একটি সেতু নির্মাণে বিলম্ব যে কত মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্ভোগে ফেলে দিতে পারে, কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গোমতী নদীর ঘটনা তার স্পষ্ট উদাহরণ। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, তিতাস উপজেলার আসমানিয়া বাজারসংলগ্ন গোমতী নদীর ওপর একটি পাকা সেতুর নির্মাণকাজ সাড়ে তিন বছরেও শেষ হয়নি। ফলে নদীর দুই তীরের অন্তত ৪৫ গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে যাতায়াত করছেন।
সেতুটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের ৮ আগস্ট। প্রায় ১০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৫ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি; বরং সময় বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার। সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। সেটিও অতিক্রম করেছে। এখন আবার ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।
এই বিলম্বের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষ। গোমতী নদীর পূর্ব তীরে রয়েছে আসমানিয়া বাজার, বেগম রোকেয়া বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নারান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের বহু গ্রামের মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনে এই বাজারে আসেন। একইভাবে পূর্ব তীরের মানুষকে উপজেলা পরিষদ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও থানা কার্যালয়ে যেতে নদী পার হতে হয়। ফলে এই সেতু দুই তীরের মানুষের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ।
সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সেটিও দুই দফা ভেঙে এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাল্কহেডের ধাক্কা ও বন্যার স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি।
এই পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। অনেকে এখন অতি প্রয়োজন ছাড়া বাজারে আসেন না। ফলে কয়েক বছর ধরে ব্যবসা কমে গেছে। একটি সেতুর বিলম্ব যে কীভাবে একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহকে ব্যাহত করতে পারে, এটি তার বাস্তব উদাহরণ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু তাগাদা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি, নির্ধারিত সময়সীমা মানা এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। মানুষের ভোগান্তির জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমরা আশা করি, জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হবে।