বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী সরকারি আজিজুল হক কলেজের সামনে রেললাইনের দুই পাশে যেভাবে অবৈধ দখলদারি চলছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানিয়েছে, রেল বিভাগের জমি দখল করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্থায়ী দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে এবং কামারগাড়ি রেলগেট–সংলগ্ন একটি বিশাল জলাধার ভরাট করা হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বা ব্যক্তিগত উপার্জনের দোহাই দিয়ে এই যে দখলদারি, তা কেবল আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও নগর পরিবেশের ওপর চরম আঘাত।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের ভাষ্যমতে, ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনেই রেললাইনের দুই পাশে স্থাপনা নির্মাণ করায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে। এত দিন যে জলাধারটি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি একটি প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করত, সেটিকেও এখন কৌশলে ভরাট করা হচ্ছে। একটি স্বনামধন্য কলেজের ঠিক সামনে রেললাইনের মতো অতিঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কীভাবে একের পর এক রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক দোকান গড়ে ওঠে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
এখানে বরাবরের মতোই সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা যেখানে বলছেন রেললাইন থেকে ২০ ফুটের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ অবৈধ এবং তাঁরা কাউকে ইজারা দেওয়ার বিষয়ে অবগত নন, সেখানে দখলদারেরা বুক ফুলিয়ে দাবি করছেন তাঁরা রেলওয়ের কাছ থেকে জায়গা লিজ নিয়েছেন। এমনকি পৌরসভার যাত্রীছাউনি দখল করেও দোকানঘর বানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছেন তাঁরা। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একদল প্রভাবশালী মানুষ কি আইনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন? এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটিই আমরা দেখে থাকি। কিন্তু এসব প্রভাবশালীর থেকে কি রেহাই নেই কারও?
শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে বা বেকারত্ব ঘোচানোর কথা বলে রেললাইনের পাশে দোকান খোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য যুক্তি হতে পারে না। কারণ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইনের ধারে কফিশপ বা বিরিয়ানির দোকান চালানো যেমন বিপজ্জনক, তেমনি এটি ট্রেনের নিরাপদ চলাচলেও বিঘ্ন ঘটায়। অন্যদিকে পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জলাধার ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ডিসিকে চিঠি দেওয়া হলেও দখল কাজ বন্ধ না হওয়া প্রশাসনের চরম ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে।
আমরা মনে করি, রেল বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে কলেজের সামনের এই অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা। লিজ দেওয়ার নামে যদি কোনো জালিয়াতি হয়ে থাকে, তবে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা ও পরিবেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বগুড়ার এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠের সামনের পরিবেশকে দখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। দখলদারদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যেন উচ্ছেদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, এমনটাই প্রত্যাশা।