
একটি দেশের অর্থনীতি যখন আকস্মিক কিংবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন অর্থনীতিকে গতি দিতে কিংবা তার লাগাম টানতে নীতিনির্ধারকেরা আসলে কী করতে পারেন? সুদের হার বাড়ালেই কি মূল্যস্ফীতি কমে, সরকারি ব্যয় বাড়ালেই কি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়? নাকি এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবছে? আগামী দিনে আয় বাড়বে না কমবে, জিনিসপত্রের দাম কোথায় যাবে, কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজ যা বলছে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তা কতটা বিশ্বাস করছে?
মহামন্দা থেকে সত্তরের দশকের তেলসংকট, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, কোভিড-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি—প্রতিটি বড় ধাক্কাই অর্থনীতিবিদদের একই প্রশ্নের সামনে নতুন করে দাঁড় করিয়েছে: একটি অস্থির অর্থনীতিকে কীভাবে আবার স্থিতিশীল করা যায়? আর ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে কয়েক দশকের মৌলিক অবদানের জন্য ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট ই হল এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উডফোর্ড।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি তাঁদের পুরস্কৃত করেছে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি’ নির্মাণে অবদানের জন্য—সহজ ভাষায়, কোটি কোটি পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে কীভাবে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওঠানামা তৈরি হয়, এবং নীতি দিয়ে সেই ওঠানামা কতটা সামলানো সম্ভব, তার একটি সুসংগত ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য।
অর্থনীতিতে আকস্মিক ধাক্কার ক্ষতি সবার জন্য সমান নয়। মন্দার সময় দরিদ্র পরিবারের শ্রমবাজারের অবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক বেশি অস্থিতিশীল হতে পারে; ফলে অর্থনৈতিক মন্দা বৈষম্যও বাড়াতে পারে। তাই স্থিতিশীলতা নীতি কেবল জিডিপির ওঠানামা কমানোর বিষয় নয়, এর একটি সামাজিক মাত্রাও আছে।
মহামন্দার পর জন মেইনার্ড কেইনসের ধারণা আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলে। মূল যুক্তি ছিল, বাজার সব সময় নিজে থেকে পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে না। তাই মন্দার সময় সরকার ব্যয় বাড়াতে পারে, কর কমাতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক এই নীতিকাঠামো তুলনামূলকভাবে সফল বলেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকট সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। অনেক পশ্চিমা দেশে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ বেকারত্ব ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়—যাকে বলা হয় স্থবিরতা-সহ-মূল্যস্ফীতি। এতে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও উৎপাদনের মধ্যে যে সম্পর্কগুলোকে তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে ধরা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবে নীতি পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
রবার্ট লুকাসের সমালোচনা এই সমস্যাটিকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁর বক্তব্য ছিল, সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি বদলালে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও তাদের প্রত্যাশা ও আচরণ বদলায়। ফলে অতীতের পরিসংখ্যানগত সম্পর্ককে অপরিবর্তিত ধরে ভবিষ্যৎ নীতির ফল অনুমান করা নির্ভরযোগ্য নয়। এই চ্যালেঞ্জ থেকেই সামষ্টিক অর্থনীতিকে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন তৈরি হয়।
নতুন প্রকৃত ব্যবসায়চক্র তত্ত্ব এই ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুললেও সেখানে বাজারকে প্রায় নিখুঁতভাবে কার্যকর ধরা হয়েছিল, ফলে স্থিতিশীলতা নীতির প্রয়োজন খুব সীমিত হয়ে পড়ে। নতুন কেইনসীয় অর্থনীতি এখানেই ভিন্ন পথ নেয়। এটি একদিকে ভবিষ্যৎমুখী ও যুক্তিবাদী পরিবার-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে মূল্য ও মজুরির অনমনীয়তার মতো বাজারের বাস্তব অসম্পূর্ণতাকেও স্বীকার করে। ফলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নীতির জন্য আবারও একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়। হল ও উডফোর্ডের অবদানের যৌথ গুরুত্ব মূলত এখানেই।
রবার্ট হলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মানুষের ভোগের সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যৎমুখীভাবে ব্যাখ্যা করা। প্রচলিত কেইনসীয় ভোগতত্ত্বে বর্তমান ব্যবহারযোগ্য আয় বাড়লে ভোগও বাড়বে—এমন একটি সরল সম্পর্ক ধরা হতো। অন্যদিকে ফ্রিডম্যানের স্থায়ী আয় ধারণা ও মোদিগ্লিয়ানির জীবনচক্র তত্ত্ব ভবিষ্যৎ আয়কে গুরুত্ব দিলেও, প্রত্যাশাকে বাস্তব উপাত্তে কীভাবে নির্ভরযোগ্যভাবে হিসাব করা যাবে—সেটি বড় সমস্যা ছিল।
হলের মৌলিকত্ব হলো এই ভবিষ্যৎমুখী ধারণাকে যৌক্তিক প্রত্যাশার ভিত্তিতে এমনভাবে গঠন করা, যাতে সেটি সরাসরি উপাত্ত দিয়ে হিসাব করা যায়। তাঁর যুক্তি ছিল, মানুষ শুধু আজ কত আয় করছে তা দেখে খরচ করে না; ভবিষ্যতে আয় কেমন হবে, সেটিও বিবেচনা করে। তাই সাময়িক আয় বৃদ্ধি ও স্থায়ী আয় বৃদ্ধির প্রভাব এক নয়। উদাহরণ হিসেবে, একজন চাকরিজীবী একবারের জন্য ২০ হাজার টাকা বোনাস পেলে তার একটি অংশ সঞ্চয় করতে পারেন; কিন্তু মাসিক বেতন স্থায়ীভাবে ২০ হাজার টাকা বাড়লে নিয়মিত ভোগ—যেমন বাসাভাড়া, শিক্ষা বা অন্যান্য ব্যয়—বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ একই পরিমাণ আয় বৃদ্ধির প্রভাব নির্ভর করে মানুষ সেটিকে সাময়িক নাকি স্থায়ী মনে করছে তার ওপর।
হলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ভোগ মসৃণ রাখা। মানুষ সাধারণত আয়ের সাময়িক ওঠানামার সঙ্গে জীবনযাত্রার মান খুব বেশি বদলাতে চায় না। এখান থেকেই আসে তাঁর বিখ্যাত ভোগের পরিবর্তন আগাম অনুমান করা যায় না—এই ধারণা। অর্থাৎ আজ পর্যন্ত জানা সব তথ্য যদি মানুষ ইতিমধ্যেই তার ভোগের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভোগের বড় পরিবর্তন ঘটবে মূলত নতুন ও অপ্রত্যাশিত তথ্যের কারণে। সহজভাবে বললে, আগের তত্ত্বগুলো যেখানে ভোগ ও আয়ের সম্পর্ককে হয় সরল নিয়মে দেখত, নয়তো ভবিষ্যৎ আয়কে ধারণাগতভাবে গুরুত্ব দিত, হল সেখানে ভবিষ্যৎমুখী ভোগকে একটি পরীক্ষাযোগ্য, ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তিসম্পন্ন কাঠামোয় রূপ দেন।
মাইকেল উডফোর্ডকে বলা হয় নব্য কেইনসীয় মডেলের প্রধান স্থাপতি। তাঁর ২০০৩ সালের ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইস’ গ্রন্থে এই কাঠামো সুসংহত রূপ পায়। উডফোর্ড আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছেন। তাঁর ২০০৩ সালের বহুল প্রভাবশালী বই ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইস’ আধুনিক মুদ্রানীতি বিশ্লেষণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
পুরোনো কাঠামোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনোযোগ ছিল অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের দিকে। উডফোর্ডের কাঠামোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে সুদের হার। উডফোর্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণাগুলোর একটি হলো, বর্তমান সুদের হারের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সুদের হার সম্পর্কে প্রত্যাশাও আজকের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধরুন, অর্থনীতি মন্দায় আছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে সুদের হার প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। প্রচলিত অর্থে তখন সুদের হার আরও কমানোর সুযোগ খুবই সীমিত। উডফোর্ডের গবেষণা দেখায়, এমন অবস্থায়ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বিশ্বাসযোগ্যভাবে জানাতে পারে যে ভবিষ্যতেও কিছু সময় সুদের হার কম রাখা হবে, তবে ভবিষ্যৎ ঋণখরচ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলাতে পারে। পরিবার আজ বেশি ব্যয় করতে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে। এখান থেকেই ফরোয়ার্ড গাইডেন্স বা ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এর বাস্তব গুরুত্ব বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়।
কিন্তু উডফোর্ডের বক্তব্যের আরও গভীর একটি দিক আছে। নোবেল ঘোষণার পর দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নীতিকে এমনভাবে দেখা ঠিক নয় যেন সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল একটি বোতাম টিপে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নীতির প্রভাব নির্ভর করে বাজারের মানুষ ভবিষ্যৎ নীতিকে কীভাবে বোঝে এবং বিশ্বাস করে তার ওপরও। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের একটি তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা নীতি সুদ নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রবার্ট হলের গবেষণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করেছে। পরিবারগুলো যদি মনে করে জীবনযাত্রার এই বাড়তি ব্যয় সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী হবে, তাহলে তারা বর্তমান ভোগ কমায়, বড় কেনাকাটা পিছিয়ে দেয় এবং আরও সতর্ক হয়ে পড়ে। ব্যাপকভাবে এমনটি ঘটলে সামগ্রিক চাহিদা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও দুর্বল হতে পারে। তাই নীতিনির্ধারণে শুধু বর্তমান আয় নয়, ভবিষ্যৎ আয় ও মূল্যস্থিতি সম্পর্কে মানুষের আস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের স্থিতি, প্রকৃত আয় রক্ষা এবং মূল্যস্ফীতি কমে আসবে, এমন বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা আরও সরাসরি বাংলাদেশের মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং খাতে দেখা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং সুশাসন এবং ঋণপ্রবাহের সীমাবদ্ধতা মুদ্রানীতির কার্যকারিতাকে জটিল করে তুলেছে। উডফোর্ডের কাজ দেখায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু নীতি সুদ পরিবর্তন করলেই যথেষ্ট নয়; সেই সিদ্ধান্ত ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ, ভোগ এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আস্থা মুদ্রানীতির ফলকে প্রভাবিত করে। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণপ্রবাহে শৃঙ্খলা আনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিকে ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য রাখা কার্যকর মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য শুধু নীতির নকশায় নয়, মানুষ সেই নীতিকে কীভাবে বোঝে ও বিশ্বাস করে তার ওপরও নির্ভর করে। তাই একটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সঠিক নীতি নেওয়া নয়, এমন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সেই নীতি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হয়।
মো. মনির সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)