কাবুলের রাস্তায় তালেবান সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার পোস্টার
কাবুলের রাস্তায় তালেবান সর্বোচ্চ নেতা  হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার পোস্টার

মতামত

তালেবান যে কারণে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে

তালেবান আন্দোলনকে দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের সবচেয়ে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে দুই দশকের যুদ্ধেও এই সংগঠন ভাঙেনি। মতপার্থক্য, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বকে কখনোই প্রকাশ্যে বিভক্ত করেনি। সে কারণেই ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের সময় অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, তালেবান এবার একটি কঠোর কিন্তু স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা কায়েম করবে।

কিন্তু ক্ষমতায় বসার তিন বছরের মাথায় এসে সেই ধারণা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। আজ তালেবানের সবচেয়ে বড় সংকট কোনো বিদেশি শক্তি নয়, বরং তাদের নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও ভাঙন। সম্প্রতি ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই তথ্য।  

'রিফট অ্যাট টপ অফ দ্যা তালেবান' অর্থাৎ  তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ফাটল শিরোনামে প্রকাশিত বিবিসির ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরে একটি সুস্পষ্ট মতাদর্শিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে আছেন হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা, যিনি কান্দাহার থেকে কঠোর নিয়মকানুন আর শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার পক্ষে। অন্যদিকে কাবুলভিত্তিক একটি গোষ্ঠী আছে, যারা বাস্তবতা মাথায় রেখে প্রশাসন চালানো, দেশ পরিচালনা সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করতে চায়। এই দ্বন্দ্বকে অনেকেই সরাসরি ‘কান্দাহার বনাম কাবুল’ সংঘাত হিসেবে দেখছেন।

এই ভাঙনের মূল কারণটি অবশ্য তালেবানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার চরিত্রেই নিহিত। যুদ্ধকালীন তালেবান ছিল একটি আদর্শভিত্তিক আন্দোলন, যেখানে প্রধান লক্ষ্য ছিল বিদেশি দখলদারির অবসান। তখন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য তৈরি হয়েছিল শত্রুর বিরুদ্ধে যৌথ লড়াই থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর তালেবান রূপ নেয় শাসকগোষ্ঠীতে। আন্দোলন আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় আনুগত্য নির্ভর করে প্রশাসন চালানো, অর্থনীতি সচল রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের নীরব সম্মতি ধরে রাখার ওপর। এই রূপান্তরের সঙ্গে তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্ব মানসিক ও কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি।

তালেবানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা মূলত একজন ধর্মীয় আলেম। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের নায়ক নন, কূটনীতিকও নন। তাঁর ক্ষমতার উৎস শরিয়াহ ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় বৈধতা। যুদ্ধের সময় এই বৈশিষ্ট্য তালেবানের জন্য কার্যকর ছিল। কারণ, এতে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবলই ধর্মীয় কেন্দ্রীকরণ তালেবান শাসনে সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। আখুন্দজাদা নিজেকে শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে দায়বদ্ধ মনে করেন, জনগণের কাছে নয়। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চাপ তাঁর সিদ্ধান্তে খুব সীমিত প্রভাব ফেলছে।

এর বিপরীতে তালেবানের ভেতরেই একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন যুদ্ধের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। কাবুলভিত্তিক এই নেতারা জানেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্র ইন্টারনেট ছাড়া চলে না, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া অর্থনীতি দাঁড়ায় না, আর নারীদের পুরোপুরি বাদ দিয়ে সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাঁরা ধর্মের পথ ত্যাগ করতে চান না, বরং ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যেই বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় চান। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আখুন্দজাদার কঠোর, একমুখী ইসলামি আমিরাতের ধারণা সরাসরি সংঘর্ষে যাচ্ছে।

এই ভাঙনের আরেকটি বড় কারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কান্দাহারকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। কান্দাহার হলো তালেবান আন্দোলনের জন্মভূমি। নব্বইয়ের দশকে এখান থেকেই মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবানের উত্থান ঘটে। হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতার উৎস হিসেবে দেখেন। তাঁর দৃষ্টিতে কান্দাহার শুধু একটি ভৌগোলিক কেন্দ্র নয়, বরং তালেবানের খাঁটি আদর্শের প্রতীক। তাই রাজধানী কাবুলের তুলনায় কান্দাহার থেকে শাসন পরিচালনা করা তাঁর কাছে বেশি নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।

তালেবানের শীর্ষ নেতারা জানেন, তাঁদের ক্ষমতা শুধু ধর্মীয় বৈধতায় নয়, বাস্তব শাসনক্ষমতায় টিকে আছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র কার্যত অচল হয়ে পড়ত। এতে জনগণের অসন্তোষ বাড়ত, প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হতো এবং আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র হতো। সেই ঝুঁকি আর নেওয়া সম্ভব ছিল না।

কিন্তু এই কান্দাহারকেন্দ্রিকতা তালেবান শাসনের কাঠামোগত ভারসাম্য নষ্ট করেছে। কাবুলে থাকা মন্ত্রিসভা অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে চলে যায়। কান্দাহার থেকে ফরমান আসে, বাস্তবায়ন করতে হয়, প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না।

মার্কিন থিংক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেসন্স-এর কর্মসূচি সেন্টার ফর প্রিভেন্টিভ অ্যাকশনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কান্দাহার কেন্দ্রিক শাসনের ফলে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধারা নিজেদের ক্রমেই গুরুত্বহীন ও অবিশ্বাসের শিকার মনে করছেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও যোগাযোগের মতো খাতে কান্দাহারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কাবুলে থাকা তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে।

এই অসন্তোষের প্রভাব শুধু শীর্ষ নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ আফগান জনগণের জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটছে। শহরাঞ্চলে বেকারত্ব বাড়ছে, ব্যবসা স্থবির, ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট, তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গ্রামাঞ্চলে নীরব অসন্তোষ জমছে, যদিও তা প্রকাশ্যে আসে না। জনগণের বড় অংশ তালেবানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সরাসরি না বুঝলেও শাসনের অচলাবস্থা তারা প্রতিদিন অনুভব করছে।

এই প্রেক্ষাপটে কান্দাহার থেকে পুরো আফগানিস্তানে ইন্টারনেট বন্ধের আদেশ দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে প্রকাশ্যে এনে দেয়। নারীদের শিক্ষা বন্ধ করা বা পোশাকবিধি কঠোর করার মতো সিদ্ধান্তে অনেকেই ভেতরে-ভেতরে আপত্তি করলেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করা মানে ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার শিরায় আঘাত করা। প্রশাসন, বাণিজ্য, ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক লেনদেন, এমনকি নিরাপত্তাব্যবস্থাও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কাবুলের তালেবান নেতাদের কাছে  সিদ্ধান্ত কেবল আদর্শগত নয়, সরাসরি শাসনক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবে ধরা দেয়।

ফলে কাবুল গোষ্ঠী প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ নেতার আদেশ অমান্য করার ঝুঁকি নেয়। তারা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ কার্যত বাতিল করে দেয়। বিবিসির প্রতিবেদন মতে, কাবুলে অবস্থানরত প্রভাবশালী মন্ত্রীরা একত্র হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ইন্টারনেট পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন। অর্থাৎ কান্দাহার থেকে জারি হওয়া আমিরের ফরমান অমান্য করে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে বিপরীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। তালেবান কাঠামোর ভেতরে এটি নিছক মতপার্থক্য নয়, বরং শাসনক্ষমতার প্রশ্নে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হয়।

এখানে একটি গভীর রাজনৈতিক সত্য কাজ করেছে। তালেবানের শীর্ষ নেতারা জানেন, তাঁদের ক্ষমতা শুধু ধর্মীয় বৈধতায় নয়, বাস্তব শাসনক্ষমতায় টিকে আছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র কার্যত অচল হয়ে পড়ত। এতে জনগণের অসন্তোষ বাড়ত, প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হতো এবং আন্তর্জাতিক চাপ আরও তীব্র হতো। সেই ঝুঁকি আর নেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই ভাঙনের পেছনে ব্যক্তিগত নেতৃত্ব সংকটও রয়েছে। আখুন্দজাদা ধীরে ধীরে আরও অন্তর্মুখী ও কঠোর হয়ে উঠেছেন। পরামর্শের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমে গেছে। এতে শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরেই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বারাদার, হাক্কানি বা ইয়াকুবের মতো নেতারা জনসমক্ষে বেশি দৃশ্যমান, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত। তাঁরা বোঝেন, আধুনিক রাজনীতি শুধু ফরমান দিয়ে চলে না, বিশ্বাস, যোগাযোগ ও সীমিত সমঝোতাও দরকার।

এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন এখনো পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহে রূপ নেয়নি। কারণ, তালেবান আন্দোলনের ভেতরে আনুগত্য এখনো একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে কাজ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর বড় অংশ এখনো শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে। কিন্তু যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা গভীর ও কাঠামোগত। এটি আদর্শ বনাম বাস্তবতার সংঘাত, আলেমশাসন বনাম প্রশাসনিক রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বনাম যৌথ নেতৃত্বের লড়াই।

এই ভাঙন যদি বাড়ে, তাহলে তালেবানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আসবে ভেতর থেকেই। এতে আফগানিস্তান আবারও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে এগোবে। কারণ, একটি রাষ্ট্র শুধু ভয় ও ফরমান দিয়ে নয়, সমন্বয়, বাস্তবতা বোঝা এবং জনগণের নীরব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই টিকে থাকে। তালেবান আজ সেই মৌলিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।

  • সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    ই-মেইল: shoikotamin@yahoo.com
    *মতামত লেখকের নিজস্ব