হাসান ফেরদৌসের কলাম

সমস্যা ধর্মে নয়, ধর্মের নামে রাজনীতিতে

তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরে তখন ক্ষমতার কেন্দ্রে ফারাও রামসিস। তিনি রাজাধিরাজ, ধরাধামে থিবির দেবতা আমুনের প্রতিনিধি। অথচ প্রকৃত ক্ষমতা সে সময়ের ধর্মগুরু হেরিহরের হাতে। ফারাও তাঁর সব কাজের জন্য অনুমোদন প্রার্থনা করতেন দেবতা আমুনের কাছে। যুদ্ধে যাবেন, নতুন কর আরোপ করবেন অথবা নতুন পিরামিডের পত্তন করবেন। ‘মাননীয় আমুন কি আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত’—প্রশ্ন করে জেনে নিতেন রামসিস। আমুন তো কথা বলেন না, তাঁর হয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বা না জানাতেন হেরিহর।

ধর্মকে আশ্রয় করে ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আরও সোজাসাপ্টা ভাষায় বললে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করা কোনো নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসের বহু পর্বেই ক্ষমতা ও ধর্ম পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থেকেছে। প্রাচীন মিসরের উদাহরণই যথেষ্ট। সেখানে রাজা ছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র, কিন্তু সেই ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হতো ধর্মীয় অনুমোদনের মাধ্যমে। আর এই ধর্মীয় বৈধতার নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোহিতমণ্ডলীর হাতে।

গত শতকের মধ্যভাগের পাকিস্তানে আসি। ১৯৪৮ সালের কথা। মাওলানা মওদুদির নেতৃত্বে সে সময় আহমেদিয়াবিরোধী দাঙ্গায় দেশ ক্ষত বিভক্ত। ধর্মের নামে দাঙ্গা বাধালেও মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা।

মওদুদি ও তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় অনেকটা পরিস্থিতির চাপে পড়ে লিয়াকত আলী খান ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ‘অবজেকটিভ রেজুলেশন’ নামে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে শাসনতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যত উলেমা বা ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করা হয়। পাকিস্তানের বহু বুদ্ধিজীবীর মতে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন ঘুচে যায়। পাকিস্তানি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ আয়েশা জালালও উল্লেখ করেছেন যে, এই অবজেকটিভ রেজুলেশনের ফলেই পাকিস্তানে ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা তৈরি হয়।

আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যাক আজকের যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই মুহূর্তে নতুন যে ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আইডিওলজি সেখানে আসন গেড়ে বসেছে, তার বৈধতা আসছে জুডেও-খ্রিষ্টান ধর্মচেতনা থেকে। রাজনীতিক ও ধর্মগুরু একে অপরের হাতে হাত রেখে সে চেতনা প্রতিষ্ঠায় এক ‘ধর্মযুদ্ধ’ শুরু করেছেন। তাঁরা দেশের স্কুল-কলেজ ও পাঠাগার থেকে খুঁজে খুঁজে এমন সব বই টেনে বের করে জ্বালিয়ে দিচ্ছেন, যা তাঁদের বিবেচনায় খ্রিষ্টীয় চেতনার পরিপন্থী। ধর্মীয় শুদ্ধতার নামে শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক ও সংগীতশিল্পীদের ওপর হামলা হচ্ছে। অশুদ্ধ বিবেচিত এমন ধর্মপ্রতিষ্ঠানেও হামলা অভাবিত ঘটনা নয়।

এসবের মানে কী? প্রাচীন মিসর থেকে শুরু করে গত শতকের পাকিস্তান কিংবা আজকের যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ধর্মকে এমন এক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার দখলকে বৈধ বা ঈশ্বরসম্মত বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এর পরিণতি প্রায় সর্বত্রই একই রকম। যখনই ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উপকরণে রূপান্তর করা হয়েছে, তখনই মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে, সমাজে ভীতি ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বস্তুত ধর্ম কোথাও কখনো মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নেয় না, তাদের ওপর বৈষম্য আরোপ করে না। এটি হলো তাদের কাজ, যারা ধর্মকে নিজের রাজনৈতিক ও জাগতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জনে ব্যবহার করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ—জেমস ম্যাডিসন ও টমাস জেফারসন—বারবার ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যের সীমারেখা মুছে যাওয়ার বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল ধর্মকে ঘিরে নয়; বরং রাজনীতির হাতে ধর্ম বন্দী হয়ে পড়া নিয়ে। তাঁরা জানতেন, রাষ্ট্র যখন ধর্মকে নিজের হাতিয়ার বানায়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাস কলুষিত হয়। দুই শতাব্দী পেরিয়েও সেই সতর্কবাণী প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি।

একাধিক ইসলামি পণ্ডিতও সে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুদানের খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিত আবদুল্লাহ আহমদ আন-নাইম। তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহারের বিপজ্জনক দিকের কথা তুলে ধরেছেন এবং যেকোনো ধর্মের ক্ষেত্রেই তা সত্য। সমস্যা ধর্মে নয়, সমস্যা বাধে যখন সেই ধর্মের একমাত্র প্রবক্তার দাবি নিয়ে কেউ মাঠে নেমে পড়েন।

আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ধর্মের ব্যবহার তীব্রতর হয়ে উঠছে। একাধিক দল রয়েছে, যাদের নামের সঙ্গে ধর্মের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে কারও কোনো সন্দেহ না থাকে তারা আসলে কে। ধর্মকে আশ্রয় করে যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে সবার আগে কঠোর অভিঘাত নেমে আসে সংখ্যালঘুদের ওপর। পাকিস্তানের আহমদিয়াদের অবস্থা মনে করুন। অথবা যখন-তখন শিয়া মসজিদে বোমাবাজির কথাও ভাবতে পারেন। বাংলাদেশে ফেসবুকে কে কোথায় কী লিখেছে, অথবা কী মন্তব্য করেছে, সত্য-মিথ্যা বিচার ছাড়াই সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা তো আকসার হচ্ছে।

আরেকটি বড় আশঙ্কা নারীদের ঘিরে। ধর্মকে আশ্রয় করে রাজনীতি করা গোষ্ঠীগুলো জনসমক্ষে নারীর উপস্থিতিকে ভালো চোখে দেখে না। সেই ভীতি থেকেই কেবল ফতোয়া নয়, আইন করেও নারীদের গৃহবন্দী করে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। তালেবান শাসনের অধীন আফগানিস্তানের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সেখানে বারো বছর বয়স পেরোনোর পর মেয়েদের জন্য স্কুলের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কর্মক্ষেত্রেও তাদের তেমন একটা প্রবেশাধিকার নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশেও একটা দল নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করার কথা বলেছে। বলা বাহুল্য, এটাও নারীকে শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দী করার এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

পৃথিবীর কোনো ধর্মই নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখার নির্দেশ দেয় না কিংবা ঘরে থাকার বিনিময়ে সুবিধার কথা বলে না। ইন্দোনেশিয়া থেকে তিউনিসিয়া পর্যন্ত এবং তুরস্ক থেকে জর্ডান পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিমপ্রধান দেশেই নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে নারী ও পুরুষ পড়াশোনা, অফিস-আদালতসহ একসঙ্গে করছে।

লক্ষ করুন, আজকের বাংলাদেশে যখন নির্বাচনের প্রচারণা চলছে, তখন কিছু গোষ্ঠী প্রকাশ্যেই বলছে যে তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে আল্লাহর শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া। আগেও আমরা দেখেছি, রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারালেই প্রতিপক্ষকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধর্মের নামেই সংগীতশিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মাজারে হামলা হচ্ছে। নাট্যচর্চা হুমকির মুখে পড়ছে। পাঠ্যপুস্তকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন আনা হচ্ছে। হাজার বছর ধরেই এই প্রবণতা আমরা দেখে আসছি। মত ও পথের অমিল হলেই ধর্মের আবরণ চাপিয়ে দমনমূলক আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একাত্তরের গণহত্যাও কি ধর্মের লেবাস চড়িয়েই চালানো হয়নি?

প্রশ্ন হলো, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে। উত্তরটি আসলে খুবই সরল। আমরা যদি না চাই, তাহলে ধর্মকে সামনে রেখে যারা রাজনীতি করতে ও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাদের পক্ষে আমাদের চাবুক দেখিয়ে শাসন করা সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন নারী ও পুরুষের সম্মিলিত ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও বিরোধিতা।

প্রতিবাদ যে কার্যকর হতে পারে, তার উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। গত বছর জয়পুরহাটে ধর্মীয় যুক্তি দেখিয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলা বাতিল করা হয়েছিল এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছিল। কিন্তু তীব্র সামাজিক প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই খেলা অনুষ্ঠিত হয়, আর যারা আপত্তি তুলেছিল, তারা ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। একইভাবে নারায়ণগঞ্জে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে লালন মেলা বসেছে। এসব ঘটনা দেখায়, সম্মিলিত ও দৃঢ় প্রতিবাদ কেবল প্রতিরোধই গড়ে তোলে না, বরং সমাজকে তার বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক শক্তির কথাও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

একটি কথা আমাদের মনে রাখা দরকার। ধর্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমরা পেশাদার ধর্মীয় ব্যক্তিদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিই, তাঁরাই ঠিক-বেঠিকের ফয়সালা করেন। এই কর্তৃত্ব আমরাই দিয়েছি। চাইলে আমরাই তা ফিরিয়েও নিতে পারি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আছে। নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের সমর্থনে একদল ধর্মীয় নেতা সঠিক-ভুল নামে ‘মোরাল মেজরিটি’ আন্দোলন গড়ে তোলেন, যার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনৈতিক প্রমাণ করা। সে সময় ক্লিনটন বলেছিলেন, ধর্মের নামে একতরফাভাবে ‘ফতোয়া’ দেওয়ার অধিকার একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া বোকামি। আমাদের মধ্যেও এমন লোক চাই, যিনি ধর্মের বিষয়ে যোগ্যতার সঙ্গে কথা বলবেন, অন্যায্য কথার প্রতিবাদ করবেন।

এই মুহূর্তে এক জটিল সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ। এটিকে যদি ধর্মের রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হয়, তাহলে সমস্বরে প্রতিবাদ জানাতেই হবে। আমরা দেখেছি, রাজনীতিবিদেরা ডান-বাম কি মাঝখানের সবাই নিজের ক্ষমতা দখলের বৈধতার জন্য ধর্মের ঘাড়ে ভর করে। এটা মোকাবিলার একটাই পথ, উচ্চ স্বরে এমন প্রতিবাদ করা, যাতে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারকারী এই গোষ্ঠীর কথা যেন চাপা পড়ে যায়।

  • হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব