সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সংখ্যালঘু ভোটার

নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে

বাংলাদেশের প্রায় সব নির্বাচনের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভোটের আগে ও পরে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার বহু নজির এখানে নানা সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মতো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে অনেক গোষ্ঠী আবার অতিরঞ্জিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যও ছড়িয়েছে। তবে সহিংসতা ঠেকাতে ও সহিংসতাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে একটা নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

এমন পরিস্থিতি অনেককেই ভোটকেন্দ্রে যেতে অনুৎসাহিত করতে পারে, এমন শঙ্কা থেকেই যায়। সেটা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য ইতিবাচক হবে না। গত বৃহস্পতিবার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সংবাদ সম্মেলনে ‘জীবন-জীবিকা-সম্পদ-সম্ভ্রম নিয়ে’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন, সেটা নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ মনোযোগ ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেই আমরা মনে করি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা যাতে নিরাপদ ও ভয়হীন পরিবেশে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটা নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে এসেও নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুদের কেন ভয় ও আতঙ্কে থাকতে হবে? বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আলোচনায় উঠে এসেছে, এবার প্রায় ৮০টি আসনে ভোটের ফলাফলে সংখ্যালঘু ভোটাররা প্রভাব রাখতে পারেন। বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচিতে সংখ্যালঘুদের ইস্যুগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। নির্বাচনের সময় অনেক দল তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতে দৃশ্যমান ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।

রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তির কথা বললেও বাস্তবে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকার দিকে তাকালে তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এবারের নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী মাত্র ৮০ জন; এর মধ্যে ১২ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র। ২২টি রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে সিপিবি ১৭ জনকে প্রার্থী করেছে, বিএনপি দিয়েছে ৬ জনকে ও জামায়াতে ইসলামী ১ জনকে প্রার্থী করেছে।

দেশের বিভিন্ন আসনে বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও দেশে অনেক বছর পর উৎসবমুখর নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। আর সবার মতো সংখ্যালঘু ভোটাররাও তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উন্মুখ হয়ে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁদের অনেকেই এমন দ্বিধা ও আশঙ্কায় পড়েছেন যে ভোট দিতে গেলে একধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে, না দিতে গেলে আরেক ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

সংবেদনশীলতার বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে সংখ্যালঘু ভোটারদের শঙ্কা ও উদ্বেগ নিরসনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা ভোটের ফলাফলে প্রভাব রাখতে পারেন, সেসব আসনে বিশেষ নজর দিতে হবে। সংখ্যালঘু প্রার্থীরা যাতে ভোটের প্রচারে সমান সুযোগ পান, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।