প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি বেশি হলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি বেশি হলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে

বিশ্লেষণ

ভূমিধস যেভাবে উপেক্ষিত এক দুর্যোগের নাম

ভূমিধস কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। সঠিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, কার্যকর পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সময়মতো সরিয়ে নেওয়া এবং জনসচেতনতা—এই পদক্ষেপগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অধিকাংশ প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ভূমিধস প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে লিখেছেন মো. আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভূমিধসও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

প্রতিবছর দেশের পার্বত্য অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। যে কারণে প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সম্প্রতি এর পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পেলাম।

আমাদের দেশের অধিকাংশ পাহাড় তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা ও মাটি দিয়ে গঠিত। টানা বা অতিবৃষ্টির সময় বৃষ্টির পানি এসব শিলা ও মাটির স্তরের ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে এগুলো পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে ভারী হয়ে যায় এবং তাদের দৃঢ়তা কমে যায়। একপর্যায়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পাহাড়ের ঢালে থাকা মাটি ও শিলা নিচের দিকে ধসে পড়ে, যা ভূমিধসের সৃষ্টি করে।

তবে সব জায়গায় এমনটি ঘটে না। সাধারণত যেসব স্থানে পাহাড়ের ঢাল উন্মুক্ত থাকে, অর্থাৎ যেখানে পর্যাপ্ত গাছপালা নেই বা পাহাড় কাটার কারণে ঢালের প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে, সেখানে ভূমিধসের আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে শুধু উন্মুক্ত পাহাড়ি ঢাল থাকলেই যে সেটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা যাবে, তা নয়। কারণ, ঝুঁকি নির্ধারিত হয় শুধু ভূমিধসের আশঙ্কা দিয়ে নয়; বরং সেখানে মানুষ, জনবসতি, সড়ক বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার উপস্থিতির ওপরও।

তাই এ ধরনের উন্মুক্ত পাহাড়ি ঢাল অনেক এলাকাতেই থাকলেও সব স্থান সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। যেসব স্থানে পাহাড়ের পাদদেশ বা ঢালের কাছাকাছি রাস্তা, জনবসতি কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে, সেসব এলাকাই ভূমিধসের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে।

২.

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, পাহাড়ি ঢাল কি বিভিন্ন ধরনের প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ করা সম্ভব?

উত্তর হলো, অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব। রিটেইনিং ওয়াল বা গ্যাবিয়ন ওয়াল নির্মাণ, ঢালের কোণ কমিয়ে ধাপে ধাপে পুনর্গঠন, কার্যকর পানিনিষ্কাশনের (ড্রেনেজ) ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রয়োজনে সয়েল নেইলিংয়ের মতো প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং ক্ষয়রোধী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়।

তবে কোনো একটি ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়। ঢালের উচ্চতা, ঢালের কোণ, মাটির ও শিলার বৈশিষ্ট্য, বৃষ্টিপাতের মাত্রা এবং আশপাশের পরিবেশ বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা নির্বাচন করতে হয়।

জাপান, হংকং, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের অনেক পাহাড়ি ও পার্বত্য দেশেই এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকৌশলব্যবস্থা ব্যবহার করে ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।

অবশ্য বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। এর প্রধান কারণ, দেশের পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ ঢালেই বসবাসকারীরা মূলত ভূমিহীন, দরিদ্র বা রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠী। যারা বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবেই পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের পাদদেশে বসতি গড়ে তোলে।

ফলে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে আলাদা প্রকৌশল অবকাঠামো নির্মাণ করা যেমন আর্থিকভাবে ব্যয়সাপেক্ষ, তেমনি বাস্তবায়নের দিক থেকেও এক দুরূহ চ্যালেঞ্জ।

ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের চশমাহিল এলাকায় পাহাড়ধস।

৩.

বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় ভূমিধসে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এ দুর্যোগকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভূমিধস মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সহজ কিন্তু বাস্তবসম্মত কিছু পদক্ষেপ।

ভূমিধসের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই উপায় হলো প্রথমেই বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেখানে নতুন বসতি, ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

আশার কথা হলো, বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা চিহ্নিত করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত ভূপর্যবেক্ষণ তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের সরেজমিন জরিপের সমন্বয়ে এখন নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া সম্ভব—কোন পাহাড়ের কোন ঢাল ভূমিধসের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার মাটির গঠন, পাহাড়ের ঢালের খাড়াই, আশপাশের রাস্তাঘাট, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্যও একত্র করে রাখা সম্ভব। এসব তথ্য একত্র করে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ভূমিধস অ্যাটলাস’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকীতে ভূমিধস নিয়ে ইতিমধ্যে অসংখ্য গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, এসব মূল্যবান গবেষণার ফলাফল শুধু গবেষকদের কাগজপত্রেই বন্দী থেকে যায়। কোথাও কোথাও ঝুঁকি–মানচিত্র তৈরি হলেও তা সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। ফলে যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় প্রশাসন—তারাই থেকে যায় অন্ধকারে।

সরকার চাইলে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মুদ্রিত বই বা প্রচলিত ধাঁচের স্থির মানচিত্রের পরিবর্তে একটি সচল ও নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য ওয়েব পোর্টাল অধিক উপযোগী হবে, যেখানে নতুন উপগ্রহভিত্তিক তথ্য, সর্বশেষ গবেষণার ফলাফল এবং সংঘটিত প্রতিটি ভূমিধসের তথ্য নিয়মিত সংযোজিত হতে থাকবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো—এই পোর্টাল যেন জটিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ভরা কোনো একাডেমিক নথি না হয়। একে হতে হবে সহজ ব্যবহারবান্ধব ও বোধগম্য, যাতে একজন সাধারণ গ্রামবাসী থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সহজেই বুঝতে পারেন তাঁদের এলাকা কতটা ভূমিধস-ঝুঁকিপূর্ণ, সেই ঝুঁকির কারণ কী এবং ঝুঁকি কমাতে করণীয় কী।

৪.

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, ভূমিধসকে ভূমিকম্প বা বন্যার মতো নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তিকাল (রিকারেন্স পিরিয়ড) দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। অর্থাৎ কোন এলাকায় কত বছর পরপর ভূমিধস ঘটবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভূমিধস পূর্বানুমান করা অসম্ভব। প্রবল বৃষ্টির সময় বৃষ্টির তীব্রতা ও স্থায়িত্ব পর্যবেক্ষণ করে নির্ধারিত ‘থ্রেশহোল্ড’ অতিক্রম করলে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়া সম্ভব, যা বহু প্রাণহানি রোধ করতে পারে।

পাশাপাশি যেসব রাস্তাঘাট প্রকৃতপক্ষেই ভূমিধসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেগুলো রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশলব্যবস্থা (ইঞ্জিনিয়ারিং মেজার) গ্রহণ করতে হবে, যাতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে।

একই সঙ্গে অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক গাছপালা ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ এগুলো মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখে ঢালের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পাহাড়ধসের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কে অপেক্ষায় আটকে পড়া যানবাহন। রাঙামাটি সদর উপজেলার ঢেপ্পোছড়ি মুখ এলাকা

এভাবে ব্যয়বহুল বা জটিল প্রযুক্তি ছাড়া শুধু সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই প্রতিটি বর্ষায় ভূমিধসে প্রাণহানি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তবে এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে ভূমিধস নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত গবেষকদেরও এসব প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, মাঠপর্যায়ে কাজের সুযোগ এবং আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে ভূমিধসের কারণ, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে আরও নির্ভুল ও কার্যকর গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং ঝুঁকি হ্রাসে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হবে।

৫.

ভূমিধস কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। সঠিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, কার্যকর পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সময়মতো সরিয়ে নেওয়া ও জনসচেতনতা—এই পদক্ষেপগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অধিকাংশ প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

প্রতিটি বর্ষায় পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষহোন তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা— প্রত্যেকের জীবনই অমূল্য। তাই এই আহ্বান শুধু নীতিনির্ধারকদের প্রতি নয়, সমগ্র সমাজের প্রতি। আগামী বর্ষা আসার আগেই আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আর তার মূল্য দিতে হবে নিরীহ মানুষের প্রাণ দিয়ে।

  • ড. মো. আশরাফুল ইসলাম সহযোগী অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব