মতামত

কোটিপতিদের ভিড়ে আলোচিত ‘গরিব’ প্রার্থীরা 

বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করলেও প্রার্থীকে কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। আর জাতীয় সংসদের নির্বাচন করলে তো কথাই নেই। আগে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করতেন। এখন সেটা আরও বেড়েছে। 

অনেক প্রার্থীকে নির্বাচনের জন্য দলীয় তহবিলেও মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিতে হয়। যাঁরা এই টাকার জোগান দিতে পারেন না, তাঁরা দলের ত্যাগী কর্মী হলেও মনোনয়ন পান না। আর যাঁরা পারেন, দলে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থেকেও মনোনয়ন পেয়ে যান। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বড় কয়েকটি দলের মনোনয়ন তালিকা দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।

প্রার্থীদের হলফনামার ভিত্তিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে বের করছে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন। আর শতকোটির মালিক ২৭ প্রার্থী। ১০টি রাজনৈতিক দলের তথ্য তুলে ধরে টিআইবি জানিয়েছে, বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত। দ্বিতীয় অবস্থানে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা; এই হার ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং তৃতীয় জাতীয় পার্টির ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী। 

সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকঋণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। নির্বাচনের আগে এই ঋণ শোধ হলে ব্যাংকগুলো বেঁচে যেত।

এই তথ্য নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। প্রকৃত প্রস্তাবে কোটিপতি ও ঋণখেলাপির  সংখ্যা আরও বেশি হবে। 

টিআইবির অনুসন্ধানে অবাক করা যে তথ্যটি পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো বিদেশি নাগরিকত্ব এবং বিদেশে থাকা চারজন বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করে প্রার্থী হয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে। তবে সংস্থাটি এই ছয়জনের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। তাঁরা নাম–পরিচয় নির্বাচন কমিশনে পাঠালে তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারেন।

এসব তথ্যের বিপরীতে আমরা এমন প্রার্থীও পেয়েছি, যিনি নির্বাচনী ব্যয় মেটাচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষের অনুদানের টাকায়। এটাও একধরনের ক্রাউড ফান্ডিং। তবে নবাগত একটি দলের নেতাদের মতো লোকদেখানো ক্রাউড ফান্ডিং নয়। শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে মাটির ব্যাংকের মাধ্যমে যিনি টাকা সংগ্রহ করছেন, তিনি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এত এত কমিশন করার পরও যে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেটা প্রার্থীদের হলফনামা থেকেই বোঝা যায়। যাঁরা হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন, তাঁরা নির্বাচিত হলে জনগণের চেয়ে নিজের সেবায়ই যে অধিক ব্যস্ত থাকবেন, সে কথা হলফ করে বলা যায়।

এর আগে ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মনীষা। ওই নির্বাচনে মাটির ব্যাংকের টাকায় নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তিনি আলোচনায় আসেন। তাঁর নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি মানুষের নজর কেড়েছিল। মাটির ব্যাংকে সাধারণ মানুষের জমানো টাকায় চলেছিল তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রম।

মনীষা একই প্রক্রিয়ায় মাটির ব্যাংকে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করছেন। প্রচার শুরুর আগেই কয়েক শ ছোট মাটির ব্যাংক তুলে দিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে। অর্থদাতাদের বেশির ভাগই ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইকচালক ও বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।

অনেক শ্রমিক খুশি মনে টাকা দিয়ে মনীষা চক্রবর্তীকে সহযোগিতা করছেন। কারণ শ্রমিক, ভ্যানচালক, রিকশাচালকেরা যখন নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন, মনীষা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের জন্য আন্দোলন করে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি। 

আরও একজন গরিব প্রার্থীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি হলেন ঢাকা-১২ আসনে আমজনতার দলের প্রার্থী তারেক রহমান। তাঁকে ‘আম তারেক’ বলেই সবাই চেনেন। ইসির হলফনামায় দেখা গেছে, তারেক রহমান সবচেয়ে গরিব প্রার্থী। তাঁর নামে গাড়ি, বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট কিছুই নেই। পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করা তারেক ১০ লাখ ৫৯ হাজার ১৪৩ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। আর বার্ষিক আয় সাড়ে ৪ লাখ টাকা।

রাজধানী ঢাকায় নগরবাসীর অধিকারের পক্ষে সব সময় সোচ্চার থেকে পরিচিত পেয়েছেন জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকা-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। জগে করে ওয়াসার নোংরা পানি নিয়ে ওয়াসার এমডিকে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনা আলোচনা তৈরি করেছিল।

অবহেলিত জুরাইনের অলিগলিতে তিনি মানুষের সংকট-সমস্যার পাশে দাঁড়ান সব সময়। শুধু নিজের এলাকার জন্য একজন মানুষ কতটা নিবেদিত হতে পারে, তা মিজানুর রহমানকে না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। 

মিজানুর রহমানও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী খরচ সংগ্রহ করছেন। অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকা সংগ্রহ হয়েছে তাঁর। 

তবে কেবল মনীষা, তারেক বা মিজানুর নয়; এ রকম ছোট ছোট দলের বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জনসাধারণের কাছে তহবিল সংগ্রহ করে নির্বাচনী ব্যয় মেটাচ্ছেন।

টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ২৭ জন শতকোটিপতি। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন বিএনপির। ৯ জন স্বতন্ত্র। যাঁদের সবাই বিএনপির নেতা। প্রার্থীদের ব্যাংক এবং অন্যান্য ঋণ রয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার। বিএনপির ২৮৮ প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। জামায়াতের ২২৪ প্রার্থীর ২২ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। শীর্ষ ঋণগ্রস্ত ১০ প্রার্থীর আটজন বিএনপির। শত বিঘার চেয়ে বেশি জমির মালিক ১০ প্রার্থী। 

প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। তবে তাঁদের করযোগ্য আয় ৬৯৩ কোটি টাকা। তাঁরা ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কর দিয়েছেন। ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের নির্ভরশীল এবং ২৮২ প্রার্থীর তুলনায় তাঁদের স্বামী বা স্ত্রী স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেশি। 

হলফনামায় দেওয়া প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অন্তত তিন প্রার্থী বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। কিন্তু তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।

তাঁরই বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধি হওয়ার কথা, যাঁর দেশের প্রতি শতভাগ আনুগত্য আছে, যিনি জনগণের হয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব বহাল রেখে সেটা সম্ভব নয়। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের প্রতিনিধি হওয়ার জন্য প্রথমে দলের কাছে হলফনামা পেশ করতে হয় যে তিনি অন্য কোনো দেশের নাগরিক নন। অতীতে অনেকে দ্বৈত নাগরিকত্বের কথা গোপন রেখে মন্ত্রী–এমপি হয়েছেন। এবারও তার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে আশা করি। অন্য বিষয়ে শিথিল হলেও এখানে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় সংসদ যাতে ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার না হয়, সে কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, পুলিশ, নারীবিষয়ক কমিশনের কী পরিণতি হয়েছে, তা–ও আমরা জানি। বলতে গেলে সরকার কমিশন গঠন ও সুপারিশ পেশের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমিত রেখেছে।

এত এত কমিশন করার পরও যে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি, সেটা প্রার্থীদের হলফনামা থেকেই বোঝা যায়। যাঁরা হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন, তাঁরা নির্বাচিত হলে জনগণের চেয়ে নিজের সেবায়ই যে অধিক ব্যস্ত থাকবেন, সে কথা হলফ করে বলা যায়।

সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি

*মতামত লেখকের নিজস্ব