সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা

৯৯১টি শূন্য পদ থাকাটা হতাশাজনক

পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির বিষয়টি কারও অজানা নয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে এ বাস্তবতার প্রকাশ ঘটে, যখন আমরা জানতে পারি, রাঙামাটি জেলায় সাত শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে চার শতাধিক স্কুলেই প্রধান শিক্ষক নেই। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাঙামাটি জেলায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসব পদ শূন্য। শুধু এক বা দুজন শিক্ষক নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে হচ্ছে, এমন বিদ্যালয়ও আছে। দপ্তরি, সহকারী ও প্রধান শিক্ষকের সব কাজই ওই এক বা দুজনকে করতে হয়। উপজেলা সদরে কোনো সভায় গেলে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়।

পাহাড়ের দুর্গম জনপদগুলোতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া এমনিতেই বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে এই দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক–সংকট ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঘাইছড়ি, লংগদু বা জুরাছড়ির মতো দুর্গম এলাকায় যেখানে সাক্ষরতার হার এমনিতেই কম, সেখানে যদি বছরের পর বছর বিদ্যালয়গুলো শিক্ষকশূন্য থাকে, তবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাবে—এটাই স্বাভাবিক। অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় শিশুরা স্কুলবিমুখ হচ্ছে এবং ঝরে পড়ার হার বাড়ছে।

জেলার শিক্ষক প্রশিক্ষণ সেন্টারের একজন প্রশিক্ষকের বক্তব্য, এক থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে প্রাক্‌-প্রাথমিকসহ সাতটি শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করা অসম্ভব। দাপ্তরিক কাজে একজন শিক্ষক বাইরে গেলে স্কুলটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল ‘নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন’ বলে দায় সারছেন, কিন্তু এই পাঁচ বছরে যারা স্কুল থেকে ঝরে গেল বা যারা মানসম্মত শিক্ষা পেল না, তাদের সেই অপূরণীয় ক্ষতির দায় কে নেবে?

পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব ন্যস্ত। আমরা জানি, পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান ও জটিলতার কারণে সেখানে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কিছু বাড়তি সময় লাগতে পারে। কিন্তু পাঁচ বছর কোনো যৌক্তিক সময়সীমা হতে পারে না। এটি চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

পাহাড়ের শিশুদের সমতলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে হলে শিক্ষার শক্ত ভিত প্রয়োজন। সেই ভিতই যদি দুর্বল ও শিক্ষকশূন্য থাকে, তবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা আশা করি, রাঙামাটি জেলা পরিষদ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। পাহাড়ে শিক্ষাবিস্তারে যেন কোনো বৈষম্য না হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।