নীরব এলাকায় হর্ন নিষিদ্ধ

বাস্তবায়নে ডিএমপিকে মনোযোগী হতে হবে

রাজধানী ঢাকাবাসীর জীবনে শব্দদূষণ অনেক আগেই বড় ধরনের ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে অকারণে হর্ন বাজানো যেন এক স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, ২ ফেব্রুয়ারি আদালত, হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা একই ধরনের অন্য প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে বিস্তৃত এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এসব নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড হবে। দেরিতে হলেও এই সিদ্ধান্ত নাগরিক জীবনের মান উন্নয়নের পথে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

নীরব এলাকা নির্ধারণ কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষারও অংশ। অতিরিক্ত শব্দ মানুষের মানসিক চাপ বাড়ায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। হাসপাতালের সামনে হর্নের বিকট শব্দ কোনো অসুস্থ মানুষের জন্য কেবল বিরক্তির নয়, কখনো কখনো শারীরিক যন্ত্রণার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা মনঃসংযোগ নষ্ট করে, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ ব্যাহত করে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এটি যথেষ্ট কঠোর বলেই বিবেচিত হতে পারে। তবে বাংলাদেশে কাগজে–কলমে আইনের অভাব নেই, অভাব রয়েছে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায়। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বিশেষ দিবস বা অভিযানের সময় কঠোরতা দেখা দিলেও কিছুদিন পর তা শিথিল হয়ে যায়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও যদি একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে এই সিদ্ধান্ত কেবল কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, ধারাবাহিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং সর্বোপরি চালকদের মানসিকতার পরিবর্তন।

এই প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল জরিমানা আর শাস্তির ভয় দেখিয়ে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের সময় শব্দদূষণবিষয়ক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। গণপরিবহনের চালকদের জন্য বিশেষ কর্মশালার আয়োজনও জরুরি।

নাগরিক জীবনমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো শব্দ নিয়ন্ত্রণ। একটি উন্নত শহর কেবল উঁচু ভবন বা চওড়া সড়ক দিয়ে চিহ্নিত হয় না, বরং তার নীরবতা ও শৃঙ্খলাও তার মান নির্ধারণ করে। ডিএমপির এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই স্বাগত যেন নিছক আনুষ্ঠানিক না থাকে। কার্যকর প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটিকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হবে। অন্যথায় ঘোষণার কালি শুকানোর আগেই তার গুরুত্ব হারিয়ে যাবে, আর ঢাকার আকাশে হর্নের কর্কশ ধ্বনি আগের মতোই প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।