মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

মতামত

সৌদি যুবরাজকে আবারও কেন হতাশ করলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আরও একবার ভরসা করেছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান—যে ট্রাম্প সৌদি আরবকে সুরক্ষা দেবেন। তবে ফলাফল সেই আগের মতোই, ট্রাম্প তাঁকে আবারও হতাশ করেছেন।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিরা অগ্রগতি নিশ্চিত করলে মোহাম্মদ বিন সালমান দুবার ফোন করে ট্রাম্পকে মার্কিন সামরিক হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন; বদলে তিনি কেবল গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

মোহাম্মদ বিন সালমান কেন ভেবেছিলেন ট্রাম্প এবার তাঁর কথায় রাজি হবেন, তা এক রহস্য। কারণ, এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর আগেও হয়েছে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলার পর—যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করেছিল—তেহরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি তখন স্পষ্টভাবেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে সৌদি আরবকে রক্ষা করার কোনো প্রতিশ্রুতি তিনি কখনো দেননি।

হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাত বছর পরও রিয়াদ এবং পুরো উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একই ভুল ধারণা কাজ করছে। তাদের ধারণা, যখনই নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। কিন্তু বাস্তব হলো, তারা তা করবে না।

এই ধারণা কেবল ভুলই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি এখন মৃত। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে আগের মতো নাটক চালানো এখন অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছে যে এই ব্যবস্থা আর নির্ভরযোগ্য বা কার্যকর কোনোটিই নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তার জায়গায় বরং অনিরাপত্তার বড় উৎস হয়ে উঠেছে। এসব ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল যেন ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো জিসিসির কয়েকটি দেশের আপত্তি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধ উসকে দেয়—আর সেই যুদ্ধের ভেতর মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানকে আক্রমণ থেকে ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

বরং এই ঘাঁটিগুলো উল্টো ইরানের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সিআইএর সাবেক পরিচালক ডেভিড পেট্রেয়াস স্বীকার করেছেন যে ইরানের ভয়াবহ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই ঘাঁটিগুলো এখন আর কোনো কাজের নয়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে নিজের ঘাঁটিগুলোকেই রক্ষা করতে ব্যর্থ, সেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তারা সুরক্ষা দেবে কীভাবে?

অস্ত্র হাতে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা

নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সময়

মার্কিন নিরাপত্তা চাদর কিছু বছরের জন্য হয়তো সুরক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু ইরানকে বাদ দিয়ে ও কোণঠাসা করে রাখার যে ব্যবস্থার ওপর ভর করে তা তৈরি হয়েছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত আজকের এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পথ তৈরি করে দিয়েছে। জোটভিত্তিক এই আঞ্চলিক রাজনীতি কোনো সুরক্ষাবর্ম হতে পারেনি, বরং ওয়াশিংটনের সহযোগী দেশগুলোর অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠেছে।

তবে প্রতিটি সংকটই নতুন সুযোগের জন্ম দেয়। পুরোনো ব্যবস্থার পতন একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে—এমন এক ব্যবস্থা, যা হবে সর্বজনীন ও যৌথ নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এখানে কোনো পক্ষভিত্তিক জোট থাকবে না এবং বাহ্যিক কোনো শক্তির হাতে এর চাবিকাঠি না থেকে দায়িত্ব থাকবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হাতেই।

এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধেক দেশকে অন্য অর্ধেকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মার্কিন নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আঞ্চলিক দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব বিরোধ নিজেরাই সমাধানের উপযোগী স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি ধ্বংসাত্মক সংঘাত হিসেবে শেষ হতে পারে, যা কেবল দুর্দশা আর ধ্বংসাবশেষই রেখে যাবে। আবার এটি একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট বা মোড়ও হতে পারে।

ইরানকে চিরতরে এই ব্যবস্থা থেকে বাদ দিয়ে রাখা অসম্ভব। আর ইসরায়েলকে কেবল তখনই এই নতুন ব্যবস্থার অংশ করা যেতে পারে, যখন তারা ফিলিস্তিনে তাদের অবৈধ দখলদারির অবসান ঘটাবে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ওপর চিরকাল নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে না।

তুরস্ক, পাকিস্তান কিংবা ইরাককে আর প্রান্তিক দেশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আর ছোট দেশগুলোও কোনো পরাশক্তির হাত ধরে টিকে থাকবে—এমন ভাবাও ভুল।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর ‘বেটার অর্ডার প্রজেক্ট’-এর মূল ভিত্তি এটিই। মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থ সামরিক প্রতিরোধ, জোট ও বিদেশি হস্তক্ষেপের রাজনীতি বাদ দিয়ে একটি সর্বজনীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

ইয়েমেনে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত উড়োজাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি বিদ্রোহীরা। তাঁদের দাবি, এটি সৌদি আরবের একটি যুদ্ধবিমান। মারিব, ইয়েমেন, ১৬ সেপ্টেম্বর

এই নতুন ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সব দেশ—ইরান, তুরস্ক, ইরাক ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্র—একটি স্থায়ী সংস্থায় অংশ নেবে। যুদ্ধ দূর করা নয়, বরং নিজেদের মধ্যে থাকা অনিবার্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলো নিয়ন্ত্রণ করাই হবে এর কাজ। এটি সংকটকালে যোগাযোগ, সংঘাত নিরসন, মধ্যস্থতা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি পানি, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলোয় একসঙ্গে কাজ করবে।

আঞ্চলিক দেশগুলোই তাদের নিরাপত্তার প্রাথমিক দায়িত্ব নেবে। আর যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের স্থায়ী সামরিক নিশ্চয়তাকারী না হয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহ্যিক অংশীদার হিসেবে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়ে যেতে পারবে।

বড় অনুপ্রেরণা

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কাঠামো উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত থেকে আলাদা করে দেখবে না। ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধান না করে কেবল উপসাগরে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করলে তা অস্থিতিশীলতার নতুন উৎসেরই জন্ম দেবে।

তাই এই মডেলের শর্ত হওয়া উচিত যে ইসরায়েলের জন্য এই নতুন জোটের দরজা সব সময় খোলা থাকবে, তবে তার প্রবেশমূল্য হবে ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন।

এটি হয়তো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নিরর্থক ও অবৈধ দখলদারি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে। ২০০২ সালের ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ (স্বীকৃতির বদলে স্বীকৃতি) কিংবা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বদলে স্বাভাবিকীকরণ)-এর মতো নয়—এই প্রস্তাব ইসরায়েলকে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরেই সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যদি তারা ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগঠনের অধিকার স্বীকার করে নেয়।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এক বড় জয় হবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন জনগণ মধ্যপ্রাচ্যে অনর্থক সম্পদ না ঢেলে মার্কিন সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে সোচ্চার।

যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই সামরিক উপস্থিতি ও ব্যয় বিপুল পরিমাণে কমিয়েও এখানে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গভীরভাবে যুক্ত থাকতে পারে। আর আঞ্চলিক দেশগুলো সামরিক প্রতিযোগিতায় না নেমে যৌথভাবে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরা নিতে পারবে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির বিচারে এসব চিন্তাভাবনা হয়তো অনেকের কাছে একটু ভাবালু বা অবাস্তব মনে হতে পারে। তবে মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর ছাই থেকেই কিন্তু নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার মহৎ সব দর্শনের জন্ম হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল, যা ফ্রান্স ও জার্মানির শত বছরের বৈরিতাকে বদলে একটি যৌথ ইউরোপীয় প্রকল্পের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের চরম মুহূর্তে, যখন ইউরোপ দুই পারমাণবিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিভক্ত ছিল, তখনই শুরু হয়েছিল ‘হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়া’—যা সেই বৈরিতা সামলানোর জন্য নতুন নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিল।

ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ধ্বংসাত্মক আরেকটি অধ্যায় হতে পারে, কিংবা এটি হতে পারে এমন এক মোড়, যা এই অঞ্চলকে একটি টেকসই ও শান্তিময় ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।

তবে এর কোনোটিই আপনা-আপনি হবে না। এটি তখনই সম্ভব, যখন আঞ্চলিক নেতারা কোনো কাল্পনিক মার্কিন ‘ত্রাতা’র কাছে ফোন করার বদলে নিজেদের দেশগুলোকেই নিজেদের ভবিষ্যতের উত্তর হিসেবে দেখতে শুরু করবেন।

  • ত্রিতা পারসি কুইন্সি ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষখ