কৃষিকাজে ব্যস্ত গারো নারীরা। মধুপুর, টাঙ্গাইল
কৃষিকাজে ব্যস্ত গারো নারীরা। মধুপুর, টাঙ্গাইল

মতামত

জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো কি মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না?

‘একদিন আমাদের দিন ফিরে আসবে। পূর্ণিমার রাতে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন হবে। সমাজ থেকে পাপ ও অশুচিতা দূর হয়ে যাবে। পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে বসবে আনন্দ-উৎসব। বনের পাখিরা গান গাইবে। গাছের ছায়াতলে জন্ম নেবে নতুন শিশু। একদিন আমাদেরও দিন ফিরে আসবে’—এমন গান বহু বছর আগে গাইত লোহার জাতির মানুষেরা।

কিন্তু সেই নিয়মিত জীবনে হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ে বহিরাগত মানুষের দল। সঙ্গে আসে মহাজন, জোতদার-তহশিলদার, সুদখোর, থানা-পুলিশ, বন পাহারাদার আর গোরমেন। লোহারদের গ্রাম ছিল ধূলিধূসর। মাটির রং বড় অদ্ভুত—গাঢ় বাদামি-লাল। এমন মাটি লাল মাটির দেশেও খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই মাটি খুঁড়ে তারা লোহা তুলত, কামারশালায় নিয়ে বানাত লোহার জিনিসপত্র।

বলা হয়, তারা আগুন খেত, আগুনে স্নান করত। তাদের নগরের নাম ছিল লোহরী। কফিল আহমেদ গেয়েছেন—‘আগুনে ঘুমাই, আগুনে খাই’। কোথা থেকে তিনি এসব কথা পেয়েছেন, কে জানে। লোককথা আছে, লোহার কাজ করে তারা যে ধনদৌলত অর্জন করত, একদিন তা সব ছাই হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। সেই থেকেই লোহার জাতি চরম দরিদ্র।

এই লোহার জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি রয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের ৪৫ নম্বর তালিকায়। এটি প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী তাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৪১৮ জন। এই মানুষগুলোর কথা কি দেশের মানুষ জানেন? জানেন কি নীতিনির্ধারকেরা?

জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাটার ছবির শেষ দৃশ্যে জ্যাক সুলি ও নিওতিরির কথোপকথনে যে ‘আই সি ইউ’ বলা হয়, তার অর্থ শুধু একে অপরকে দেখা নয়। এর ভেতরে আছে অন্য মানুষটিকে তার সম্পূর্ণ সত্তাসহ বোঝা, তার অস্তিত্বকে স্বীকার করা এবং তার প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা। এটি এমন এক দেখা, যেখানে চোখের পাশাপাশি হৃদয়ও সক্রিয় থাকে। এই অর্থে প্রশ্ন ওঠে—আমাদের রাষ্ট্র কি ভবিষ্যতে লোহার জাতিসহ সব সংখ্যালঘু মানুষের দিকে কেবল প্রশাসনিক বা সংখ্যাগত দৃষ্টিতে নয়, বরং মানুষ হিসেবে, মর্যাদা ও অধিকারের পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে তাকাতে পারবে?

আদিবাসীদের উন্নয়নে মানবাধিকারকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। তাদের মনে যেন কখনো এই বোধ জন্ম না নেয় যে তারা অন্যের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর এর বড় দায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর। আস্থা তৈরি করেই এ কাজটি করতে হবে।

আজ এখানে লোহার জাতির উদাহরণ দিলাম। আমি বহু জায়গায়, বহুবার, নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছি—রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যেন এই নাগরিকদের শুধু চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। সহানুভূতির মন নিয়ে যেন তাদের সঙ্গে জানাজানি ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তৈরি হয় সেতুবন্ধ। আমরা এক নতুন বাংলাদেশ দেখতে চাই।

অধিকারবঞ্চিত মানুষের জন্য নির্বাচনী ইশতেহারের ভাষা যেন হয় সহৃদয়, নম্র ও বিনীত। যেন তা হয় সরল ও সততাপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন আলোচনায়।

অতীতেও নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল সুন্দর সুন্দর অঙ্গীকার। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং চা-বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের ওপর বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসানের কথা বলা হয়েছিল। তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও মান–মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল।

আদিবাসীদের জমি, জলাধার ও বন এলাকায় সনাতনী অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভূমি কমিশন গঠনের অঙ্গীকারও ছিল। শুধু তা–ই নয়, এই জনগোষ্ঠীর অধিকার স্বীকৃতি, তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ এবং সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন তো দূরের কথা, উল্টো চরম অবহেলা, অপমান ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের। অর্থনৈতিক দুর্দশা, সীমাহীন বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা, কোথাও কোথাও দেশান্তর, ভূমি হারানো, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিচার না পাওয়া—সব মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে গভীর অনিশ্চয়তার।

বিএনপির ১৩ জুলাই ২০২৩ প্রণীত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফার শুরুতেই দেশে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা বিষয়ে ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’।

এই নীতির ভিত্তিতে সব ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। জাতি–ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিগোষ্ঠী সংবিধানপ্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং রাষ্ট্র তাদের জীবন, সম্ভ্রম ও অধিকারের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আশা করি, এসব অঙ্গীকার আগামী দিনে বাস্তবে রূপ পাবে।

যুগ যুগ ধরে ঐতিহাসিক অবিচার, শোষণ ও বঞ্চনার ফলে সমাজের কিছু মানুষ প্রান্তিক ও অনগ্রসর অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে লেখা থাকা দরকার—বাংলাদেশ একটি বহু জাতিগোষ্ঠী, বহু ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। একটি জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারের গুরুত্ব আরও বাড়াবে।

আমরা চাই, এবার রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের ভাষা হোক শুদ্ধ, সৎ ও দরদি। প্রান্তিক মানুষের মনে যেন নতুন আশার সঞ্চার হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যেন তাদের জায়গা তৈরি হয়। তারা যেন শুধু সহানুভূতির পাত্র না থাকে, বরং তাদের মধ্য থেকেই কর্মকর্তা তৈরি হয়—এমন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের এলাকায় সৎ, সংবেদনশীল ও মানবিক সরকারি কর্মকর্তার নিয়োগ জরুরি।

মহাশ্বেতা দেবী তাঁর টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা উপন্যাসের শেষে লিখেছিলেন—‘আদিবাসীদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগের সংবাহনবিন্দু তৈরি হয়নি। সভ্যতার নামে আমরা ধীরে ধীরে একটি মহাদেশ ধ্বংস করেছি। হাজার হাজার বছর ধরে আমরা তাদের ভালোবাসিনি, সম্মান করিনি। আজ শতাব্দীর শেষে দাঁড়িয়ে সময় কোথায়? আমাদের পথ আলাদা, তাদের পথ আলাদা। প্রকৃত কোনো আদান-প্রদান হয়নি, যা আমাদের সমৃদ্ধ করতে পারত।’

গভীর উপলব্ধি ও ভালোবাসা ছাড়া আদিবাসীদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এই ভালোবাসার প্রতিফলন দরকার। আদিবাসীদের উন্নয়নে মানবাধিকারকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। তাদের মনে যেন কখনো এই বোধ জন্ম না নেয় যে তারা অন্যের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর এর বড় দায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর। আস্থা তৈরি করেই এ কাজটি করতে হবে।

আশা করি, আগামী দিনের রাষ্ট্র হবে আরও বেশি গণতান্ত্রিক ও মানবিক। দেশে একটি সুস্পষ্ট ইনডিজেনাস পলিসি থাকবে। সেই নীতির মূল কথা হবে—ইনডিজেনাস টাচ। অসীম নম্রতা, শুদ্ধতা ও উদারতা নিয়ে লেখা হবে সেই নীতিমালার বাক্যগুলো। সবাইকে মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে এসব কথাই লেখা থাকবে—এই প্রত্যাশা রাখি। নিশ্চয় একদিন আমাদের দিন ফিরে আসবে।

সঞ্জীব দ্রং কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

* মতামত লেখকের নিজস্ব