধকে জাতীয় অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে আপসের পথ কিছুটা সহজ হয়, কিন্তু ভেতরের মতবিরোধ দূর হয় না। যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে জনগণের অসন্তোষও রয়ে গেছে।

যুদ্ধ শেষে পুনর্গঠন প্রশ্নে এই মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে চাইবে, আর নিরাপত্তাকাঠামো সামরিক প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেবে। যদি পুনর্গঠনের নিয়ন্ত্রণ বিপ্লবী গার্ড-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের হাতে বেশি থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাকেও প্রভাবিত করবে। তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন খাত আগে পুনর্গঠিত হবে, সীমিত সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হবে এবং অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।

মোজতবা যদি একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন, তবে নিরাপত্তাকাঠামোর প্রভাব আরও বাড়বে এবং সরকারের স্বাধীনতা কমে যাবে। এতে সরাসরি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার প্রধান হয়ে উঠবে। ফলে নেতৃত্বের কাঠামো অটুট থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে অন্যদের হাতে সরে যেতে পারে।

  • সাহার মারানলু ইরানি আইনবিদ এবং লন্ডনের রয়্যাল হলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপে অনূদিত