
গত দুই দিনে রাজধানীর বুকেই আমরা প্রায় একই কিসিমের কয়েকটি ঘটনার সাক্ষী হলাম। গত শুক্রবার মধ্যরাতে মিরপুর ১-এর ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত দুই শতাধিক মুখোশধারী সেখানে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মালামাল লুট করে এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরো স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। অথচ সেখানে সরকারি উদ্যোগে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। (প্রথম আলো, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
এর পরদিন, শনিবার গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের সাতমসজিদ হাউজিং–সংলগ্ন এলাকায় শতাধিক লোক নিয়ে হামলা-ভাঙচুর ও জমি দখলের অভিযোগ ওঠে। (মানবজমিন, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
একই দিনে রাজধানীর গুলিস্তানের জিপিও মোড়ে অবস্থিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে সভা চলাকালে যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন দলবল নিয়ে তা ঘেরাও করেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ সেখান থেকে জাসদের প্রায় ৩০০ নেতা–কর্মীকে আটক করে। পুলিশ জানায়, কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার কারণেই নাকি তাদের আটক করা হয়েছে।
একই রাতে ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। সালমান এক ভিডিও বার্তায় সেই ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে বলেন, ‘আমাদের স্টুডিও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া ভাঙচুর ও দখলবাজির এই চার ঘটনার মধ্যে একটি স্পষ্ট ও সাধারণ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংঘবদ্ধ লোকজন এসে কোথাও হামলা চালাচ্ছে, ভাঙচুর করছে, ভবন ঘেরাও করছে কিংবা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে জমি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এখন পর্যন্ত চারটির প্রতিটি ঘটনার পেছনেই ক্ষমতাসীনদের সংশ্লিষ্টতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মিরপুরের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দখলের পেছনে বিএনপির দুই পক্ষের অন্তর্দ্বন্দ্বে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদের সমর্থকদের জড়িত থাকার তথ্য এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে। মোহাম্মদপুরের ঘটনার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; মানবজমিনের প্রতিবেদনে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত ছাত্রদল, যুবদল ও মূল দলের নেতা–কর্মীরা ছিল। আমরা অনেককেই চিনি, কিন্তু ভয়ে নাম বলতে পারছি না।’ (মানবজমিন, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
যেখানে পুলিশের সামনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সেখানে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বললে এই ঘটনাগুলো বোঝা যাবে না। এ চার ঘটনা আসলে আরেকটা প্রবণতাও স্পষ্ট করে তুলছে—দখলবাজির প্রবণতা।
একইভাবে জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় যুবদলের নেতা–কর্মীদের উপস্থিতি ভিডিওতেই সুস্পষ্ট—এমনকি যুবদলের এক নেতাকে জাসদের কার্যালয়ে ঢুকে স্লোগান দিতেও দেখা গেছে। অন্যদিকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাতেও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের যুক্ত থাকার বিষয়টিই সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা ছিল বেশ আগ্রহোদ্দীপক। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ঘটনা দুটি খোদ পুলিশের চোখের সামনেই ঘটেছে, কিন্তু তারা ছিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় দর্শক মাত্র। অন্যদিকে জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় সেই পুলিশকেই দেখা গেল অত্যন্ত ‘সক্রিয়’ রূপে। যুবদলের নেতা–কর্মীদের কথামতো পুলিশ গিয়ে উল্টো জাসদের নেতা–কর্মীদেরই আটক করে নিয়ে গেল।
অর্থাৎ পুলিশের সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তা দুটিই যাচ্ছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে। যেখানে সরকারি দলের লোকেরা হামলা-ভাঙচুরে লিপ্ত, সেখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকে তাদের সুযোগ করে দিয়েছে; আর যেখানে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ চিহ্নিত করার মতো রাজনৈতিক উপাদান পাওয়া গেছে, সেখানে ‘দারুণ’ সক্রিয়তায় কয়েক শ লোক আটক করে গেছে। উল্লেখ্য, সালমানের ঘটনায় পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এ চার ঘটনাকে আমরা কীভাবে দেখব? সুনির্দিষ্টভাবে এটা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিরই প্রমাণ। একের পর এক নির্মম হত্যাকাণ্ডসহ কয়েক মাস যাবৎ আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিসর থেকে জানানো হচ্ছে।
পরিসংখ্যানেও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বৃদ্ধিরই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। (প্রথম আলো ১৯ আগস্ট ২০২৬) কিন্তু যেখানে পুলিশের সামনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সেখানে কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বললে এই ঘটনাগুলো বোঝা যাবে না। এ চার ঘটনা আসলে আরেকটা প্রবণতাও স্পষ্ট করে তুলছে—দখলবাজির প্রবণতা।
কেউ হয়তো যুক্তি দিতে পারেন, এই ঘটনাগুলোয় সরকারের কোনো সায় নেই; বরং বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এমন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটনা ঘটছে। কিন্তু মাত্র ছয় মাস আগে বিপুল সাংগঠনিক শক্তিতে বিশাল ব্যবধানে নির্বাচনে জিতে আসার পরপরই দলীয় শৃঙ্খলা এভাবে ভেঙে পড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না।
উপরন্তু মিরপুরের ঘটনায় খোদ সংসদ সদস্যের সমর্থকদের সম্পৃক্ততা এবং জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় যুবদল নেতার সরাসরি উপস্থিতি প্রমাণ করে, এটি কোনোভাবেই দলীয় শৃঙ্খলা শিথিল হওয়ার ফল নয়।
আবার কেউ কেউ দাবি করতে পারেন, মাত্র ছয় মাসের মাথায় সরকারকে কোণঠাসা ও দুর্বল করতেই ‘কোনো গোষ্ঠী’ এসব ঘটাচ্ছে। যেমন ইতিমধ্যেই বিএনপির এক সংসদ সদস্য এই ঘটনার পেছনে ‘জামায়াত বা আওয়ামী লীগের কোনো পরোক্ষ ইন্ধন’ আছে কি না, তা তদন্ত করার কথা বলেছেন। তবে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’ কিংবা ‘সরকার এমনটা চায় না’ টাইপের দায়সারা প্রতিক্রিয়া ছাড়া রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সামগ্রিক ভূমিকা আদতে এসব ঘটনাকে সুপরিকল্পিত ‘দখলবাজি’র অংশ হিসেবেই চিহ্নিত করতে উৎসাহিত করে।
যেমন ধরা যাক, এ চার ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের সার্বিক প্রতিক্রিয়ার কথা। মিরপুরের ঘটনাটি একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হওয়ায় সরকারের তরফ থেকে কিছুটা ‘কঠোর’ বক্তব্য দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনজনই আবার শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান ব্যক্তি, যাঁরা মূলত অর্থের বিনিময়ে এই ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিলেন।
জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় যেহেতু ‘আওয়ামী দোসর’দের উপস্থিতি দেখানো গেছে, সেখানে সরকারের তরফ থেকে কোনো অসন্তোষের বদলে বরং একধরনের রাজনৈতিক উৎসাহই প্রকট হয়ে উঠেছে। এভাবে বেআইনিভাবে কার্যালয় ঘেরাও কিংবা পুলিশের ঢালাও আটক যে কতটা অন্যায্য, সেই আলাপই তো ওঠেনি।
মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে ঘটনার সময় পুলিশ আসেনি, ফোন করলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। আর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় পাওয়া গেছে কেবল তিনজনকে গ্রেপ্তারের সংবাদ।
দেখা যাচ্ছে, মুখে যত ‘কঠোর’ বার্তা বা হুঁশিয়ারিই দেওয়া হোক না কেন, সরকারের তরফ থেকে কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ আমরা দেখছি না। বরং এ চার ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সমাজে এখন ‘দখলবাজি’র এক নতুন ও বিপজ্জনক রূপ সামনে আসছে। জায়গাজমির বিরোধ কিংবা চাঁদাবাজি—কারণ যা-ই হোক না কেন, চাইলেই এক-দুই শ লোক একসঙ্গে জড়ো করে ভাঙচুর, লুটপাট চালানো যাচ্ছে, এমনকি কোনো স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে দখলও করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।
এটি কেবল তখনই সম্ভব, যখন এ ধরনের সংগঠিত রাজনৈতিক ‘মব’ শতভাগ নিশ্চিত থাকে যে তাদের কোনো কঠিন শাস্তি বা বড় ধরনের আইনি ঝামেলার মুখোমুখি হতে হবে না। স্পষ্টতই মাথার ওপর থাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ‘হাত’-এর সুনির্দিষ্ট আশ্রয়-প্রশ্রয়ই এসব ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।
ফলে এ চার ঘটনাকে স্রেফ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং নতুন মোড়কে বেপরোয়া দখলবাজির এক ভয়ংকর প্রবণতাই এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজ ও রাজনীতিতে এর প্রতিক্রিয়াও ভয়াবহ হতে বাধ্য। নাগরিকের মনে ইতিমধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
এই যে পরিস্থিতিকে নাগরিকেরা ‘নরম্যাল ইন বাংলাদেশ’ বলে মেনে নিতে হচ্ছে বা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে, এটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর দৃশ্য নয়। বিপুল আন্দোলন, সীমাহীন সংগ্রাম আর অগণিত আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রত্যাশা করেছিলাম, সেখানে এ ধরনের মববাজি ও দখলবাজি যদি ‘নরমাল’ হয়ে ওঠে, তবে খোদ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক সমীকরণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য উল্টো সুযোগও তৈরি করে দেয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্নকারী আরও কঠোর ও দমনমূলক আইন প্রণয়নের অজুহাত তৈরি করা হয়। অতীতেও আমরা দেখেছি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘কঠোরতা’র নামে এমন অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সুগম করেছে।
সামাজিকভাবে এমন পরিস্থিতি নাগরিকদের মনে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে, যার প্রকাশ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মিরপুরের রাড্ডা কেন্দ্রে হামের টিকা পাওয়ার কথা ছিল শিশুদের। অথচ কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরদিন সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে শিশুদের টিকা দিতে বাধ্য হন স্বাস্থ্যকর্মীরা। তিন মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে আসা এক মা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, ‘ভালো লাগছে না। বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বাচ্চার কষ্ট হচ্ছে। গরম লাগছে, কান্নাকাটি করছে।’
অন্যদিকে নিজের লন্ডভন্ড স্টুডিওর সামনে দাঁড়িয়ে সালমান মুক্তাদিরকে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে বলতে শোনা যায়, ‘...এই ভিডিওটা খুবই স্পেশালি বানানো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জন্য। আপনি প্লিজ কোনো টেনশন নিবেন না, দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ। দ্যাটস হোয়াই আই অ্যাম স্মাইলিং।’
এই যে পরিস্থিতিকে নাগরিকেরা ‘নরম্যাল ইন বাংলাদেশ’ বলে মেনে নিতে হচ্ছে বা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে, এটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর দৃশ্য নয়। বিপুল আন্দোলন, সীমাহীন সংগ্রাম আর অগণিত আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রত্যাশা করেছিলাম, সেখানে এ ধরনের মববাজি ও দখলবাজি যদি ‘নরমাল’ হয়ে ওঠে, তবে খোদ রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। সরকারের ক্ষমতায় আসার ছয় মাস হয়েছে, এখন তাদেরই প্রমাণ দিতে হবে, এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হিসেবে আমরা দেখব, নাকি এটাকেই ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিতে হবে।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব