মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মতামত

তারেক রহমানের প্রথম সিদ্ধান্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় বার্তা

রাজনীতিতে নেতারা কী প্রতিশ্রুতি দেন, তা দিয়ে নাগরিকেরা তাঁদের বিচার করেন না। তাঁরা বিচার করেন নেতারা কীভাবে জীবন যাপন করেন, কীভাবে আচরণ করেন এবং কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করেন, তা দিয়ে।

আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কয়েকটি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত আচরণগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলো প্রথমে প্রতীকী মনে হতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে এগুলো আরও গভীর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। এটি বহু বছরের ঘুণে ধরা শাসন সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টারই ইঙ্গিত ।

দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্ব শুধু নীতিগত ব্যর্থতার কারণে বাড়েনি, ক্ষমতার দৃশ্যমান দাম্ভিকতা ও বৈষম্যের কারণেও বেড়েছে।

সাধারণ মানুষ দেখেছে মন্ত্রীরা দীর্ঘ গাড়িবহর নিয়ে চলাচল করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থাকছে, যানজটে অ্যাম্বুলেন্স আটকে যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা মিস করছে, শ্রমিকেরা কাজের সময় হারাচ্ছে। সরকারি সেবা দায়িত্বের চেয়ে সুবিধার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এই বাস্তবতায় সংস্কার মানে কেবল নতুন নীতিমালা নয়, জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্ন।


তারেক রহমানের নির্দেশনাগুলো সরাসরি এই সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, মন্ত্রীরা আর বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না। তাঁরা সাধারণ সাদা টয়োটা গাড়িতে চলবেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত পরিবহনব্যবস্থাই ব্যবহার করবেন।

সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত চালক বা সরকারি জ্বালানি তাঁরা ব্যবহার করবেন না। অর্থাৎ সরকারি পদ ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নয়, জনসেবার জন্য।

ভিভিআইপি প্রটোকলেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর সীমিত থাকবে মাত্র চারটি গাড়িতে, যেখানে আগে ১২ থেকে ১৪টি গাড়ির বহর চলত। ভিভিআইপি চলাচলের সময় পুলিশ আর সড়ক বন্ধ করবে না।

কোটি মানুষের কাছে এটি কোনো ছোট প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এটি নাগরিক মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন থামানোর জন্য নয়, তাদের জীবন সহজ করার জন্য।

সবচেয়ে প্রতীকী সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিষয়ে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়িতে কেবল রাষ্ট্রীয় অতিথি বা বিদেশি প্রধানদের সফরের সময় জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন। নিয়মিত চলাচলে পতাকা থাকবে না। বার্তাটি স্পষ্ট। জাতীয় পতাকা ব্যক্তির নয়, জাতির।

প্রশাসনিক সংস্কারের দিকটিও লক্ষণীয়। অধিকাংশ মন্ত্রিসভা বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নয়, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এটি প্রশাসনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত।

একই সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শনিবারও কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। দীর্ঘসূত্রতা ও ফাইলজটের অভিযোগে ক্লান্ত প্রশাসনে এটি গতি আনার প্রতিশ্রুতি।

সব মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তগুলো নেতৃত্বের একটি নতুন সংজ্ঞা তুলে ধরে।

বাংলাদেশের মানুষ বহুদিন ধরে শুধু আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগই করেনি, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

ব্যক্তিগত আরামের জন্য সরকারি সম্পদ ব্যবহার, মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার, এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রদর্শনী ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে।

তারা দেখেছে রাষ্ট্র তাদের কাছ থেকে ত্যাগ চায়, কিন্তু ক্ষমতাধরদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে।

তারেক রহমানের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো একটি মৌলিক সত্যকে স্বীকার করে। দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাৎ নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারও দুর্নীতি।

মোটরকেড কমানো, অযথা আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা, বিলাসী সুবিধা বর্জন, এবং নাগরিক জীবনে বিঘ্ন কমানোর মাধ্যমে আসন্ন সরকার একটি বার্তা দিচ্ছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার বরদাশত করা হবে না।

রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দিক থেকে এগুলোর আর্থিক মূল্য হয়তো সীমিত, কিন্তু নৈতিক মূল্য অত্যন্ত বড়। কারণ, এগুলো একটি মানদণ্ড স্থাপন করে। নেতাদের নাগরিকদের মতোই জীবন যাপন করতে হবে।

এই পদক্ষেপগুলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের তরুণ আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকেও প্রতিফলিত করে। তরুণেরা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়নি। তারা চেয়েছিল ন্যায়, মর্যাদা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। তারা একটি আধুনিক রাষ্ট্র চায়, সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। এমন একটি সরকার, যা তাদের সময়, চলাচল এবং ভবিষ্যৎকে সম্মান করে।

একবিংশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক বৈধতা শুধু নির্বাচনে জয়ের ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে ক্ষমতায় থাকাকালীন আচরণের ওপর। নাগরিকেরা এখন নেতৃত্বকে বিচার করে তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে; রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল ও সেবাপ্রাপ্তির বাস্তবতার মাধ্যমে।

যখন একজন নেতার গাড়িবহর কোনো শ্রমিককে কারখানায় পৌঁছাতে বাধা দেয় না, বা কোনো অ্যাম্বুলেন্সকে আটকে রাখে না, তখন শাসনব্যবস্থা বাস্তব হয়ে ওঠে।

যদি এই সংস্কার ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং আমলাতন্ত্রে বিস্তৃত করা যায়, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের পথ খুলবে।

অবশেষে একটি জাতি শুধু বড় প্রকল্পে গড়ে ওঠে না, দৈনন্দিন চর্চায় গড়ে ওঠে। ছোট গাড়িবহর, খোলা রাস্তা, সাধারণ গাড়ি এবং কর্মমুখী সপ্তাহান্তের মতো সিদ্ধান্তই বড় বার্তা দেয়। নেতৃত্ব জনগণের মতোই নিয়মের অধীন। এই দৃষ্টান্ত বজায় থাকলে বাংলাদেশ শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে না, প্রতিষ্ঠানগতভাবে শক্তিশালী হবে। আর সেটিই তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি আধুনিক, অগ্রসর ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।

সংযমী মন্ত্রী, নিয়মমাফিক প্রশাসন, এবং নাগরিকের মতোই কষ্ট ভাগ করা নেতৃত্বই আধুনিক শাসনের ভিত্তি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার জন্য দরকার উদাহরণ।

অবশ্যই প্রতীকী পদক্ষেপ দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

তবে ইতিহাস বলে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রায়ই শুরু হয় নেতৃত্বের আচরণগত পরিবর্তন দিয়ে। শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের আচরণ বদলালে পুরো ব্যবস্থার ওপর শৃঙ্খলা দাবি করা সহজ হয়।

তারেক রহমানের প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলোর তাৎপর্য এখানেই। সরকারি পদ মর্যাদার নয়, সেবার।

এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও এগোতে পারে। দেশীয় নাগরিক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন সবখানেই এটি একটি বার্তা দেবে যে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা জবাবদিহি ও পূর্বানুমেয়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

অবশেষে একটি জাতি শুধু বড় প্রকল্পে গড়ে ওঠে না, দৈনন্দিন চর্চায় গড়ে ওঠে। ছোট গাড়িবহর, খোলা রাস্তা, সাধারণ গাড়ি এবং কর্মমুখী সপ্তাহান্তের মতো সিদ্ধান্তই বড় বার্তা দেয়। নেতৃত্ব জনগণের মতোই নিয়মের অধীন।

এই দৃষ্টান্ত বজায় থাকলে বাংলাদেশ শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে না, প্রতিষ্ঠানগতভাবে শক্তিশালী হবে। আর সেটিই তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি আধুনিক, অগ্রসর ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।

  • ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা


    *মতামত লেখকের নিজস্ব