
উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার আসল সমস্যা কি শয্যার সংখ্যা, নাকি বিদ্যমান শয্যা ও অবকাঠামোকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতার ঘাটতি? লিখেছেন সৈয়দ আবদুল হামিদ
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোর একটি। একজন রোগী যেন নিজ উপজেলা থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও জরুরি সেবা পান এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ সময়ে উচ্চতর পর্যায়ে রেফারেল সুবিধা লাভ করেন, সেই লক্ষ্যেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তব চিত্র এখনো এই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনেক প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ পদ, বিশেষ করে জুনিয়র কনসালট্যান্টের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য; রয়েছে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও অন্যান্য সহায়ক জনবলের ঘাটতি। একই সঙ্গে অপ্রতুল ওষুধ সরবরাহ, সীমিত ডায়াগনস্টিক সুবিধা, দুর্বল জরুরি সেবা এবং দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকা মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সেবার সক্ষমতাকে আরও সীমিত করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভবন, শয্যা ও অন্যান্য অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলো প্রয়োজনীয় ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তরিত হচ্ছে না।
এমন বাস্তবতায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প চূড়ান্ত করার কাজ এগোচ্ছে, যার লক্ষ্য দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা। ভবনের নকশাসহ প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পর্যালোচনা শেষে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আমাদের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার আসল সমস্যা কি শয্যার সংখ্যা, নাকি বিদ্যমান শয্যা ও অবকাঠামোকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতার ঘাটতি?
দেশের জেলা হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালেই সমস্যাটির একটি দিক স্পষ্ট হয়। এসব হাসপাতালে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি। অনেক রোগী এমন চিকিৎসার জন্যও জেলা বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান, যা উপজেলা পর্যায়েই দেওয়ার কথা। অন্যদিকে বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যমান শয্যার তুলনায় রোগী ভর্তি কম। অর্থাৎ একদিকে উচ্চতর পর্যায়ের হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার বেশি চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যমান সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। তাহলে যে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আমরা পুরোপুরি কার্যকর করতে পারিনি, সেটিকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রয়োজন কীভাবে নির্ধারণ করা হলো?
প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা যদি এই কর্মসূচিতে ব্যয় হয়, তবে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি বিশাল বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের সমালোচনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়নের বিরোধিতা নয়; বরং জনগণের অর্থ যাতে সর্বোচ্চ ফল তৈরি করে, তা নিশ্চিত করার দাবি। এই অর্থের একটি অংশ যদি বিদ্যমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক, জরুরি সেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একই অর্থে হয়তো অনেক বেশি মানুষকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
যেখানে রোগীর চাহিদা বেশি, জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি এবং বিদ্যমান হাসপাতালের শয্যা ব্যবহারের হার ধারাবাহিকভাবে উচ্চ, সেখানে শয্যা বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একই মডেলে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবেই—সব উপজেলার প্রয়োজন কি একই?
একটি জনবহুল উপজেলার প্রয়োজন আর একটি কম জনসংখ্যার উপজেলার প্রয়োজন এক হতে পারে না। কোথাও জেলা হাসপাতাল কাছেই, কোথাও উপজেলা ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। কোথাও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ রয়েছে, কোথাও প্রায় নেই। কোথাও রোগীর চাপ বেশি, কোথাও কম। তাই হাসপাতালের শয্যা নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রয়োজন, রোগীর প্রবাহ ও সেবার চাহিদা—কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার প্রতি প্রশাসনিক অঙ্গীকার নয়।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি পুরোনো সমস্যা হলো, আমরা নতুন ভবন তৈরি করি, শয্যা বাড়াই, যন্ত্রপাতি কিনি; কিন্তু সেই অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারি না। একটি হাসপাতালের ১৫১টি শয্যা থাকা এবং ১৫১টি শয্যায় মানসম্মত সেবা দেওয়ার সক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।
ধরা যাক, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন ভবন তৈরি করে শয্যা ৫০ থেকে ১৫১ করা হলো। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট বা অ্যানেসথেসিয়া সেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই; ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং সুবিধা সীমিত; অপারেশন থিয়েটার নিয়মিত চালু নয়। তাহলে অতিরিক্ত শয্যা কী দেবে? এর অর্থ এই নয় যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়ন প্রয়োজন নেই; বরং এগুলোকে শক্তিশালী করা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একটি কার্যকর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ও মৌলিক মাধ্যমিক চিকিৎসা, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, প্রসব ও নবজাতক সেবা, প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা, সাধারণ অস্ত্রোপচার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং যথাযথ রেফারেল ব্যবস্থা থাকা উচিত। এমন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ‘বাইপাস’ করে জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে বাধ্য না হন।
তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি বিদ্যমান ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সত্যিকার অর্থে ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হাসপাতালে পরিণত করতে পেরেছি? যদি না পারি, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেগুলোকে কার্যকর করা।
স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় একটি মৌলিক নীতি হলো, ‘এক মাপ সবার জন্য উপযুক্ত নয়।’ দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একই আকারের হাসপাতালে রূপান্তর করার পরিবর্তে দরকার একটি প্রয়োজনভিত্তিক মডেল। কোনো উপজেলা ৫০ শয্যায় যথেষ্ট হতে পারে, কোনোটি ৭৫ বা ১০১ শয্যার প্রয়োজন হতে পারে, আবার কোনো কোনো উপজেলায় ১৫১ শয্যা বা তার বেশিও প্রয়োজন হতে পারে। এ সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা যদি এই কর্মসূচিতে ব্যয় হয়, তবে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি বিশাল বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের সমালোচনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়নের বিরোধিতা নয়; বরং জনগণের অর্থ যাতে সর্বোচ্চ ফল তৈরি করে, তা নিশ্চিত করার দাবি। এই অর্থের একটি অংশ যদি বিদ্যমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক, জরুরি সেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে একই অর্থে হয়তো অনেক বেশি মানুষকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
নতুন ভবন নির্মাণের আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হোক এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা হোক। ১৫১ শয্যার হাসপাতাল বানানোর আগে নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করা উচিত: ৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে কি আমরা ৫০ শয্যার সেবা দিতে পারছি? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আরও ১০১টি শয্যা যোগ করার আগে সেই ‘না’-এর কারণ খুঁজে বের করাই হবে অধিক বুদ্ধিমানের কাজ।
আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল নির্মাণ এককালীন ব্যয় হলেও হাসপাতাল পরিচালনা একটি দীর্ঘমেয়াদি নিয়মিত ব্যয়। নতুন ১০১টি শয্যা মানে শুধু অতিরিক্ত বিছানা নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন হবে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সহায়ক কর্মী, ওষুধ, খাবার, বিদ্যুৎ, পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়। অর্থাৎ ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিপুল পরিচালন ব্যয়ের দায়ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান। নতুন ভবন উদ্বোধন করা যায়, ফলক লাগানো যায়, ছবি তোলা যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, যন্ত্রপাতি সচল রাখা কিংবা কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সাফল্য ততটা দৃশ্যমান নয়। অথচ জনগণের জন্য কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ; একটি বড় হাসপাতাল ভবন, নাকি ২৪ ঘণ্টা কার্যকর একটি হাসপাতাল?
যদি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, সেবার চাহিদা নিরূপণ এবং ব্যয়-সাশ্রয়িতা বিশ্লেষণ করা না হয়ে থাকে, তাহলে এখনই তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আর যদি এসব বিশ্লেষণ হয়ে থাকে, তাহলে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক। কোন উপজেলার কত শয্যা প্রয়োজন, বর্তমান শয্যা ব্যবহারের হার কত, কত রোগী জেলা হাসপাতালে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগে কত অতিরিক্ত সেবা পাওয়া যাবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। জনগণের অর্থে ৪৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার আগে জনগণের জানার অধিকার আছে।
প্রথমে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবা-প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হোক। প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও সেবার ঘাটতি পূরণ করা হোক। নতুন ভবন নির্মাণের আগে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হোক এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা হোক। ১৫১ শয্যার হাসপাতাল বানানোর আগে নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করা উচিত: ৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে কি আমরা ৫০ শয্যার সেবা দিতে পারছি? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আরও ১০১টি শয্যা যোগ করার আগে সেই ‘না’-এর কারণ খুঁজে বের করাই হবে অধিক বুদ্ধিমানের কাজ।
সৈয়দ আবদুল হামিদ, অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব