জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন কী সিদ্ধান্ত নেবেন?
জ্ঞানেশ কুমার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন কী সিদ্ধান্ত নেবেন?

মতামত

ভারতে সিইসি কেলেঙ্কারি: মোদি সরকারের সুদিন কি শেষ হয়ে এসেছে  

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অজস্র অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে আমি আপনাদের বিরক্ত করতে চাই না। এমনকি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ঋতিকা চোপড়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতপার্থক্যের খবর প্রকাশিত হওয়ার আগেই, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই ভেবেছিলেন যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির পচন কতটা গভীরে গিয়ে ঠেকেছে।

এক বছরের বেশি সময় আগে, ২০২৫ সালের আগস্টে আমি এক কলামে লিখেছিলাম, ‘আমাদের বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের প্রতি আস্থা বা শ্রদ্ধা রাখেন, এমন মানুষ আমি ইদানীং খুব কমই দেখতে পাই। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার দেশবাসীর একটি বড় অংশের শ্রদ্ধা হারিয়েছেন।’

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্য প্রিন্টে জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে আমি লিখেছিলাম, ‘আধুনিক ভারতের ইতিহাসে আমাদের গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি সামলানোর জন্য তাঁর মতো অযোগ্য ও কম শ্রদ্ধেয় মানুষ আগে কখনো আসেননি।’

পরের মাসে আমি আবারও লিখেছিলাম, ‘জ্ঞানেশ কুমার যদি সত্যিই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পবিত্রতা রক্ষা করতে চাইতেন, তবে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট ও একপেশে কাজ করছেন বলে যে সমালোচনা উঠেছিল, তার মুখেই তিনি পদত্যাগ করতেন।’

তাই আমি পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে বারবার বলতে চাই না যে এই লোকের পদে বহাল থাকা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কতটা লজ্জাজনক। কারণ, আমার মনে হয়, বেশির ভাগ মানুষই তা জানেন। এমনকি তাঁর এই নির্লজ্জ ভাবও এখন আর কাউকে অবাক করে না। তাঁর কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আমরা আশা করি না।

এখন একটাই প্রশ্ন থেকে যায়—এরপর কী হবে?

জ্ঞানেশ যদি পদ না ছাড়েন, তবে কী হবে?

একটা বিষয় একদম পরিষ্কার। আপনি জ্ঞানেশ কুমারের কাছ থেকে সততা বা মর্যাদাপূর্ণ আচরণ আশা করতে পারেন না যে তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন। একজন সৎ মানুষ হলে বলতেন, ‘আমি এই বিতর্ক বাড়িয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্ষতি করতে চাই না, তাই আমি সরে দাঁড়াচ্ছি।’

জ্ঞানেশ কুমার হয়তো এ–ও যোগ করতে পারতেন, ‘যদিও আমি ভুল কিছু করিনি, তবু আমার পদে থাকা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করবে।’

সরকার হয়তো জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করত এবং সরকারের হয়ে দীর্ঘদিনের আনুগত্য—যেমন ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও রাম জন্মভূমি ট্রাস্টের কাজে অবদান রাখার পুরস্কার হিসেবে কিছুদিন পর তাঁকে কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে দিত। কিংবা কোনো রাজ্যের রাজ্যপালও বানিয়ে দিতে পারত, যে পদের মান এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর এদিকে জ্ঞানেশের জায়গায় হয়তো অন্য কোনো অনুগত ব্যক্তিকে বসিয়ে দেওয়া হতো।

কিন্তু জ্ঞানেশ যে নিজে থেকে যাবেন, তা মনে হচ্ছে না। আর সরকারও তাঁকে চড়থাপ্পড় মেরে বা টেনেহিঁচড়ে অফিস থেকে বের করে দিতে তৈরি নয়। এই কাজ সমাধান করতে হলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করতে হবে। কারণ, তিনি নিজ থেকে লাফ দেবেন না।

সরকার তাকে সরাতে দ্বিধা করবে। এর কারণ কিন্তু জ্ঞানেশের প্রতি তাদের অতি ভালোবাসা বা নির্দয়তার অভাব নয়; বরং এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, তাঁর পদত্যাগে প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাবমূর্তির ওপর কী প্রভাব পড়বে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার

মোদি এবং ইউপিএ সরকারের থেকে নেওয়া শিক্ষা

বিজেপির মনে আছে, বিতর্ক যত বেড়েছিল, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার সংবাদমাধ্যমের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তত পদচ্যুত করতে শুরু করেছিল। এর ফলে মনমোহন সিংকে একজন দুর্বল নেতা বলে মনে করা হচ্ছিল, যিনি চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছিলেন। আর একেকজন মন্ত্রীর বরখাস্তের ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী দলকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছিল।

নরেন্দ্র মোদি চান না, তাঁর সরকারের সঙ্গে এমনটি ঘটুক। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি সংবাদমাধ্যমকে চরম অবহেলা ও উপহাসের চোখে দেখেছেন এবং কখনোই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি।

এ কারণেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করতে মোদির এত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। ককরোচ পার্টির নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে তরুণদের টানা আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

নরেন্দ্র মোদি তখনই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যখন যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং তিনি তরুণদের সমর্থন হারানোর ভয় পেয়েছিলেন। (অবশ্য এখন আর মোদির সেই চিন্তা নেই। কারণ খবর বলছে, জ্ঞানেশ কুমার তরুণ ভোটারদের নাম কেটে দিতেই বেশি ব্যস্ত!)

তাই সরকার যদি শেষ পর্যন্ত জ্ঞানেশকে সরায়ও, তবে তা হবে কেবল তখনই, যখন মোদির সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না।

সরকারের হিসাব-নিকাশ

তাহলে জ্ঞানেশ থেকে গেলে কী হবে?

নির্বাচনী ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো কিন্তু এত সহজে মিটে যাবে না। মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কারও নিয়ন্ত্রণে নেই। আর সরকার এখন বুঝতে পারছে যে টিভি চ্যানেলগুলোর ভেড়ার মতো সমর্থন কিংবা ‘বিশেষ সূত্রের’ বরাতে ছড়ানো বানানো গল্প দিয়ে জনগণের মতামতকে আর খুব বেশি প্রভাবিত করা যাচ্ছে না।

যন্তর মন্তরের জেন–জি বিক্ষোভের সময় এই কৌশল কাজে দেয়নি, আর নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে একের পর এক হাটে হাঁড়ি ভাঙার পর যে গণক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা থমকাতেও এই কৌশল কোনো সাহায্য করতে পারছে না।

সরকার আশা করছে, জ্ঞানেশকে সরানোর দাবিতে সোচ্চার হওয়া মানুষকে ক্লান্ত করে ফেলা যাবে। তাদের হিসাব হলো, এক সপ্তাহের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের কাছে নতুন করে দেওয়ার মতো আর কোনো তথ্য থাকবে না। তত দিনে সরকার অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সামলে নেবে এবং তাদের উল্টাপাল্টা কিছু বলা থেকে বিরত রাখবে। এরপর এই ইস্যু নিয়ে জনগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে আর সরকার সুযোগ বুঝে তাদের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেবে।

এমনকি বিরোধী দল যদি জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে আবারও অভিশংসন বা অপসারণের প্রস্তাব আনে, সরকার ধরে নিচ্ছে যে লোকসভা ও রাজ্যসভার স্পিকার/ চেয়ারম্যানরা আগেরবারের মতোই তা বাতিল করে দেবেন।

আর এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়ে খুব একটা হস্তক্ষেপ করেননি। তাই সরকার হয়তো আদালতের এই উদাসীনতার ওপর ভরসা রাখতে পারছে।

এই কৌশল সফলও হতে পারে। কারণ, অতীতে এ ধরনের কৌশল সত্যিই কাজ করেছে।

দিল্লির এসআইআর হিসাব বদলে দিতে পারে

তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে জনমতের ওপর। এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দিল্লির এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের ক্ষোভ।

দিল্লির প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ ভোটারের মধ্যে এসআইআরের প্রাথমিক ধাপেই প্রায় ৪৭ লাখ নাম কেটে দেওয়া হয়েছে! আর খসড়া তালিকায় থেকে যাওয়া প্রায় ৯৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষকে তথ্যের অসংগতির অজুহাতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

যে মানুষগুলো বছরের পর বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, এখন তাঁদের কাছে নিজেদের ভোটাধিকারের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে!

কেবল কোনো জালিয়াত, বোকা কিংবা জ্ঞানেশ কুমারই বিশ্বাস করতে পারেন যে এত বড় পরিসরে ভোটার নাম বাদ দিলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গণবিক্ষোভ হবে না।

আমার ধারণা, সরকারের কেউ না কেউ জ্ঞানেশকে এই ঝামেলা দ্রুত মেটাতে বলবেন। সেটা হয়ে গেলে সরকার আশা করবে যে সিইসির ওপর জনগণের রাগ কমে আসবে এবং প্রতিবাদ বা বিক্ষোভের ধার কমে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর তথা ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বাদ দেওয়া হয় বিপুল ভোটারকে

বিতর্ক কি চেপে রাখা সম্ভব?

সমস্যার একটা বড় অংশ খোদ জ্ঞানেশ কুমার নিজেই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়তো খুব ভালো মানুষ হতে পারেন, কিন্তু জনসমক্ষে তিনি চরম অহংকারী, সংবেদনহীন এবং অপ্রিয় এক চরিত্র। তাঁর ভাবমূর্তি এতটাই খারাপ যে তিনি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করছেন—এমন খবর শুনলে কেউ তা বিশ্বাস করতে দ্বিধা করে না।

তা ছাড়া এই বিক্ষোভ ও জ্ঞানেশের প্রতি সরকারের সমর্থনের পেছনে যে অলিখিত উদ্দেশ্যটি কাজ করছে তা হলো, আসন্ন উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এই নির্বাচন হওয়ার কথা এবং জ্ঞানেশ বলেছেন, নির্ধারিত সময়েই ভোট হবে।

সরকার বিশ্বাস করে, উত্তর প্রদেশে বড় ব্যবধানে জিততে পারলে তাদের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা মুছে ফেলা সম্ভব হবে। আর সেই কৌশলের মূল চাবিকাঠি হতে পারেন জ্ঞানেশ কুমার।

কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশনের নিয়ত নিয়ে এতটাই সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে বিজেপি যদি উত্তর প্রদেশে জিতেও যায়, তবে সেই জয়কে মানুষ কতটা বৈধ বলে মেনে নেবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।

আমার মনে হয় না, সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে যে তারা কী করবে। তারা সম্ভবত পরিস্থিতি দেখে বোঝার চেষ্টা করবে যে মানুষের ক্ষোভ কত দিন স্থায়ী হয়। যদি জ্ঞানেশবিরোধী হাওয়া আরও তীব্র হয়, তবে তাঁকে সরাতে বাধ্য হতে পারে সরকার।

তবে তারা যদি এই ঝড় সামলেও নেয়, তবু একটা অনুভূতি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন—এই সরকারের ভালো দিনগুলো বোধ হয় শেষ হয়ে এসেছে। কারণ, যখন কোনো কিছু ভুল হতে শুরু করে, তখন সংকট আসতেই থাকে।

  • বীর সংঘভি ভারতীয় সাংবাদিক ও টক শো সঞ্চালক

    দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।