৪২০ জেলেকে অপহরণ

রাষ্ট্র ও সরকারকে নির্বিকার থাকা চলবে না

দেশের সার্বভৌম জলসীমানার ভেতরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি বিদেশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে চার শতাধিক নাগরিক অপহৃত হওয়ার খবর কেবল উদ্বেগের নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এক চরম অপমানের। টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের অন্তত ৪২০ জন জেলে পাঁচ মাস ধরে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে বন্দী রয়েছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘ নীরবতা আমাদের হতবাক করে। দুঃখজনক হচ্ছে, তাঁদের উদ্ধারে কার্যকর কোনো তৎপরতা নেই। অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশেও দাঁড়ানোর কেউ নেই।   

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ভুক্তভোগী কয়েকটি জেলে পরিবারের আর্তনাদ আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স নামের একটি সংগঠন অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলো জানে না তাদের স্বজনেরা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। অভাব-অনটন আর দাদনের ঋণের বোঝার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বজন হারানোর অনিশ্চয়তা। এমনকি এক পরিবারের দুই সন্তানও অপহরণের শিকার হয়ে এখন নিখোঁজ, এমন ঘটনাও ঘটেছে। দুই জেলের মা মদিনা বেগম বলেন, কৈশোরে স্বামীকে হারিয়ে ছেলে দুটোকে অনেক কষ্টে বড় করেছেন। আজকে তাঁরা আরাকান আর্মির হাতে বন্দী। তিনি মরার আগে অন্তত দুই ছেলেকে দেখে যেতে পারেন—সেই ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের এমন আর্তি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। 

প্রশ্ন জাগে, নিজ দেশের সীমানায় জীবন-জীবিকার সন্ধানে গিয়ে নাগরিকেরা যদি এভাবে ভিনদেশি প্যারা মিলিটারি বাহিনীর হাতে নিগৃহীত হন, তবে সেই জলসীমা রক্ষার দায়িত্ব কার? দুঃখজনক বিষয় হলো, সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড বা অপহরণ নিয়ে আমাদের দেশে যতটা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ দেখা যায়, আরাকান আর্মির হাতে কয়েক শ জেলে অপহৃত হওয়ার ঘটনায় তেমন কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সাগরে এই নিরাপত্তাহীনতাকে কেন ছায়াযুদ্ধ বা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে? কোনো একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন নির্বিচার একটি স্বাধীন দেশের জলসীমায় ঢুকে নাগরিকদের তুলে নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ পাঁচ মাসেও রাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধারে কোনো দৃশ্যমান সুরাহা করতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্রের কার্যকর সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সমুদ্র বিজয় হলেও সমুদ্রে আমাদের জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। সেন্ট মার্টিনের মানুষের কাছে পর্যটন কেবল দুই মাসের বিষয়, কিন্তু তাঁদের সারা বছরের জীবিকা হলো মৎস্য শিকার। যদি সেই মূল পেশায় ভিনদেশি শক্তির আঘাত আসে এবং রাষ্ট্র সেখানে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই জনপদের মানুষেরা ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন।

আমরা মনে করি, আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারের কী ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত সমীকরণ রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের দেখার বিষয় নয়। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অবিলম্বে মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে অপহৃত ৪২০ জন জেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল জোরদার করে সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ–সংলগ্ন সাগরে বাংলাদেশি জেলেদের জন্য ভয়হীন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দিতে না পারলে কোনো ভূরাজনৈতিক সমীকরণই সফল বলে গণ্য হবে না।