
সৈকতভাঙন রোধের প্রাকৃতিক শক্তি লুকিয়ে আছে উপকূলের প্রকৃতি ও লোকায়ত সংস্কৃতির শিকড়েই। সমুদ্রসৈকত সুরক্ষায় ডেইল আর দরিয়ার (সমুদ্রের) এই জটিল সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ
নিদারুণভাবে ভেঙে যাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত। কক্সবাজারের ক্যাংপাড়াতে কয়েক শ বছরের প্রাচীন একটি বটগাছ আছে, গাছের তলায় রাখাইনদের গ্রামদেবী রোও-শামার পবিত্রথান। কলেরা-বসন্ত-করোনা মহামারি, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বিতিকিচ্ছি পর্যটনের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছেন টেকপাড়ার প্রবীণ রাখাইন নারী উন খাঁই। সমুদ্রসৈকত ভাঙনকে তিনি মানুষের অপরিণাম লোভের কুফল হিসেবে দেখেন।
জার্নাল অব সি রিসার্চ–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে রশিদ ও অন্যরা (২০২৫) দেখান, কক্সবাজারের ১ হাজার ৮৫ হেক্টর ভূমি ইতিমধ্যে সাগরে বিলীন হয়েছে। চলতি বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে ইনানী পর্যন্ত সরেজমিন পর্যবেক্ষণে সৈকতে ২০টির বেশি ভাঙন এলাকা দেখতে পাই। গর্ত হয়ে বালুচরের ঢাল অসমান হয়ে গেছে, ভাঙন রোধের জন্য দেওয়া জিও ব্যাগ ছিঁড়ে গেছে, ডেইল বা বালিয়াড়িগুলো অরক্ষিত এবং বৃক্ষাচ্ছাদন নেই। নানাজনের সঙ্গে আলাপ করে বোঝা যায়, অপরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থা, দূষণ, সৈকত দখল, পাহাড়কাটা, ডেইল ও গাছের আচ্ছাদন বিনষ্টকরণ এবং এলোপাতাড়ি পর্যটন অবকাঠামোর চাপে বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত আজ বিপন্ন ও রুগ্ন।
সুগন্ধা সৈকত থেকে কলাতলীর সাইমন পর্যন্ত ডেইল বিনষ্ট করে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের হাইওয়ে এবং কংক্রিটের এক আজব ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণ নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠেছে। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত ৬৩ দশমিক ৫০ কোটি বাজেটের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প স্থানীয় লোকায়ত সৈকত ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও মতামতকে গুরুত্ব দেয়নি।
কক্সবাজারের মতো এক জীবন্ত উপকূলের ক্ষেত্রে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এ ধরনের প্রকল্প সৈকতের বাস্তুতন্ত্রসহ সামগ্রিক জনজীবন, পরিবেশ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা ও ক্ষত তৈরি করবে। ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এই নির্মাণ প্রকল্প আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এ ধরনের নির্মাণ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
সমুদ্রসৈকতের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা বুঝতে আমাদের স্থানীয় লোকায়ত ভূবিদ্যা ও জন–ইতিহাসের ময়দানে দাঁড়াতে হবে। ‘মুঢ়া’ বা পাহাড়ের পর পিউক অংশে বন ছিল একসময়। এরপর ‘তাক তাক মাঠ’ বা উঁচু জমি। তারপর ‘পোয়াইনা’ বা নিচু জমি। এসব জমিনে লম্বরু, হেমাতা, বড় ধান, কদমণি, বৈলাম, জটাবেতি, গেতু, লাটুম, আসাইল, বিনি ধান চাষ হতো একসময়। সমুদ্রতীরের বালুময় চরটি হলো সৈকত।
‘পোয়াইনা’ জমি ও সৈকতের তীরে বাতাস ও ঢেউয়ের টানে বালু জমে বুনো ঝোপসহ যে উঁচু প্রাকৃতিক জীবন্ত বর্ম তৈরি হয়, তা–ই বালিয়াড়ি বা ‘ডেইল’। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝিরি বা ছড়াগুলো সাগরে গিয়ে মেশে। উপকূল সৈকতের এই বাস্তুতান্ত্রিক ব্যাকরণ উপক্ষো করেই প্রশ্নহীন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দখল-বাণিজ্য দশাসই হয়েছে। সৈকত সুরক্ষার লোকায়ত জ্ঞানকে মৌলিক ভিত্তি ধরে ডেইলভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির দাবি জানায় চলতি আলাপ।
রাখাইনরা কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলের ভূমিকে সমুদ্র থেকে পাহাড় পর্যন্ত ছয়টি স্তরে ভাগ করেন। ‘ম্রাই’ বা সমুদ্র প্রথম স্তর, দ্বিতীয় স্তর ‘ম্রাই ছ্রে বু’ (বালুচর/ সৈকত), তৃতীয় স্তর পাংলে ‘ছ্রে বুং’ (ডেইল/ বালিয়াড়ি), চতুর্থ স্তর ‘লি প্র’ (পোয়াইন্যা/ নিচু জমি), পঞ্চম স্তর ‘টংত মা’ (উঁচু জমি) এবং ষষ্ঠ স্তরে ‘টং’ (পাহাড়)। এ ছাড়া পাহাড়ের ম্রংগুলো (ছড়া/ ঝিরি) সমুদ্রে গিয়ে মিশে।
রাখাইন লোকজ্ঞান অনুযায়ী, চতুর্থ ও পঞ্চম স্তরই আগে মানুষেরা ব্যবহার করত। নিচু জমিতে চাষাবাদ ও উঁচু জমিতে বসতভিটা। ফলে সমুদ্র, ডেইল ও পাহাড়কে বাদ রেখে কেবল ওই দুই স্তরেই ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘটত। কক্সবাজারের টেকপাড়ার মংক্যমান (৮৮), ক্যাংপাড়ার ম-ই-থে রাখাইন (৮০) এবং পেশকারপাড়ার আচি মং (৮১) আদি স্মৃতি মনে করে জানান, সমুদ্র, ডেইল ও পাহাড় থেকে কেবল মাছ, ভেষজ, বুনো খাদ্য, লাকড়ি বা কাঠ সংগ্রহ করা হতো।
ডেইলগুলো রাখাইনদের কাছে পবিত্র অঞ্চলের মতো। বছরে একবার জাদি (প্যাগোডা) বানিয়ে ডেইলের ওপর ‘সাই-প্রং-ম্রাও-পোয়ে’ উৎসব হতো। সমুদ্র উপকূলের শান্তি ও কল্যাণে এটি সাগরে বুদ্ধের এক বিশেষ পূজাকৃত্য। রাখাইন প্রবীণেরা জানান, ‘...বাইরে থেকে মানুষ এসে সব ডেইল ও পাহাড় তছনছ করে ঝিরিগুলো আটকে দিয়েছে, ডেইলের গাছগুলোও নেই, কোনো জায়গা রেহাই দেয়নি, তাই আজ সৈকত ভাঙছে, সামনে আরও বড় বিপদ।’
# কক্সবাজারের মতো এক জীবন্ত উপকূলের ক্ষেত্রে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প সৈকতের বাস্তুতন্ত্রসহ সামগ্রিক জনজীবন, পরিবেশ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা ও ক্ষত তৈরি করবে। # জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট নয়া ক্ষয়ক্ষতির ধরন আমলে নিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত সুরক্ষায় বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রের জলবায়ু কূটনীতি সোচ্চার করতে হবে।
ডেইলগুলো সাধারণত ২০-৩০ ফুট উঁচু হয়। কুতুবদিয়া ও সেন্ট মার্টিনে ৩০-৩৫ ফুট উঁচু ডেইলও ছিল। হিমছড়ি-ইনানীর প্যাঁচার ডেইল, হ্নীলার ফুলের ডেইল, টেকনাফ-উখিয়ার হাঁসের ডেইল, খুরুশকুলের ডেইলপাড়া, খুনিয়াপালং ডেইল, টেকনাফের লঙ্গুর ডেইল বা মুন্ডার ডেইল, সাবারাং ডেইল, মহেশখালীর ডেইলপাড়া, কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ডেইল, আলী আকবর ডেইল, উখিয়ার রাজপালং ডেইল, কক্সবাজারের ফদনার ডেইল এখনো ‘ডেইলের’ হারানো বিদীর্ণ স্মৃতিনাম নিয়ে টিকে আছে। ডেইলের নিচেই মিঠাপানির আধার।
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করা হয় ১৯৯৯ সালে। ইসিএ এলাকায় ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস আইনত নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও উন্নয়ন, দখল ও দূষণে অধিকাংশ ডেইল আজ বিক্ষত ও বিনষ্ট। ডেইল সুরক্ষা করে সৈকতব্যবস্থার লোকজ্ঞানকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করলে সৈকতভাঙন এমন তীব্রতর হতো না।
বালিয়াড়িগুলো উদ্ভিদ ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল। ২০০৬ সালে কক্সবাজার পানেরছড়া গ্রামে আলাপ হয়েছিল মা এ্যাইছেন ও মং হ্লা চিনের সঙ্গে। জানিয়েছিলেন, গ্রামের নেছেরারা (বৈদ্য) বালিয়াড়ি থেকে নানা রকম ঔষধি গাছ সংগ্রহ করতেন। রাখাইনপাড়াগুলো থেকে বহু ভেষজ বীরুৎ-গুল্মের নাম ও ব্যবহার শিখেছিলাম। ডেইলে বেশি হয় সাগরলতা, রাখাইন ভাষায় বলে লেইংঝিরি। এর পাতা ঠান্ডা-কাশিতে কাজে লাগে। উঁছী (নারকেল), মুথাঘাস, নুনিয়া, কেয়ালতা, নিশিন্দা, নীল নিশিন্দা ও আকন্দের বিস্তার ছিল একসময়। পেংলাং/পেলা-ব (ঝাউ) কক্সবাজার উপকূলের স্থানীয় প্রজাতি নয়।
ডেইলের প্রাইনটামুগাছের (টেকাটুকি) কচি পাতা নাপ্পি শুঁটকি দিয়ে লাকসু বানায় রাখাইনরা, কাণ্ডের রস জন্ডিস প্রতিরোধে কাজে লাগে। চেংওয়ে ম্রাও (আড় আলু) খাওয়া যায়। সাপ্রেমগাছের রস ফোড়া হলে ব্যবহার করে। কামদুয়াহুং, হুনহুনি, পো-মৌ-দে, কামুই আপাং শাক খাওয়া যায়। পেরনুয়া কাটাছেঁড়া, মুহুরং বাতব্যথা, রোও-সাথে ক্ষতপূরণে ব্যবহৃত হয়। ডেইলে আগে শতমূলির ঝোপও ছিল, রাখাইন ভাষায় বলে সাট্টিরোসা। মেয়েদের ঋতুস্রাবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি শুভামের (হরগোজা) মতো ম্যানগ্রোভ গাছও জন্মাত। কেবল লতা-গুল্ম ও বুনো ঝোপ নয়, ডেইলগুলো বিপন্ন জলপাই কচ্ছপ আর লাল কাঁকড়ারও বিচরণভূমি।
কেবল রাখাইন নয়, কক্সবাজারে বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের জীবনেও বালিয়াড়ি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। শুকনা ঝাউয়ের ডাল সংগ্রহরত অবস্থায় আলাপ হয় সমিতিপাড়ার বাঙালি প্রবীণ মোহাম্মদ ছৈয়দুলের সঙ্গে। জানালেন, ‘আগে চরে সাগরলতা, ঝাউসহ অনেক গাছ ছিল। গাছ থাকলে চর ভাঙে না।’
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ধারণকৃত বাংলা সিনেমার গানগুলো সৈকতের বদল এবং ডেইল হারানোর সাক্ষী হয়ে আছে। হ্যাপি আখান্দের গাওয়া কালজয়ী ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ঘুড্ডি সিনেমায়। গানটির দৃশ্যে সমুদ্রসৈকতে ঝাউবন দেখা যায়। এমনকি সুবর্ণা মুস্তাফা যখন সৈকতে গড়িয়ে যান, সেখানে ঘাস ও সাগরলতার আচ্ছাদন দেখা যায়।
১৯৬৯ মুক্তিপ্রাপ্ত ভানুমতি সিনেমার ‘পথ খুঁজে না পাই, আমি পথের দিশা চাই’ গানটির দৃশ্যে নায়িকা সুলতানা জামানকে উঁচু ডেইলের ওপর থেকে গান গেয়ে সৈকতের দিকে নামতে দেখা যায়। ডেইলে গাছের আচ্ছাদন, ঝোপ ও ছোট ঝাউয়ের চারা দেখা যায়। মাসুদ রানা (১৯৭৪) সিনেমায় কক্সবাজার সৈকতে ছবি আঁকতে আঁকতে কবরী যখন ‘মনেরও রঙে রাঙাব’ গানটি করেন, ডেইলের পেছনে ঝাউবন ও দূরে পাহাড় দেখা যায়।
কিন্তু এর পর থেকে নির্দয়ভাবে বদলে যায় কক্সবাজার। কত স্বপ্ন কত আশা (২০১৬) সিনেমার ‘চেয়েছি ছোট্ট নদী পেয়েছি সাগর হলো’ গানে সৈকতে স্থাপনা এবং মাটি সরে শিকড় বের হওয়া খটখটে ঝাউগাছ দেখা যায়, কিন্তু ডেইল নেই। বিদ্রোহী (২০২০) সিনেমার ‘আমি যদি ভুলে যাই’ গানে সৈকতে কোনো কেয়াঝোপ দেখা না গেলেও, একটি উপড়ানো মরা কেয়াগাছের শিকড় সাজিয়ে শুটিং করা হয়েছে।
লোকায়ত জ্ঞানের নজির থাকলেও বালিয়াড়িকে গুরুত্ব দিয়ে কাঠামোগত গবেষণার চল সাম্প্রতিক। ২০১৪ সালে কোস্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় হ্যানলি ও অন্যরা দেখিয়েছেন বালিয়াড়ি উপকূল সৈকত সুরক্ষার এক প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। একই জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত ভ্যান ভিশেন ও অন্যদের গবেষণা দেখায়, ঝড়ের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা বালিয়াড়ির পাদদেশে পৌঁছালে ঢেউ সরাসরি বালিয়াড়ির ঢালে আঘাত করে এবং ব্যাপক বালু অপসারণ, ঢালের ক্ষয় ও ধস সৃষ্টি করে। বালিয়াড়ি এই ক্ষয় ও ধস সামাল দেয়।
গবেষকেরা দেখান, বালুদানার বৈশিষ্ট্য, ঢেউয়ের প্রকৃতি, বালিয়াড়ির বিস্তার ও উদ্ভিদের আচ্ছাদন বালিয়াড়ি ক্ষয়ের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। ১ হাজার ১৭৩টি গবেষণার প্রাথমিক অনুসন্ধান বিশ্লেষণ করে স্মিথ ও অন্যরা (২০২১) এক গবেষণায় স্থানীয় উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধারকে উপকূল সুরক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান হিসেবে দেখান।
উপকূল সুরক্ষায় রাখাইনরা ম্রাই শা-মা (সাগরদেবী) এবং তং-শামার (পাহাড়দেবী) পূজা করেন। সমুদ্রগামী বাঙালি মুসলিম জেলেদের বিশ্বাস, পানির পীর খোয়াজখিজির সমুদ্র রক্ষা করেন। স্থানীয় জনগণের লোকায়ত জ্ঞানজগৎও সৈকত ব্যবস্থাপনার সাংস্কৃতিক শিকড়। সমুদ্রসৈকত সুরক্ষায় ডেইল আর দরিয়ার (সমুদ্রের) এই জটিল সম্পর্কের রসায়ন রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে।
বাংলাদেশ জার্নাল অব ওসানোগ্রাফিতে প্রকাশিত মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান ও অন্যদের (২০২৫) এক গবেষণা দেখিয়েছে, বালিয়াড়ি সংরক্ষণে উদ্ভিদের আচ্ছাদন জরুরি। তবে বালিয়াড়ি সংরক্ষণে লতা-গুল্ম ও বুনো ঝোপের গুরুত্বও বহুদিন মূলধারার উন্নয়নে ‘অচ্ছুত’ ছিল; বরং বেশি তৎপরতা হয়েছে ঝাউগাছ নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঝাউগাছ বাংলাদেশের জন্য আগ্রাসী হলেও দীর্ঘ সময়ে তা বালুময় উপকূলে মানিয়ে গেছে। দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্থ অ্যান্ড
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস–এ প্রকাশিত এক গবেষণা (২০২৩) থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৯৭২-৭৩ সালে কক্সবাজার সৈকতে সবুজ উপকূল বেষ্টনী তৈরি করতে ঝাউগাছ বাইরে থেকে এনে লাগানো হয়। ২০২৪ সালে ইকোলজিক্যাল ফ্রন্টিয়ার্স–এ প্রকাশিত এক গবেষণা ২০০৫ থেকে ২০২৩ সময়ে কক্সবাজারের ঝাউয়ের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখায়, সমুদ্রভাঙনের কারণে ঝাউ বনের ক্ষতি হয়েছে। এম কে হোসেন ও অন্যরা (২০১৬) জানান, কাদামাটির সৈকতে কেওড়া ও বাইন উপযোগী হলেও বালুময় সৈকতের জন্য ঝাউ সহনশীল।
জীবন্ত বালিয়াড়ি কার্বন সঞ্চয় করে, জলোচ্ছ্বাস ঠেকায় ও ভাঙন রোধ করে। সৈকতের বালিয়াড়িকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নিয়মিত বালিয়াড়ির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ভগ্নস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যহানির কারণ নির্ণয় করে তা দূর করা জরুরি। জীবন্ত ও বিকশিত বালিয়াড়িতে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বালিয়াড়ি ও সৈকত পুনরুদ্ধার এবং ক্ষয় রোধে ‘বালিয়াড়ি বিমা’ করা যায়। জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট নয়া ক্ষয়ক্ষতির ধরন আমলে নিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত সুরক্ষায় বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রের জলবায়ু কূটনীতি সোচ্চার করতে হবে।
সৈকতভাঙন রোধের প্রাকৃতিক শক্তি লুকিয়ে আছে উপকূলের প্রকৃতি ও লোকায়ত সংস্কৃতির শিকড়েই। সাগরলতার মতো গাছগুলো লতিয়ে যায় এবং গুচ্ছাকারে শিকড় তৈরি করে। বাতাস বা ঢেউ থেকে বালু আটকে রাখে। উপকূল সুরক্ষায় রাখাইনরা ম্রাই শা-মা (সাগরদেবী) এবং তং-শামার (পাহাড়দেবী) পূজা করেন। সমুদ্রগামী বাঙালি মুসলিম জেলেদের বিশ্বাস, পানির পীর খোয়াজখিজির সমুদ্র রক্ষা করেন। স্থানীয় জনগণের লোকায়ত জ্ঞানজগৎও সৈকত ব্যবস্থাপনার সাংস্কৃতিক শিকড়। সমুদ্রসৈকত সুরক্ষায় ডেইল আর দরিয়ার (সমুদ্রের) এই জটিল সম্পর্কের রসায়ন রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে।
● পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী
* মতামত লেখকের নিজস্ব