সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

খুলে দিল অগ্রগতির দুয়ার

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আজি দখিন-দুয়ার খোলা—/ এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো।/ দিব হৃদয়দোলায় দোলা।’ বলতে দ্বিধা নেই, স্বপ্নের পদ্মা সেতু এই ঘনঘোর আষাঢ়েও বাংলাদেশে বসন্তের দোলা নিয়ে এল। খুলে দিল অগ্রগতির দখিন দুয়ার।

আজ ২৫ জুন বহুপ্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মার দুই পারে বিশাল ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধনের পর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে। দেশের সর্ববৃহৎ সেতু চালুর শুভক্ষণটি স্মরণীয় করে রাখতে সমবেত হবে পদ্মার দুই পারের মানুষ। সেতু উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যাবে এর আনন্দ।

পদ্মা সেতু কেবল একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প নয়; রাজনৈতিক দৃঢ়তা, সাহস ও সক্ষমতারও প্রতীক। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতিচেষ্টার অভিযোগ এনে অর্থায়ন বাতিল করলে এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলেও অনেক বিতর্ক সৃষ্টি করে। তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকেও বিদায় নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে ‘বিদেশিরা টাকা না দিলে আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব।’ অনেক বিশেষজ্ঞ তাঁর এই ঘোষণাকে অবাস্তব বললেও তিনি সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সেতুর নির্মাণকাজও উদ্বোধন করলেন।

সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে, এটি দেশের ১৭ কোটি মানুষের আনন্দ ও গর্বের বিষয়। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এই শুভক্ষণে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে অভিনন্দন জানাই। অভিনন্দন জানাই পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের।

পদ্মা সেতুর চেয়ে অনেক দীর্ঘ সেতু পৃথিবীতে আছে, কিন্তু বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা নদী হওয়ায় পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণ ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। খরস্রোতা নদী হওয়ার কারণে নদীর তলদেশে ১৬ তলা ভবনের উচ্চতার সমান পাইলিং করা হয়েছে। উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পেও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা নেই। প্রধানমন্ত্রী ২২ জুনের সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন করতে পারবেন না।’

যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে অনেক গতি এনে দিয়েছে; মঙ্গা তিরোহিত হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবকাঠামোমূলক উন্নয়ন হবে, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বন্যাপ্রবণ হওয়ায় সেখানে রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো যাতে বন্যা-প্রতিরোধী হয়, সেটি মাথায় রাখতে হবে। আবার উন্নয়ন যাতে শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক হয়ে না পড়ে। সেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর জন্য সহজ সুদে ঋণ, দক্ষ শ্রমিক ও জমির প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়ন ও বিনিয়োগের এসব শর্ত পূরণ করতে পারলে পদ্মা সেতুর পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।

পদ্মা সেতু দূরকে কেবল নিকট করবে না, পরকেও কাছে টানবে। প্রস্তাবিত ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ে ও হাইওয়ে যাবে এই সেতুর ওপর দিয়ে। সে ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে। পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকায় বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে সরকার নানামুখী পরিকল্পনা করছে। সাভার থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত উড়ালসড়ক করা হবে এবং ঢাকা ঘিরে নির্মাণ করা হবে বৃত্তাকার সড়ক। আমরা আশা করছি, পদ্মা সেতুর কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে সরকার এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেবে।