মতামত

পে স্কেল বনাম দুর্নীতি: মকছেদ সাহেবের দেখা সেই সকালটি আসলে কার গল্প?

মকছেদ সাহেব জমির খাজনা দিতে অফিসে গেলেন। আড়াই শ টাকার খাজনা জমা দিতে তিনি এক হাজার টাকার একটি নোট এগিয়ে দিলেন। খাজনা গ্রহণকারী আড়াই শ টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন। বিষয়টি দেখে তিনি খুবই অবাক হলেন। তিনি ভাবলেন, হয়তো কিছু পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে।

রেজিস্ট্রার অফিস থেকে বের হয়ে তিনি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলেন। রাস্তায় অন্য দিনের চেয়ে জ্যাম কিছুটা কম। ট্রাফিক পুলিশ কোনো অযথা বাহানা না করে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ অতিরিক্ত কিছু চাইছেন না, কেউ কাউকে অযথা হয়রানিও করছেন না।

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়ে তিনি শুনলেন, চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি পূর্ণ কর্মঘণ্টা শেষ করেই হাসপাতাল ত্যাগ করছেন এবং সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখছেন না।

এরপর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সরকারি অফিসে গেলেন। সেখানে দেখলেন, কাজের গতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। যে কর্মচারী একসময় উপরি টাকা ছাড়া ফাইলের একটি পাতাও নাড়াতেন না, তিনিও কোনো ধরনের অতিরিক্ত অর্থ ছাড়াই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজটি করে দিলেন।

সকাল থেকেই যেন সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগছিল। পরে তিনি জানতে পারলেন, সরকার দুর্নীতি ও ঘুষ কমাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সে কারণেই নাকি সরকারি সেবায় এসেছে গতি, বন্ধ হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতি। ঠিক যখন তিনি এ সুখবর ভেবে তৃপ্তির হাসি হাসবেন, তখনই অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বুঝতে পারলেন, সবই ছিল একটি স্বপ্ন।

বাস্তবে ফিরে তিনি প্রতিদিনের অভ্যাসমতো এক কাপ চা হাতে সংবাদপত্র খুললেন। আর প্রথম পাতা থেকেই যেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার দূরত্ব তাঁকে নির্মমভাবে মনে করিয়ে দিল।

একটি শিরোনামে লেখা—এনবিআরের এক কর্মকর্তার গ্রামের বাড়িতে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ। আরেকটিতে—দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চারটি প্রতিষ্ঠানে দুদকের অভিযান। অন্য একটি সংবাদে—অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের মামলায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রী কারাগারে।

আরও রয়েছে টেন্ডার জালিয়াতি, কমিশন-বাণিজ্য, ভূমি অফিসে ঘুষ, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, প্রশিক্ষণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, পদোন্নতিকে ঘিরে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ। মকছেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিছুক্ষণ আগেও যে বাংলাদেশকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, বাস্তবের সংবাদপত্র যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ছবি তুলে ধরছে।

একটি পত্রিকার এক দিনের কয়েকটি শিরোনামই যেন আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু নির্মম প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। এই স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে নবম জাতীয় পে স্কেলের আলোচনা। দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এটি স্বস্তির খবর।

শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, সততারও মূল্য দিতে হবে। যাঁরা নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করেন, জনগণকে হয়রানি করেন না, তাঁদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে অন্যদের জন্য ইতিবাচক বার্তা তৈরি হবে। আমরা চাই, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্মানজনক বেতন পান। কারণ, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্বই হলো তার কর্মচারীদের এমন বেতন দেওয়া, যাতে তাঁরা সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারেন। একজন সরকারি কর্মচারীকেও বাসাভাড়া দিতে হয়, সন্তানের পড়াশোনা চালাতে হয়, চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয়। তাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানো প্রয়োজন।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। শুধু বেতন বাড়লেই কি দুর্নীতি কমবে?

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। দেশের আলোচিত অনেক দুর্নীতির ঘটনায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কম বেতনের কর্মচারী ছিলেন না। অনেকেই উচ্চ পদে ছিলেন। বেতন, গাড়ি, বাসস্থান ও নানা সুযোগ-সুবিধার কোনো অভাব ছিল না। তারপরও তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

অর্থাৎ দুর্নীতির কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়। লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল জবাবদিহি ও শাস্তির ভয় না থাকাও বড় কারণ। যখন কেউ বিশ্বাস করে যে অনিয়ম করেও পার পাওয়া যাবে, তখন বেতন যতই বাড়ুক, দুর্নীতির প্রলোভন থেকে সবাই দূরে থাকবে না। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিগ্রস্ত নন।

আজও অসংখ্য সৎ কর্মকর্তা প্রতিকূল পরিবেশেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা প্রশাসন, সরকারি হাসপাতাল, পুলিশ, শিক্ষা, কৃষি কিংবা মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা নীরবে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁদের কারণেই প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তাই কয়েকজনের অনিয়মের দায় পুরো সরকারি কর্মচারী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।

তাহলে সমাধান কী?

বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এটি সমাধানের একটি অংশ মাত্র। এর পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী জবাবদিহি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, সম্পদের নিয়মিত অডিট, সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশ্বের অনেক দেশে সরকারি সেবা ডিজিটাল হওয়ার পর ঘুষের সুযোগ কমেছে। অনলাইনে আবেদন, অনলাইনে ফি পরিশোধ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা এবং প্রতিটি ধাপের ডিজিটাল নজরদারি দুর্নীতির অনেক পথ বন্ধ করেছে। বাংলাদেশেও এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে হবে।

শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, সততারও মূল্য দিতে হবে। যাঁরা নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করেন, জনগণকে হয়রানি করেন না, তাঁদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে অন্যদের জন্য ইতিবাচক বার্তা তৈরি হবে। আমরা চাই, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্মানজনক বেতন পান। কারণ, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে।

কিন্তু সেই সঙ্গে জনগণেরও একটি প্রত্যাশা আছে। রাষ্ট্র যখন কর্মচারীদের ওপর আস্থা রেখে বাড়তি সুবিধা দেয়, তখন সেই আস্থার প্রতিদান আসতে হবে সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।

মকছেদ সাহেবের স্বপ্ন খুব বড় নয়। তিনি শুধু চান, সরকারি অফিসে গিয়ে নিজের কাজটি সময়মতো করতে পারবেন। একটি ফাইল এগিয়ে নিতে কাউকে আলাদা টাকা দিতে হবে না। হাসপাতালে চিকিৎসককে পাওয়া যাবে। থানায়, ভূমি অফিসে কিংবা রেজিস্ট্রি অফিসে নিজের অধিকার পেতে ঘুষ বা তদবিরের প্রয়োজন হবে না।

এই স্বপ্ন শুধু মকছেদ সাহেবের নয়। এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে নতুন পে স্কেল অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি দূর করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান।

সেদিনই হয়তো মকছেদ সাহেবের স্বপ্ন আর স্বপ্ন থাকবে না। সেটাই হবে বাংলাদেশের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

  • হুমায়ুন আহমেদ করপোরেট জনসংযোগ পেশাজীবী।

humayun.mcj02@gmail.com

মতামত লেখকের নিজস্ব