ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসে আছি, একটি কৃষ্ণচূড়াগাছের তলায়। শেষ পৌষের দুপুর। শাল, দেবদারু, মেহগনি, বট-পাকুড়—কত ধরনের বৃক্ষ চারদিকে। ঘাসের ওপর যে জায়গায় বসে আছি, এটি ‘মল চত্বর’ নামে পরিচিত। গত কয়েক বছরে জায়গাটির অবয়বে বেশ পরিবর্তন এসেছে। আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, সেই ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত, তখন এখানে হাঁটাপথ ও বৃক্ষ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এখন এখানে কিছু কাঠামো তৈরি হয়েছে। বসার জন্য কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। বৃক্ষ কিছু কমেছে।
যেখানে বসে আছি, সামনে-পেছনে, চারপাশে নানা ধরনের মানুষ দেখতে পাচ্ছি। কেউ সংবাদপত্র পড়ছেন, কেউ মুঠোফোনে ভিডিও কলে কথা বলছেন, তরুণ-তরুণীরা গোল হয়ে বসে গল্প করছেন, কেউ আয়েশে হাঁটছেন। এখানে কারোরই তেমন ব্যস্ততা নেই। কারণ, ভেতরে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
একটু আগে কথা হচ্ছিল দিনাজপুর থেকে আসা দুটো ছেলের সঙ্গে, তাঁদের মধ্যে একটি ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। এ বছর আবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছেন। ওই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান। একটু ভালো সাবজেক্টে পড়ার আশা রাখেন। তাই পরীক্ষা দিতে এসেছেন। এ রকম হরেক গল্প আছে এখানকার প্রত্যেকের। নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বললেই কেবল নতুন গল্পের সন্ধান পাওয়া যায়।
এখনো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়া করতে আগ্রহী। দেশের অভিভাবকদের একটি বড় অংশও চান তাঁদের সন্তান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করুক। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক, যতই রাজনীতি থাকুক, যতই মারামারি-সহিংসতার ঝুঁকি থাকুক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁদের আগ্রহ। এর প্রধান কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের মোটামুটি আবাসনের একটা ব্যবস্থা আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে, এটা সত্য। যেমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেনি বলা যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও পুরোপুরি আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের একধরনের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ, এর সুপরিসর ক্যাম্পাস। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একজন শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেয় না; ১৮ বছর বয়সের একজন নবীন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এসে সারা দেশ থেকে আসা তাঁর সমবয়সী মানুষের দেখা পান। বলা যেতে পারে, এ সময়ে তিনি পুরো বাংলাদেশেরই দেখা পান। আমাদের এক সহকর্মী বলছিলেন, যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করেছেন, যে আবাসিক হলে তিনি থাকতেন, তার সামনে প্রাচীন সব বৃক্ষ দেখে তিনি বুঝে নিতে পারতেন প্রকৃতিতে এখন কোন ঋতু চলছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটা বড় পাওয়া।
এই দেখা ও শেখার ভেতর দিয়েই একজন শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত এগোনোর চেষ্টা করেন। তাঁর ভেতর চিন্তা ও বোধ তৈরি হয়। পরবর্তী জীবনের দর্শন তৈরিতে এই বোধ বড় ধরনের ভূমিকা ও প্রভাব রাখে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের মধ্যে রয়েছে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য তো কমছেই না, বরং বাড়ছে। বছরের পর বছর ধরে বাড়ছে, বাড়ানো হচ্ছে।
আর আর্থিক ব্যাপার তো রয়েছেই। একজন শিক্ষার্থী সীমিত খরচে শিক্ষাজীবন শেষ করার সুযোগ লাভ করেন। কারণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিনিয়োগ করে। এই বিনিয়োগ হয় মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থেই। এই বিনিয়োগ করে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্তাদের খুঁজে বের করে নেয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ বোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে অথবা করার চেষ্টা করে। হয়তো অনেকের ভিন্নমত থাকবে। থাকতেই পারে। ভিন্নমতকে সব সময় স্বাগত জানাতে হয়। কারণ, ভিন্নমতের মধ্য দিয়ে একটি মত প্রতিষ্ঠা পায়।
আরেকটি কথা ভাবছিলাম। এই যে আমার সামনে কতশত ভর্তি–ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর স্বজন ও অভিভাবক বসে আছেন। ফলাফলের পর তাঁদের বড় অংশটিরই স্বপ্নভঙ্গ হবে। কারণ, যাঁরা এখানে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবেন না। পরীক্ষা দেওয়ার শর্ত অর্জন করলেও তাঁদের বড় অংশ অকৃতকার্য হবেন। এরপর তাঁরা হয়তো কোনো কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবেন। কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও চেষ্টা করবেন। অনেক তরুণ হয়তো লেখাপড়াই ছেড়ে দেবেন। কেউ কেউ হয়তো শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। মেয়েদের মধ্যে অনেকের বিয়ে হয়ে যাবে।
একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে, তা ঠিক করে দেওয়া হয়। প্রতিবছর হয়তো একজন, দুজন করে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়ানো হয়, তাতে বৃহত্তর চাহিদা মেটে না। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই রাতারাতি দ্বিগুণ, তিন গুণ শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে না। কারণ, তার সুযোগ সীমিত। তার ক্লাসরুম সীমিত, ল্যাব সীমিত, হলের আসন সীমিত, শিক্ষক সীমিত, লাইব্রেরি সীমিত, গবেষণার সুযোগ সীমিত, প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। বলা যেতে পারে, সবই সীমিত ও সুনির্দিষ্ট। দিনে দিনে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিণত হয়েছে ‘সীমিত বিশ্ববিদ্যালয়ে’।
এই সীমিত ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের দায় পুরোপুরি তাঁদের দেওয়া চলে না। তারপরও একটা ব্যাপার সবাই খেয়াল করে দেখুন। ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় ৬৪ পেলে যে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছেন, মাত্র ১ নম্বর কম পেলে তাঁর স্কোর নেমে যাচ্ছে হাজারের নিচে। যে শিক্ষার্থী ৬৫ পাচ্ছেন আর যে শিক্ষার্থী ৬১ পাচ্ছেন, নিশ্চয়ই তাঁদের মেধায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই পার্থক্য কতটা। সেই পার্থক্য তো এমন নয় যে একজন শিক্ষার্থী পর্বতের চূড়ায় আর একজন পাদদেশে? তা কিন্তু নয়। একেবারেই নয়। এ বিষয় কি আমরা ভাবব না? আমাদের চিন্তায় নেব না?
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি, কোচিংসহ নানা খাতে একজন শিক্ষার্থীর কিংবা তাঁর অভিভাবকের যথেষ্ট ব্যয় হয়। যিনি সচ্ছল কিংবা কিছুটা সচ্ছল এবং যাঁর ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা রয়েছে, তিনি হয়তো এই ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু যাঁর পানতা আনতে নুন ফুরোয়, পরিবারের খাওয়াদাওয়া, কাপড়চোপড়ের চাহিদা মেটানো, লেখাপড়ার খরচ জোগাতে ত্রাহী অবস্থা, তিনি কীভাবে কোচিংয়ের জন্য বাড়তি পয়সা খরচ করবেন? আমার জোর ধারণা, সামান্য কম স্কোরের জন্য যাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন না, তাঁদের বড় অংশ অসচ্ছল পরিবারের সন্তান। যথেষ্ট মেধাবী হয়েও, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতাই তাঁদের সঙ্গী হয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের মধ্যে রয়েছে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য তো কমছেই না, বরং বাড়ছে। বছরের পর বছর ধরে বাড়ছে, বাড়ানো হচ্ছে।
বিষয়টি একটু আন্তরিকতার সঙ্গে, একটু যত্নসহকারে ভাবার মানুষ কি আমাদের সমাজে নেই? যাঁরা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, গবেষণা করেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন করে ভাববেন না?
• কাজী আলিম-উজ-জামান প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক
alim.zaman@prothomalo.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব