সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কঠোর জবাবদিহি চাই

সড়ক কবে সুশৃঙ্খল হবে

দেখেশুনে মনে হচ্ছে সড়ক-মহাসড়কের বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা যেন একটা সমাধান-অযোগ্য জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কারণ, অনেক আশ্বাস, উদ্যোগ, তৎপরতার পরও সড়কে মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানি অবিরাম ঘটে চলেছে। প্রথম আলোর হিসাব বলছে, গত ৫৮৫ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৫১ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে।

গত ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকায় বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভ-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল এবং ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃপক্ষ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেসবের কোনোটাই তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। মাসব্যাপী পুলিশি অভিযানের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারকে অসহায়ের মতো বলতে শোনা গেল, ‘সবকিছু পুলিশের হাতে নেই’। কোনো একটি কর্তৃপক্ষের হাতে সবকিছু থাকে না, এ কথা বলাই বাহুল্য, কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের হাতে যেটুকু ক্ষমতা আছে, তারও কি সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে? ট্রাফিক পুলিশ কি নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছে?

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জনগণ আইন মানে না, পথচারীরা পদচারী-সেতু, জেব্রা ক্রসিং এসব ব্যবহার করে না, ইত্যাদি। তারা চলন্ত যানবাহনের ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণ হারায়। এসবই সত্য, কিন্তু এ জন্য ট্রাফিক পুলিশের দায়দায়িত্ব কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। জনসাধারণের অবশ্যই আইনকানুন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, তবে তা আপনাআপনি গড়ে উঠবে না, যদি আইন প্রয়োগের ব্যবস্থায় ঘাটতি থেকে যায়। ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি রয়েছে। বেপরোয়াভাবে যাঁরা যানবাহন চালান, বেশি যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় যেসব বাসচালক পরস্পরকে পাল্লা দিতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান, সড়কের যেখানে–সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলেন, তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। চলাচলের অযোগ্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে চলাচল করছে, ব্রেক ফেল করে ফুটপাতের ওপরে উঠে গিয়ে পথচারীদের মৃত্যুর কারণ ঘটাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে কি এসব যানবাহন চলাচল করতে পারে?

ঢাকা মহানগরের স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর। সিগন্যাল বাতিগুলো জ্বলে কি না, যানবাহনের চালকেরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করেন না। অন্যদিকে বিআরটিএর নানা অনিয়মের কারণে যানবাহনের নিবন্ধন এবং চালকদের লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় যে নৈরাজ্য চলে আসছে, সে ব্যাপারেও কোনো জবাবদিহি নেই। অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেওয়া এবং ভুয়া লাইসেন্সের প্রাচুর্য বিরাট ক্ষতির কারণ হয়েছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া যান চালানো ইত্যাদি যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলো দূর করার দায়িত্ব কার? এ বিষয়ে কেন জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই?

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে আইন সংশোধন করে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যানচালকদের কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। কিন্তু আইন থেকে কী লাভ, যদি সে আইন প্রয়োগ করা না হয়? বেপরোয়া যান চালিয়ে দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর কারণ ঘটানোর অপরাধে যানচালকদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। সম্প্রতি রাজশাহীতে ট্রাকের চাপায় স্কুলছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার আসামি ট্রাকচালক আদালতে জামিন না পাওয়ায় পরিবহনশ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন। এ ধরনের দৃষ্টান্ত আরও আছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের বিষয়টি কেন আন্দোলন-সংগ্রামের ওপর নির্ভরশীল থাকবে?

সড়ক পরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্য দায়ী প্রধানত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এ ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা, কর্তব্যে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করা একান্ত জরুরি। সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। জনসাধারণকেও ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।