বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা সব সময়ই একসঙ্গে দুটি সত্য বহন করেছে। কাগজে-কলমে এটি বড়, বৈচিত্র্যময় এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এটি প্রায়ই জটিল, খণ্ডিত এবং অনেক সময় অন্যায্য। সরকারের নতুন ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগ সেই পুরোনো টানাপোড়েনকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। চার মাসের পাইলট কর্মসূচি হিসেবে এটি চালু হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১৪টি উপজেলায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং প্রতিটি পরিবার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা পাবে।
সমর্থকেরা একে সাহসী, এমনকি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এটি হয়তো ইতিমধ্যেই ভিড়াক্রান্ত সামাজিক সুরক্ষা পরিসরে আরেকটি বড় কর্মসূচি হয়ে যুক্ত হবে। মূল প্রশ্নটি আসলে নীতিগতভাবে ফ্যামিলি কার্ড ভালো না খারাপ—সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের নকশাগত ও শাসনসংক্রান্ত দুর্বলতাগুলো ঠিক করতে পারবে?
এ উদ্যোগকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে দুটি বিষয়। প্রথমত, আলোচিত পরিসর বা ব্যাপ্তি অভূতপূর্ব। যদি সরকার শেষ পর্যন্ত দুই কোটি পরিবারকে মাসিক সহায়তার আওতায় আনে, তবে এর সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটি কোনো সাধারণ বাজেট খাত নয়। এটি একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক অঙ্গীকার, যা বহু বছর ধরে রাজস্ব ও ব্যয়ের অগ্রাধিকারকে প্রভাবিত করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত কাঠামো কেবল নগদ সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, বিদ্যমান টিসিবি কার্ডগুলোকে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্রে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। যদি এসব লক্ষ্য বাস্তব ও সুশাসিতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে যে সমস্যার সঙ্গে লড়ছে—খণ্ড খণ্ডভাবে বড় হওয়া একটি অসংলগ্ন সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা—তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১০০টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু আছে। বাজেট বরাদ্দ আনুমানিক জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এই বিস্তৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। বরং এটি প্রায়ই পুনরাবৃত্তি, অসংগতিপূর্ণ যোগ্যতার নিয়ম, প্রশাসনিক অপচয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুবিধার জন্য নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি করে।
ফলাফলও পরিচিত। কিছু পরিবার একাধিক সুবিধা পায়, আবার সমমানের দরিদ্র অন্য পরিবার কোনো সুবিধাই পায় না। যদিও মিডিয়াতে উদ্ধৃত খসড়া নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত দরিদ্রদের ২২ থেকে ২৫ শতাংশ বাদ পড়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাদ দেওয়ার ত্রুটি এই সংখ্যার দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। যখন বাদ দেওয়ার ত্রুটি এত বেশি হয়, তখন সংস্কারের পক্ষে নৈতিক যুক্তি প্রযুক্তিগত যুক্তির মতোই জোরালো হয়ে ওঠে।
ফ্যামিলি কার্ডের তিনটি দিক প্রশংসার দাবি রাখে, কারণ এগুলো গুরুতর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথমত, পরিবারকে একক হিসেবে ব্যবহার। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাসাভাড়ার চাপ বা চাকরি হারানো—এসব ঝুঁকি পরিবারভিত্তিকভাবে ভাগ হয়। পরিবারভিত্তিক কাঠামো ‘এক ব্যক্তি, এক সুবিধা’ ধরনের সীমাবদ্ধতা কমাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নারীদের প্রধান সুবিধাভোগী করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্ডটি মায়ের বা পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা হবে। আন্তর্জাতিক প্রমাণ বলছে, নারীদের হাতে অর্থ গেলে তা খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সন্তানের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। একই সঙ্গে এটি পরিবারের ভেতরে দর–কষাকষির ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, তথ্যভিত্তিক বাছাইপ্রক্রিয়া। প্রস্তাবিত প্রক্সি মিনস টেস্ট স্কোরিং, ঘরে ঘরে তথ্য সংগ্রহ, সমাজসেবা কর্মীদের যাচাই এবং কিউআর কোডযুক্ত কার্ড ব্যবহারের পরিকল্পনা পৃষ্ঠপোষকতা নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত দেয়।
তবে নকশাগত অভিপ্রায় বাস্তব ফলাফলে রূপ নেয় না স্বয়ংক্রিয়ভাবে। সেখানেই আসল পরীক্ষা।
এ ক্ষেত্রে তিনটি ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, লক্ষ্য নির্ধারণের ঝুঁকি। ফ্যামিলি কার্ড কোনো জাদু নয়। এটি সহায়ক হতে পারে, আবার ভুল শ্রেণিবিন্যাসও করতে পারে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যেখানে আয় অনিয়মিত এবং সম্পদ অনানুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশের শহুরে দরিদ্ররা প্রায়ই ‘শ্রমজীবী দরিদ্র’। পাইলট এলাকায় ঢাকার বড় বস্তি অন্তর্ভুক্ত হওয়া ইতিবাচক। তবে শক্তিশালী অভিযোগ ও আপিল ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পুনঃসনদায়ন অপরিহার্য। দরিদ্ররা যদি বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে না পারে, তবে রেজিস্ট্রি আরেকটি বৈষম্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, খণ্ডীকরণ ঝুঁকি। নতুন কর্মসূচি বিশৃঙ্খলা বাড়াতে পারে। যদি ফ্যামিলি কার্ড পুরোনো কর্মসূচিগুলো একীভূত না করে কেবল নতুন নগদ সহায়তা যোগ করে, তবে পুনরাবৃত্তি আরও বাড়বে। টিসিবি কার্ড একীভূত করার অঙ্গীকার তাই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সংস্কারের সুযোগ স্পষ্ট—ফ্যামিলি কার্ডকে সামাজিক সুরক্ষার ‘সম্মুখ দরজা’ হিসেবে ব্যবহার করা এবং ধীরে ধীরে এর পেছনে ওভারল্যাপিং সুবিধাগুলোকে যুক্তিসংগত করা। এর জন্য রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন। কারণ, একত্রীকরণ সর্বদা মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ক্ষতির কারণ হয়, দরিদ্রদের মধ্যে নয়।
তৃতীয়ত, আর্থিক ঝুঁকি। বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা সুষ্ঠুভাবে অর্থায়ন করতে হবে। সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক, নিয়মিত এবং মানব উন্নয়নের সঙ্গে সংযুক্ত সামাজিক ব্যয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারে। এটি ভোগব্যয় টিকিয়ে রাখতে, পুষ্টি সুরক্ষা দিতে এবং সম্পদ বিক্রির চাপ কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু রাজস্ব সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হলে এটি আর্থিক ফাঁদে পরিণত হতে পারে। তাই একটি প্রকাশ্য মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনা জরুরি—কত অংশ পুনর্বিন্যাস থেকে, কত অংশ নতুন রাজস্ব থেকে, কত অংশ দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।
জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল জীবনচক্রভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়ানো। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ঝুঁকির জন্য আলাদা সহায়তা প্রয়োজন। একটি কার্ড শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু সেটিই কৌশল নয়। বড় নগদ সহায়তা কর্মসূচি যেন মাতৃপুষ্টি, প্রতিবন্ধী সহায়তা বা শিশুকেন্দ্রিক সেবার মতো কর্মসূচিগুলোকে আড়াল না করে। ফ্যামিলি কার্ডকে তাই অবকাঠামো হিসেবে দেখা উচিত। রেজিস্ট্রি গড়া, পেমেন্টের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, যাচাইপ্রক্রিয়া উন্নত করা—তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি, শিক্ষা ভাতা, জলবায়ু সংবেদনশীল সহায়তা বা অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বহনযোগ্য সুবিধা যুক্ত করা।
ফ্যামিলি কার্ড যদি প্রকৃত সংস্কারের হাতিয়ার হতে চায়, তবে পাঁচটি অঙ্গীকার সাফল্যের মানদণ্ড হতে পারে—১. একক ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি, যা সব মন্ত্রণালয় ব্যবহার করবে এবং তথ্য সুরক্ষা ও প্রবেশাধিকার বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকবে। ২. একীভূতকরণের রোডম্যাপ; শুরুতেই ঘোষণা করতে হবে কোন কর্মসূচি একত্র হবে, কোনটি ধাপে ধাপে বন্ধ হবে এবং রূপান্তরকালে বর্তমান সুবিধাভোগীরা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে। ৩. স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড, যেখানে অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনত্রুটি, নিয়মিত অর্থ প্রদান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য প্রকাশ পাবে। ৪. নগর বহনযোগ্যতা; যাতে কাজের খোঁজে স্থানান্তরিত পরিবার ঠিকানা বদলালেই সুবিধা না হারায়। ৫. বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়নের পরিকল্পনা, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও ব্যয় পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
সামাজিক সুরক্ষা দয়া নয়। এটি অর্থনৈতিক নীতি। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি সহনশীলতা বাড়ায়, মানবসম্পদ গড়ে তোলে এবং বৈষম্য কমায়, যা কেবল প্রবৃদ্ধি দিয়ে সম্ভব নয়। ভুলভাবে পরিচালিত হলে এটি অপচয় ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
সেলিম রায়হান অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম
selim.raihan@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব