মতামত

সংসদ সদস্যদের শপথ সিইসি কর্তৃক গ্রহণের সাংবিধানিক বৈধতা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবং সরকারি গেজেটে ফলাফল প্রকাশের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ কে গ্রহণ করাবেন? সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণত এই দায়িত্ব বিদায়ী স্পিকারের। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এই দায়িত্ব পালন করতে অক্ষম। নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করেছে যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এই শপথ গ্রহণ করাবেন, যা কেবল বাস্তবসম্মত নয়, বরং সংবিধানের সরাসরি অনুমোদিত।

সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধানগুলো

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮-এ শপথসংক্রান্ত বিধানগুলো নির্ধারিত। অনুচ্ছেদ ১৪৮(১)-এ বলা হয়েছে, তৃতীয় তফসিলে উল্লিখিত কোনো পদে নির্বাচিত বা নিযুক্ত ব্যক্তি কার্যভার গ্রহণের আগে শপথ গ্রহণ করবেন।

তৃতীয় তফসিলের (এন্ট্রি ৫) অনুসারে সংসদ সদস্যের শপথের ফরম:

‘আমি, [নাম], সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইয়া এই মর্মে দৃঢ়ভাবে শপথ (বা ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইনানুযায়ী যে দায়িত্ব গ্রহণ করিতে যাইতেছি তাহা যথাযথভাবে পালন করিব: আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব এবং আমি সংসদ সদস্য হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হইব না।’

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে যে ‘এই সংবিধানের অধীন নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির শপথ গ্রহণ আবশ্যক হইলে অনুরূপ ব্যক্তি যেরূপ ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ ব্যক্তির নিকট সেইরূপ স্থানে শপথ গ্রহণ করা যাইবে।’ সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংসদ সদস্যদের স্পিকার কর্তৃক লিখিত ফরমে শপথের বিষয়টি উল্লেখ আছে। কিন্তু গণ–অভ্যুত্থানের পর যেহেতু জাতীয় সংসদের স্পিকার পলাতক রয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে, সেহেতু কর্তৃক নির্ধারিত কোনো ব্যক্তি যিনি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বিতর্ক দেখা দিয়েছে যে তাহলে সংসদ সদস্যদের শপথ কীভাবে হবে বা কে শপথ পড়াবেন। এর সমাধান আমাদের সংবিধানেই আছে। ২০০৪ সনে সংবিধান (চতুর্দশ সংশোধন) আইন দ্বারা সংবিধানে ১৪৮ [২ (ক)]

অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদের বিধান নিম্নরূপ:

‘১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যেকোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’

এই দফা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে স্পিকার বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি শপথ না করালে পরবর্তী তিন দিনে সিইসিকে এটি করতে হবে।

অনুচ্ছেদ ১৪৮(৩)-এ বলা হয়েছে, শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর ব্যক্তি কার্যভার গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবেন। সিইসি কর্তৃক শপথের পর এমপিরা অবিলম্বে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্য হয়ে উঠবেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিইসির ভূমিকার বৈধতা

বিদায়ী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার বর্তমানে তাঁদের দায়িত্ব পালনের অবস্থায় নেই, কারণ, পূর্ববর্তী সংসদ কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আইনজ্ঞরা একমত যে তাঁদের পদ কার্যকরভাবে শূন্য বা তাঁরা ‘যেকোনো কারণে’ অক্ষম, যা অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ ক)-এর সঠিক শর্ত। এই দফায় আনুষ্ঠানিক শূন্যতা জরুরি নয়; অক্ষমতা বা অপালনই যথেষ্ট।

নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুর রহমানেল মাসুদ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এখানে অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) সরাসরি প্রযোজ্য। কেউ কেউ প্রস্তাব করেছেন যে রাষ্ট্রপতি (প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শে) প্রধান বিচারপতির মতো অন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন অনুচ্ছেদ ১৪৮(২)-এর অধীন। কিন্তু এই সাধারণ বিধান ১৪৮(২ক)-এর নির্দিষ্ট, সময় বাঁধা বিকল্প ব্যবস্থাকে অতিক্রম করতে পারে না। ২০০৪-এর সংশোধনী অস্বাভাবিক স্থানান্তরকালে সংসদ গঠনে স্থবিরতা এড়াতে প্রণীত। সংবিধানের এই বিধান তৎকালীন আইনমন্ত্রী জনাব মওদুদ আহমেদের বিচক্ষণতা জাতির কাছে আবারও প্রমাণিত হলো।

অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক)-এর উৎপত্তি পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংকটের অভিজ্ঞতায়। এটি নিশ্চিত করে যে নতুন সংসদের গঠনের সাংবিধানিক অস্তিত্ব বিদায়ী কর্মকর্তাদের উপলব্ধতা বা ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। সাধারণ সময়ে এর অপ্রয়োগ এটিকে ২০২৪-পরবর্তীকালীন সংকটের মতো পরিস্থিতির জন্য সুরক্ষা হিসেবে প্রমাণ করে।

প্রভাব এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো

সিইসি কর্তৃক শপথের পর নির্বাচিত এমপিরা তাৎক্ষণিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ গঠন করবেন। কার্যপ্রণালি বিধি অনুসারে, শপথ পরিচালনাকারী ব্যক্তি নতুন স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করবেন, যা সংসদীয় কার্যক্রম, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সরকার গঠনকে সাংবিধানিক শূন্যতা ছাড়াই সুগম করে।

যাঁরা সিইসির ভূমিকাটিকে ‘সংসদীয় ঐতিহ্যের লঙ্ঘন’ বলে সমালোচনা করছেন, তাঁরা সংবিধানের স্পষ্ট নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করছেন। ঐতিহ্য সংবিধানের সর্বোচ্চতা (অনুচ্ছেদ ৭)-এর অধীন। ১৪৮(২ক)-এর অধীন গৃহীত শপথ স্পিকারের শপথের সমতুল্য বৈধ।

উপসংহার

সিইসি কর্তৃক শপথ গ্রহণ কোনো সাংবিধানিক ব্যতিক্রম নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) ঠিক এমন পরিস্থিতির জন্য প্রণীত, যেখানে প্রচলিত প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। এই কাঠামো আইনের শাসনকে সুরক্ষিত করে, শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা প্রতিরোধ করে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকাশিত জনইচ্ছাকে সম্মান করে। সিইসির সামনে গৃহীত শপথ সম্পূর্ণ বৈধ হবে, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কোনো আইনি বাধা ছাড়াই কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম করবে।

মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান

চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও মহাসচিব, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)