সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

শতাধিক বাল্যবিবাহ

এক ইউনিয়নেই এমন চিত্র উদ্বেগজনক

করোনা মহামারি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ জীবনযাপন পর্যন্ত অনেক কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়ে গেছে। সরকারের প্রচেষ্টা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ রোধে একসময় যে সাফল্য এসেছিল, সেখানেও লেগেছে বড় ধাক্কা। করোনাকালে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শুরু হয় বাল্যবিবাহের হিড়িক। তবে মহামারি পার হয়ে গেলেও বাল্যবিবাহ আর থামছে না। নতুন এক সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে তা।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ভোলা সদর উপজেলার এক ইউনিয়নেই গত এক বছরে কয়েক মাসের ব্যবধানে শতাধিক বাল্যবিবাহ হয়েছে। শুধু একটি বিদ্যালয়ের ৫৯ ছাত্রীর বাল্যবিবাহ হয়েছে। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, মা-বাবার অসুস্থতা, বখাটের দ্বারা উত্ত্যক্তের শিকার হওয়া ও প্রেম করে পালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন অভিভাবকেরা। আগের তুলনায় মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ার প্রতিফলন ঘটছে বাল্যবিবাহের ঘটনায়। এর মধ্যে নতুন উপদ্রব হিসেবে হাজির হয়েছে গ্রামে গ্রামে বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। ফলে স্কুলগামী কিশোরীদের জীবন বিষিয়ে উঠছে, যার নিদারুণ সমাধান মিলছে বাল্যবিবাহে।

বাল্যবিবাহ রোধ করতে না পারার পেছনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বড় দায় আছে। অনেক সময় উপজেলা প্রশাসনের টের পাওয়ার সুযোগ থাকে না প্রত্যন্ত এলাকার কোন পাড়া বা কোন ঘরে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন, কিন্তু তাঁরা সেটি করছেন না বলে ভেদুরিয়া ইউনিয়নে আজ এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা গেল। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের ভাষ্য, তাঁরা যখন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বিয়ের লিখিত বা মৌখিক অনুমতি দেন না, তখন অভিভাবকেরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের কাছে গিয়ে বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ নেন। অথচ বাল্যবিবাহের জন্য বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ নেওয়ার এমন বিষয়টি জানেনই না স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। এটি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে না।

এখানে বড় দায় আছে বিয়ে পড়ানোর কাজিরও। ইউনিয়নটির মো. ছানা উল্লাহ নামের এক কাজি ও তাঁর নিয়োগ করা নয়জন সহকাজি বাল্যবিবাহ পড়িয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছানা উল্লাহ ভেদুরিয়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের যুগ্ম সম্পাদক। সম্প্রতি স্থানীয় এক ব্যক্তি ছানা উল্লাহর বিরুদ্ধে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তাঁর সনদ বাতিল ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। আমরাও দাবি জানাই, এই কাজির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ভোলা সদর উপজেলায় বাল্যবিবাহ রোধে সব জনপ্রতিনিধি, স্কুলশিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সমাজনেতা ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এ কাজ করতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকেই। আমরা আশা করব, উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে এ সম্মিলিত পদক্ষেপ নেবে।