
বাংলাদেশের শ্রমশক্তি প্রায় সাড়ে সাত কোটি। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখ, অর্থাৎ মোট কর্মজীবী মানুষের ২ শতাংশের কম। বাকি ৯৮ শতাংশের জন্য কোনো সুসংগত, সমন্বিত এবং আইনি সুরক্ষার কাঠামো এত দিনেও তৈরি হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রত্যক্ষ করদাতাদের বড় অংশই এই বেসরকারি চাকরিজীবী।
দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ৭২ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য বলছে, এই খাতের মাত্র ৪ শতাংশ কর্মী কোনো সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আছেন। সিঙ্গাপুরে এই হার ৯৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৭৬, এমনকি ভিয়েতনামেও ৫২।
মার্সার গ্লোবাল পেনশন সূচক ২০২৫ অনুযায়ী সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস শীর্ষ গ্রেডে আর বাংলাদেশে কোনো কাঠামোই নেই।
এই বৈষম্য কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, এটি নীতির অনুপস্থিতির ফল এবং সরকার পরিচালনাকারী মানুষজনের বেসরকারিদের দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির কাঠামোতে রাখার চেষ্টারই নামান্তর।
দীর্ঘদিন ধরে আমি এই প্রশ্ন সামনে আনার চেষ্টা করেছি। আনন্দের কথা হলো, এবার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কার্যকর পেনশন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি এসেছে এবং সরকার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির কথা ভাবছে।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু শুধু পেনশনের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়, পুরো কর্মজীবনের সুরক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দরকার। এখন দুঃখের কথা হচ্ছে, এবারও এই নীতিমালা আমলাদের মাধ্যমে করার চেষ্টা হচ্ছে, যাঁরা আসলে আমাদের সমস্যা একেবারেই জানেন না, বুঝতেও পারবেন না এবং বোঝার চেষ্টা না করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
এই নীতিমালাতে কী কী থাকা জরুরি?
বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও রাষ্ট্র তাদের দিকে তাকায় না, এটা একধরনের কৃতঘ্নতা। সিঙ্গাপুর, জাপান ও জার্মানি দেখিয়েছে যে শক্তিশালী শ্রম অধিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়। নিয়োগ থেকে অবসর পর্যন্ত পুরো কর্মজীবনের একটি সুরক্ষার ছাতা তৈরি করে, পরিবারকেও সেই ছাতার নিচে রাখলে মানুষ আরও নিশ্চিন্তে এবং আনন্দের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
বেতনকাঠামো ও মুনাফা ভাগাভাগি
সরকারি কর্মচারীরা মূল বেতনের বাইরে বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, উৎসব ভাতা ও বাংলা নববর্ষ ভাতাসহ ৬৪ রকমের সুবিধা পান, অবসরের পরেও চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা চলতে থাকে। তাঁদের ট্যাক্স হয় শুধু মূল বেতনের ওপর।
বেসরকারি কর্মী পান কেবল মূল বেতন আর দুটি উৎসব বোনাস এবং তাঁদের ট্যাক্স হয় সব ভাতার ওপর। এই ব্যবধান অগ্রহণযোগ্য। শিল্প খাতভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করে মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও ভবিষ্য তহবিলের অবদান নিয়োগপত্রে বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের পরিসর উল্লেখ বাধ্যতামূলক করলে দর-কষাকষিতে কর্মীর অসহায়ত্ব কমবে।
শ্রম আইনে কর্মী মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের বিধান আছে, কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ কর্মীদের মধ্যে বিতরণের কথা। কিন্তু এই বিধানের প্রয়োগ নিয়মিত নয়। নতুন নীতিমালায় এই ৫ শতাংশের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বার্ষিক বোনাসের ২৫ শতাংশ সরাসরি পেনশন বা ভবিষ্য তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রাখা উচিত।
আনুতোষিক ও পেনশন
শ্রম আইনে আনুতোষিকের বিধান আছে, প্রতিটি পূর্ণ বছরের জন্য ৩০ দিনের মজুরি, ১০ বছরের বেশি চাকরিতে ৪৫ দিনের মজুরি। তিন বছরের বেশি চাকরিতে মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি মৃত্যুজনিত সুবিধাও পাবেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিধানগুলোর প্রয়োগ হয় না বললেই চলে। ভারতে পাঁচ বছরের বেশি চাকরি করলে আনুতোষিক দেওয়া শতভাগ আইনি বাধ্যবাধকতা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে যা আইনি অধিকার, আমাদের দেশে তা এখনো মালিকের মর্জির ওপর নির্ভরশীল।
পেনশনের বিষয়ে সরকারি কর্মচারী মাসিক পেনশন, আনুতোষিক, ছুটি নগদায়ন এবং মৃত্যুর পরে পারিবারিক পেনশন পান। বেসরকারি খাতে এর কিছুই নেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বার্ধক্যে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশের ওপরে, অথচ অস্ট্রেলিয়ায় বাধ্যতামূলক অবসর তহবিলের কল্যাণে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ।
বর্তমান শ্রম আইনে ভবিষ্য তহবিল ঐচ্ছিক এবং ৩ চতুর্থাংশ কর্মী লিখিতভাবে দাবি করলেই কেবল বাধ্যতামূলক হয়। এই দুর্বলতা দূর করে কর্মী, নিয়োগকর্তা ও রাষ্ট্র ৫,১০ ও ২ শতাংশ হারে যৌথ অবদান রাখার ত্রিপক্ষীয় মডেল চালু করতে হবে। সিঙ্গাপুরের আদলে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ‘পেনশন পাসবুক’ চালু হলে প্রতিষ্ঠান বদলালেও তহবিল কর্মীর সঙ্গে যাবে।
সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম করেছিল। কিন্তু তা স্কিম না হয়ে স্ক্যাম হয়ে যাওয়াতে সরকারি কর্মচারীরাই সেখানে টাকা রাখতে রাজি হয়নি। এটার সব সমস্যা সমাধান করে সবার জন্য সর্বজনীন করতে পারলে সরকারেও খরচ কমবে এবং বেসরকারি খাতেরও নিরাপত্তা বাড়বে।
শ্রম আইনে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান আছে, কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানে না। মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে চাকরি ঝুঁকিতে পড়লে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। পিতৃত্বকালীন ছুটি, শোকছুটির মতো মানবিক বিধানগুলো আইনি অধিকারে পরিণত হোক।
চাকরির নিরাপত্তা ও বেকারত্ব বিমা
শ্রম আইনে ছাঁটাইয়ে এক মাসের নোটিশের বিধান আছে, যা একেবারেই অপ্রতুল। চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী স্তরায়িত নোটিশ মেয়াদ ৫ বছর পর্যন্ত ৩ মাস, ১০ বছর পর্যন্ত ৪ মাস, ২০ বছর পর্যন্ত ৫ মাস এবং ২০ বছরের বেশিতে ৬ মাস নির্ধারণ করা উচিত। কোম্পানি দেউলিয়া হলে শেষ তিন মাসের বেতন ও আনুতোষিক সরকারি তহবিল থেকে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
১০,২০ ও ৩০ বছর পূর্তিতে বাধ্যতামূলক দীর্ঘ সেবা পুরস্কারের বিধান রাখলে একটি প্রতিষ্ঠানে টিকে থাকার প্রণোদনা তৈরি হবে। চাকরি হারানোর পর সুরক্ষাজালের জন্য ‘কর্মসংস্থান সুরক্ষা তহবিল’ গঠন করে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সীমিত বেকারত্ব ভাতা চালু করা সম্ভব, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই মডেল সফলভাবে চলছে।
স্বাস্থ্য, ডে-কেয়ার ও পরিবার
বেসরকারি কর্মীর জন্য অসুস্থতা মানেই আর্থিক সংকট। নির্দিষ্ট আকারের প্রতিষ্ঠানের জন্য দলীয় স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডে-কেয়ার প্রসঙ্গে বলতে হয়, নির্ভরযোগ্য শিশু পরিচর্যার অভাবেই অনেক মেধাবী নারী কর্মজীবন ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৬ শতাংশ আর ফ্রান্সে সরকারি শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থার সুবাদে তা ৮২ শতাংশ। নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি কর্মী থাকলে প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র পরিচালনা করতে হবে অথবা ভাতা দিতে হবে।
শ্রম আইনে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান আছে, কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানে না। মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে চাকরি ঝুঁকিতে পড়লে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। পিতৃত্বকালীন ছুটি, শোকছুটির মতো মানবিক বিধানগুলো আইনি অধিকারে পরিণত হোক।
কর্মঘণ্টা, হোম অফিস ও ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার অধিকার
শিল্প খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিক ন্যূনতম দেড় গুণ রাখার বিধান জরুরি। কোভিড-উত্তর বিশ্বে হোম অফিস এখন আর সুবিধা নয়, আইনি অধিকার হওয়া উচিত, বিশেষত আইটি, ব্যাংকিং ও সেবা খাতে। পাশাপাশি বাংলাদেশে হোয়াটসঅ্যাপ ও ই-মেইলের সংস্কৃতির কারণে কর্মঘণ্টা কার্যত ২৪ ঘণ্টায় পরিণত হয়েছে।
ফ্রান্স ২০১৭ সালেই কর্মঘণ্টার বাইরে বিচ্ছিন্নতার অধিকার আইন পাস করেছে, পর্তুগালে কর্মঘণ্টার পর কর্মীকে বার্তা বা ফোন দিলে নিয়োগকর্তার জরিমানার বিধান আছে। বাংলাদেশের শ্রম আইনেও এই ধারা যোগ হোক। সবার জন্য দুই দিন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। এই জন্য যদি প্রয়োজন হয় বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে শনি-রোববার ছুটি করা যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য, সমবেতন ও গিগ কর্মী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়। ১০০-এর বেশি কর্মীর প্রতিষ্ঠানে বছরে পাঁচ দিন বেতনসহ মানসিক স্বাস্থ্য ছুটি ও একজন পরামর্শদাতার সংযোগ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বাংলাদেশে একই পদে নারী ও পুরুষের বেতনে পার্থক্য ২১ শতাংশ, আইসল্যান্ডের মতো বার্ষিক সমবেতন নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত।
পাঠাও, উবার, ফুডপান্ডা মিলিয়ে ১০ লাখের বেশি গিগ কর্মী শ্রম আইনের বাইরে, তাঁদের জন্য ‘মঞ্চ কর্মী কল্যাণ বোর্ড’ গঠন করে প্রতিটি লেনদেন থেকে কল্যাণ চাঁদা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বাস্তবায়নের প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়
বাংলাদেশে ভালো নীতির অভাব নেই, ভালো বাস্তবায়নের অভাব আছে। একটি ‘জাতীয় বেসরকারি কর্মচারী সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ’ গঠন দরকার, যার কাছে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা থাকবে। কর্মীদের জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে নিয়োগপত্র, তহবিলের অবদান ও অভিযোগ পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে এবং ২৪ ঘণ্টা হটলাইন ও অ্যাপভিত্তিক জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু থাকবে।
শ্রম আদালতকে শক্তিশালী করে ৯২ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করলে ন্যায়বিচার আর ৫-৭ বছরের অপেক্ষার বিষয় থাকবে না। যে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, শিশু পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করবে, তাদের কর রেয়াত দিতে হবে। প্রথমে আইটি, ব্যাংকিং ও তৈরি পোশাক খাতে পাইলট আকারে চালু করে পরে সর্বত্র বিস্তার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও রাষ্ট্র তাদের দিকে তাকায় না, এটা একধরনের কৃতঘ্নতা। সিঙ্গাপুর, জাপান ও জার্মানি দেখিয়েছে যে শক্তিশালী শ্রম অধিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়ায়। নিয়োগ থেকে অবসর পর্যন্ত পুরো কর্মজীবনের একটি সুরক্ষার ছাতা তৈরি করে, পরিবারকেও সেই ছাতার নিচে রাখলে মানুষ আরও নিশ্চিন্তে এবং আনন্দের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
স্বপ্নটা এবার তাই নীতির ভাষায় লেখা হোক।
সুবাইল বিন আলম টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক, contact@subail. com
*মতামত লেখকের নিজস্ব