‘বাঁধ ব্যবসায়’ ডুবছে হাওর

পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

এবার সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নতুন ও নজিরবিহীন সংকট দেখা দিয়েছে। এবার উজান থেকে প্রলয়ংকরী ঢল নামেনি, ভাঙেনি শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কোনো ফসল রক্ষা বাঁধও। এরপরও জলাবদ্ধতার কারণে তলিয়ে গেছে কৃষকের সোনার ধান। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রথাগত হাওর ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবছর শতকোটি টাকা ব্যয়ের তথাকথিত বেড়িবাঁধের কার্যকারিতাকে বড় ধরনের কাঠামোগত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এবার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছিল। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই বেড়িবাঁধ বাবদ ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু যে বাঁধ হওয়ার কথা ছিল সুরক্ষাকবচ, সেটাই এখন পরিণত হয়েছে জলাবদ্ধতার এক ফাঁদে। উজানের ঢল ঠেকাতে গিয়ে যে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের জাল বিছানো হয়েছে, তা অতিবৃষ্টির পানি হাওর থেকে নদী ও ভাটিতে নির্বিঘ্নে নেমে যাওয়ার পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃষকেরা নিজেরাই বাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হয়েছেন।  

দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয় আর বর্ষার পানিতে সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে ভরাট হচ্ছে হাওর ও নদীর তলদেশ। পলি জমে ধনু, কংস, পাটলাই ও সুরমার মতো নদীগুলোর নাব্যতা আজ তলানিতে। ফলে নদীগুলোর পানি ধারণ ও নিষ্কাশনক্ষমতা সংকুচিত হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত জলকপাট (স্লুইসগেট) এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, যা প্রাকৃতিকভাবে পানি সরে যাওয়ার পথকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছে।

পরিবেশবাদী ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—হাওরে বাঁধ নির্মাণ এখন একশ্রেণির কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কাছে একটি বার্ষিক লাভজনক ‘ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বাস্তবতার চেয়ে প্রকল্পের আকার ও বাজেট বাড়ানোকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে, অতিবৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে। তাই প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার মাটির বাঁধ দিয়ে হাওরের ফসল আর রক্ষা করা যাবে না। এখন সময় এসেছে হাওর ব্যবস্থাপনার এই পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ দর্শনে আমূল পরিবর্তন আনার। নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী খনন বা ড্রেজিং করতে হবে। হাওরের পানিনিষ্কাশনের পথগুলোতে শুধু মাটির বাঁধ না দিয়ে, স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানিনিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত রাবার ড্যাম বা প্রকৃতিবান্ধব স্থায়ী জলকপাট নির্মাণ করতে হবে।

ফলে কোনো একক ও বদ্ধ পরিকল্পনা না করে স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের সমন্বয়ে হাওরে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।