
দিন যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে গত বছরের শেষ দিকে ও চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলা সংঘাতের শেষ নয়, বরং দুই উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন এক দ্বন্দ্বের সূচনা।
কারও কারও কাছে মনে হয়েছিল, এটি ছিল ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে একটি কৌশলগত মতবিরোধ। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল আরব বসন্ত-পরবর্তী আঞ্চলিক ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক গভীর কৌশলগত বিচ্ছেদ।
গত ডিসেম্বরে সৌদি আরব ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে আমিরাত থেকে পাঠানো একটি অস্ত্রবাহী চালান বোমা হামলায় ধ্বংস করে। ওই অস্ত্রগুলো যাওয়ার কথা ছিল আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছে। এরপর চলতি মাসের শুরুতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হাদরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশে এসটিসির ঘাঁটিগুলোতে বিমান হামলা চালায়।
প্রায় রাতারাতি এসটিসির সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি ভেঙে পড়ে। সংগঠনটির নেতা আইদারুস জুবাইদি পালিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নেন।
সৌদি আরবের এই সামরিক অভিযানের মাধ্যমে রিয়াদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘এই খেলা’ আর চলবে না। ইয়েমেন থেকে সুদানসহ বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে আমিরাত যেভাবে নিজের সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আর তা নীরবে মেনে নিতে রাজি নন।
আরও বিস্তৃত অর্থে, এই অভিযান এমন দুটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সম্পর্কে বড় ধরনের দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়, যাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল।
২০১৩-পরবর্তী আরব বিশ্বজুড়ে প্রতিবিপ্লব সংগঠনে এবং কাতারের ওপর চার বছরব্যাপী অবরোধ আরোপে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব একসঙ্গে কাজ করেছিল। এখন সেই জোট ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও গভীর এক পুনর্বিন্যাসের আভাস মিলছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, বিশেষ করে এসটিসির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পর সৌদি আরব ও আমিরাতের রাজনৈতিক পরিসর ও গণমাধ্যমে যেভাবে কথা বলা হচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, বিরোধটা শুধু ইয়েমেনকে নিয়ে নয়, সমস্যা আরও গভীরে।
নিজেদের মিত্র ও প্রতিনিধি গোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং জোটের সমীকরণ বদলাতে থাকায় আমিরাত ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে তারা ভারতের মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি গাজা পরিস্থিতি ঘিরে ইসরায়েলের সঙ্গে নজরদারি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা নীরবে বাড়াচ্ছে।
সৌদি আরব ও আমিরাত—দুই দেশই সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্রচারণার লড়াইয়ে অভিজ্ঞ। তাই এই সংকটকে ঘিরে একে অপরের বিরুদ্ধে কথার লড়াই বা ‘বয়ানের যুদ্ধ’ শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক।
রিয়াদ এখন আমিরাতের নেতৃত্ব ও তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জোরালো মিডিয়া প্রচারণা চালাচ্ছে। এই প্রচারণায় আমিরাতকে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে, দেশটি নিজেদের এবং ইসরায়েলের স্বার্থে আরব দেশগুলোকে ভাগ করতে চায়।
এ সপ্তাহে সৌদি রাষ্ট্রীয় টিভি আল-এখবারিয়া দাবি করেছে, আমিরাত উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছে। পরিচিত সৌদি লেখক সালমান আল-আনসারি বলেছেন, মিসরে আমিরাতের অর্থনৈতিক সহায়তা আসলে আধুনিক সময়ের বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা।
গত সপ্তাহে সৌদি লেখক ও গবেষক আহমেদ বিন ওসমান আল-তুয়াইজরি অভিযোগ করেছেন, আমিরাত ইচ্ছাকৃতভাবে সৌদি আরবের ক্ষতি করতে ইসরায়েলের খুব কাছাকাছি চলে গেছে। তাঁর অভিযোগ আমিরাত ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে।
এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, সৌদি আরবের এসব প্রচারণার জবাবে আমিরাত তাদের সংবাদমাধ্যমে খুব বেশি জবাব দেয়নি। বরং দেশটির ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র ইসরায়েলের পক্ষ থেকেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলপন্থী লবিগোষ্ঠী, কিছু মার্কিন গণমাধ্যমকর্মী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিকেরা সৌদি আরবের সমালোচনা করছেন।
গত ২৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন অ্যান্টিডিফেমেশন লিগ (এডিএল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) আমিরাতের পক্ষে পোস্ট দিয়ে সতর্ক করে বলে, সৌদি আরবের কিছু প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর দিন দিন আরও জোরালোভাবে ইহুদিবিদ্বেষী ও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করছে এবং আগ্রাসীভাবে আব্রাহাম চুক্তিবিরোধী বক্তব্য ছড়াচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলপন্থী মার্কিন সম্প্রচারকর্মী মার্ক লেভিন তাঁর এক্সে থাকা প্রায় ৫০ লাখ অনুসারীর উদ্দেশে সৌদি আরববিরোধী বেশ কয়েকটি মন্তব্য করেন। উদাহরণ হিসেবে, ২৬ জানুয়ারি তিনি লেখেন—১১ সেপ্টেম্বরের হামলার জন্য তিনি সৌদি আরবকে ‘কখনোই ক্ষমা করবেন না’ এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি ‘আমিরাতকে ধ্বংস করার চেষ্টা’ করছেন।
ইসরায়েলপন্থী মার্কিন সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ‘আক্রমণের’ জন্য সৌদি আরবকে তিরস্কার করেন। একই সঙ্গে জিউইশ ইনসাইডার, জেরুজালেম পোস্ট, অ্যাক্সিওস, আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যম ও থিঙ্কট্যাংক আমিরাতের পক্ষে অবস্থান নেয়।
সৌদি আরব ও আমিরাত—দুই দেশই মিডিয়া ও ডিজিটাল যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী। তাই তাদের বিরোধের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বয়ান ও প্রচারণা নিয়ে লড়াই শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে আমিরাত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে আধুনিক ও পরিকল্পিত প্রচারণায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।
গবেষক মার্ক ওউইন জোন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের উপসাগরীয় সংকটের সময় আমিরাত টুইটার বটবাহিনী ব্যবহার করে কাতারের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আরও জানান, এল-ফাশেরে গণহত্যা চালানোর পর সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের প্রতি সমর্থন জোরদার করতে আমিরাত প্রায় ১৯ হাজার বট ব্যবহার করেছিল।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে দ্য ইন্টারসেপ্টের এক অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলধারার মার্কিন গণমাধ্যমে কাতারবিরোধী খবর ছড়াতে সহায়তার জন্য আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামস্টল গ্রুপকে নিয়োগ দিয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত-সৌদি সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন লোহিত সাগর, অ্যাডেন উপসাগর এবং অন্যখানেও তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে।
সম্প্রতি সোমালিয়া আবুধাবির সঙ্গে করা কয়েকটি বড় চুক্তি বাতিল করেছে। একই সঙ্গে খবর পাওয়া যাচ্ছে, সোমালিয়া ও মিসর মিলে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করার চেষ্টা করছে। সৌদি-সোমালিয়া-মিসর যৌথ এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আমিরাতের প্রভাব কমে যাবে।
এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক এখন সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিতে চাইতে পারে। এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি শক্তিশালী দেশ একধরনের ‘ইসলামিক ন্যাটো’র মতো জোট গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে। এমন একটি জোট শুধু আমিরাতের জন্যই নয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
নিজেদের মিত্র ও প্রতিনিধি গোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং জোটের সমীকরণ বদলাতে থাকায় আমিরাত ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে তারা ভারতের মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি গাজা পরিস্থিতি ঘিরে ইসরায়েলের সঙ্গে নজরদারি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা নীরবে বাড়াচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্যও এক বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনার পর যে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, সৌদি আরব এখন অনেকটাই তা কাটিয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে একসময় আঞ্চলিক শক্তিধর দেশ মিসর এখনো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে দুর্বল। আর ক্রমশ আরও দৃঢ় হয়ে ওঠা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেকে আরব ও মুসলিম বিশ্বের একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরার অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে মনে হচ্ছে।
কয়েক বছর আগেও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের পক্ষে মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা ভাবাই ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু আজ সেই ধরনের একটি চুক্তি নিয়ে নাকি সক্রিয় আলোচনা চলছে।
মোহাম্মদ এলমাসরি দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজে মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত