সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

মাদুরোকে তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র

এই আগ্রাসনে বিশ্ব নীরব থাকতে পারে না

আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেটা বেপরোয়া আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু নয়।

নজিরবিহীন এ ঘটনা একদিকে যেমন একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন, তেমনি ঘটনাটি একটি বড় রাষ্ট্রের যা খুশি তা–ই করার বিপজ্জনক এক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই হামলা ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের হুমকি এবং লাতিন আমেরিকাজুড়ে সংঘাত বিস্তারের শঙ্কা তৈরি করেছে।

স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিমানঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে বিশাল হামলা চালান। এ হামলায় সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে মাদুরোর আটকাবস্থার ছবি প্রকাশ করেন। পরে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি ভেনেজুয়েলায় ন্যায়সংগতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগপর্যন্ত সরকার পরিচালনার এবং ভেনেজুয়েলার তেলখনিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোকে পাঠানোর ঘোষণা দেন।

মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক ও অস্ত্রের মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে। মাদক ও অস্ত্র পাচারের অজুহাত দেওয়া হলেও এই আগ্রাসনের উদ্দেশ্য যে ভেনেজুয়েলায় শাসন পরিবর্তন এবং তেলের খনির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সেটা একেবারে পরিষ্কার।

ভেনেজুয়েলা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র আসে—এমন অভিযোগে কয়েক মাস ধরেই ভেনেজুয়েলার নৌযানে হামলা, তেলবাহী জাহাজ আটক থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় সাগরে রণতরি মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে।

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাসও ভয়াবহ কলঙ্কময়। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সেই অন্ধকার যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটাল। এ ঘটনায় বিশ্ব আরও অনিরাপদ হলো। জাতিসংঘসহ সমগ্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের উচিত, এই নির্লজ্জ আগ্রাসনের নিন্দা জানানো। ভেনেজুয়েলার জনগণকেই ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভাগ্যের নির্ধারক হতে হবে।

ভেনেজুয়েলার আদালত ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের আদেশ দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলা কোনো দেশের উপনিবেশ হবে না। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন জায়গায় মাদুরোর সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেছেন। বিরোধী পক্ষও কোথাও কোথাও রাস্তায় নেমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। ফলে এ মুহূর্তে ভেনেজুয়েলায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়া, কিউবা, মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি দেশ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। চীন মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স মাদুরোর অপসারণকে স্বাগত জানিয়েছে।

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর শাসনকে গণতান্ত্রিক বলার কোনো কারণ নেই। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র নস্যাতের অভিযোগ আছে। কিন্তু স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে কে সরকার পরিচালনা করবে, কোন পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা হবে, সেটা নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের।

বাইরে থেকে হস্তক্ষেপ করে ও হামলা চালিয়ে সরকার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের হামলাকে নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করেছেন।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার নামে হোক আর সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে হোক, বিশ্বের দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং শাসন পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদ লুণ্ঠন। বর্তমান বিশ্বে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও এর পশ্চিমা মিত্ররা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে পরোক্ষ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, সম্পদ দখলের এই নব্য উপনিবেশবাদী প্রচেষ্টা কখনোই সফল হয়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ—সবখানেই মার্কিনিদের পশ্চাদপসরণের অপমানজনক ইতিহাস রয়েছে। অনেক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রক্তপাত ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর খেসারত অঞ্চল ছাপিয়ে পুরো বিশ্বকেই দিতে হয়েছে।

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাসও ভয়াবহ কলঙ্কময়। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সেই অন্ধকার যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটাল। এ ঘটনায় বিশ্ব আরও অনিরাপদ হলো। জাতিসংঘসহ সমগ্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের উচিত, এই নির্লজ্জ আগ্রাসনের নিন্দা জানানো। ভেনেজুয়েলার জনগণকেই ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভাগ্যের নির্ধারক হতে হবে।